ঘরের কোণে ওই নীরব আলনার এক পাশে আমি চুপ করে বসে থাকি। এই সংসারের মানুষ গুলো আমায় বড্ড আপন করে নিয়েছে। প্রতিটা সদস্যদের কাছেই আমি বড় আপন। আমার সাদা, লাল সুতোয় আবৃত নরম সুতোর বুনন শরীর টা, তাদের সারাদিনের অবসাদ মুছায়। ক্লান্তি দূর করে। সকাল থেকেই আমি এই পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যরেই নয়নের মণি।
এই সংসারটিকে আমিও বড্ড আপন করে নিয়েছি। এদের ছাড়া আমার এই পৃথিবীতে কেউই নেই। আমার জন্ম হয়েছিল কোন এক তাঁতির বাড়ি। হয়তো কোন এক সকালে কোন ব্যস্ত তাঁতি ভাই খটাখট শব্দ তুলে লালে, সাদায় সাজিয়ে আমায় সুন্দর রূপে জন্ম দিয়েছিলেন। সত্যিই তাঁর সৃষ্টির তারিফ আমি নিজেই করি। কত যত্ন নিয়ে উনি আমায় গঠন করেছিলেন। লালে, সাদায় সুতোর গাঁথায় আমার রূপ যেন জ্বলজ্বল করতো।
এখন চেহারায় অনেকটা মলিনতা এসে গেছে। জানি, রূপ কারো সারাজীবনের জন্য থাকে না। আমিও তাই রূপ নিয়ে কোনদিন গর্ব করি নি। গর্ব যদি কিছু নিয়ে করতে হয় তাহলে সেটা কর্ম নিয়ে করা উচিত। আর আমি এই জগৎ সংসারের আড়ালে থেকে নিজের কর্ম টুকুই করে চলেছি। সংসারের দুঃখ, কষ্ট, পরিশ্রম, আত্মত্যাগ, উষ্ণতা সব টুকুর যা কিছু মলিনতা আমি তার সবটুকু শুষে নিই।
আজও মনে পড়ে এই বাড়িতে আসা আমার প্রথম দিনটার কথা। কোন এক পড়ন্ত দুপুরের পর তাঁতি ভাই দেখলাম আমার মতো আরো একডজন গামছাকে সুন্দর করে ভাঁজ করে, ব্যাগে ভরে সাইকেল এর হ্যান্ডেল এ তুললেন। সেই প্রথম আমি ঘর ছেড়ে বাইরে জগৎটা দেখতে পেলাম। শহরের কি সুন্দর ঝাঁ চকচকে দোকানপাঠ, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান, আরো কত কি।
ব্যাগের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে আমরা হাঁ করে লোকজন, ব্যস্ত গাড়ির হর্ন, ফলের দোকান ছাড়িয়ে গলির মধ্যে এলাম। এখানে এত বেশি লোকারণ নেই, কোলাহল টাও অনেকটা কম। বিস্ময়ে আমরা শান্ত হয়ে গেলাম। মনের ভিতর একটা অজানা ভয় কাজ করতে শুরু করলো। হটাৎ দেখলাম তাঁতি ভাই একটা গুমটি মতো দোকানের সামনে এসে সাইকেলের ব্রেকটা কোষলো। আমরাও সাথে সাথে চমকে গেলাম।
এরপর সাইকেল দাঁড় করিয়ে ব্যাগটা ওই গুমটির সামনে বসিয়ে আমাদের পরম যত্নে ব্যাগের অন্ধকারের থলি থেকে বের করলেন। রেখে গেলেন আমাদের সেই গুমটির দোকানে। আমার সাথে থাকা আমার সঙ্গী গুলো বলা কওয়া করছিল তাঁতি ভাই আমাদের এখানে বেচে দিলেন। আমরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেদিন তাঁতিভাই এর চলে যাওয়া রাস্তার পানে কিছুক্ষন আনমনে চেয়েছিলাম।
জানি নতুন এই পরিবেশটা বেশিদিনের জন্য আমার থাকবে না। খরিদ্দার ঠিক হলেই গুমটির মালিক আমায় আবার বেচে দেবেন। তারপর শুরু হবে আমার নতুন পথ চলা। এখন আমায় স্বয়ংভর সভায় পছন্দ করার মতো সাজিয়ে রাখা হলো আকর্ষণীয় ভাবে। দিন দুয়েক আমি এভাবেই ঝুলে ছিলাম ঘুমটির চালার নীচে।
একদিন বৈকালের দিকে এই বাড়ির দাদাবাবু গেলেন দোকানে। দরদাম করে আমার শরীরে হাত বুলিয়ে আমার কোমলতার পরশ বুঝে আমায় ঘরে নিয়ে এলেন। দাদাবাবুর মুখখানি দেখেই বুঝেছিলাম আমার টকটকে লাল, সাদা রং ওনার ভারী পছন্দ হয়েছে। বাড়ি ঢোকা মাত্রই বউমনিকে দেখালেন।
বউমনি তার কোমল হাতের স্পশে আমার নরম শরীর এর সুতোর নিরেট বুনন খুব তীক্ষ্ণতার সাথে পরীক্ষা করলেন। আমি শেষমেশ পাশ করে গেলাম। পার্মানেন্টলি আমি এই বাড়িতে থাকার অনুমতি পেলাম। সেই থেকেই আমার স্হান ওই আনলার এক কোণে।
আমায় যেদিন প্রথম নিয়ে আসা হয় এই বাড়িতে সেদিনই জলের সাথে আমার প্রথম আলাপ হয়। জলের সংস্পর্শে আমার অঙ্গের যতটুকু রুক্ষ ভাব ছিল ধুয়ে যায়। আমায় খোলামেলা রৌদ্রোজ্জ্বল উঠানে মিলে দেয়। আমি ঠান্ডা বাতাস, আলো, রোদের ছোঁয়ায় খেলতে খেলতে শুকিয়ে যাই। আমার ওপরে থাকা কড়কড়ে অতিরিক্ত মার গায়েব হয়ে যায়।
পরের দিন থেকেই আমার ডিউটি শুরু হয়ে যায়। সেই থেকে আজও আমার কর্তব্য আমি পালন করে চলেছি। ঘুম থেকে উঠেই দাদাবাবু আমাকে নিয়েই চলে যান বাথরুমে। স্নানে ভেজা শরীরের জল আমি মুছিয়ে শরীর কে তরতাজা করে দিই। দাদাবাবুও আমায় ভালো ভাবে বালতির জলে চুবিয়ে নিগড়ে উঠোনে মেলে দিয়ে অফিস যান।
এরপর আমি দাদাবাবুর ছেলে অর্থাৎ বাবুর দরকারে কাজে আসি। বাবু প্রাইভেট টিউশন থেকে এসেই তারাহুড়ো করে আমায় টেনে নিয়ে যায় সেই পুকুর ঘটে। আমায় ঘাটের সিঁড়ির কাছে রেখে বাবু স্নান করতে নামে। এই সুযোগে আমি প্রকৃতিটাকে ভালো করে দেখি। টলমল করছে এক পুকুর জল, সাদা, আকাশি রঙে মেশানো আকাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি। বাবু ঝুপ করে স্নান সেরে আমায় তার মাথার জল শুষে নেওয়ার জন্য উদ্ধত হয়। আমিও তড়িঘড়ি কাজ সারি।
বউমনি রেগে আগুন। এ গামছা তো তোর বাবার বাবু। তুই কেন ব্যবহার করিস? গামছা সকলের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবহার করা উচিত। বাবু কথা শোনে না। ও মনে মনে আমাকেই বেশি পছন্দ করে। আর আমারও প্রতিদিন বাবুর সাথে পুকুর ঘাটে যেতে ভীষণ ভালো লাগে। বাবু চলে যায় ভাত খেয়ে স্কুলে। আমি আবার উঠোনে মেলে হাওয়া খাই। নেহাত মন্দ নয় এই যৌবন।
বউমনি যতই বলুক সকলের আলাদা আলাদা গামছা ব্যবহার করা উচিত। তিনিও সেই দুপুর , সন্ধ্যে মুখ ধুয়ে আমার আচলেই মুখ মোছেন তৃপ্তি করে। কখনো বাবার বাড়ির কথা মনে পরলে- মা, বাবা, ভাই এর কথা মনে পরলে একলা ঘরে আমায় সঙ্গী করে নেয় । জড়িয়ে ধরে কান্না করে। আমি পরম যতনে বউমনির চোখের জল মুছিয়ে দিই। আমার নরম সুতোর পরশ ওনারও খুব পছন্দের। বিকেল এর পর থেকে আমি ঘরে ফিরি। আনলায় চুপ হয়ে বসে থাকি। এই সংসারের মানুষ গুলোর নিত্য সুখ দুঃখের ঘটনার সাক্ষহী হয়ে।
আমি জানি যৌবনে আমার যতটা কদর বয়স কালে সেই কদর থাকবে না। আমার গায়ের রং, সুতোর বুনন কালের সাথে সাথে মলিন হয়ে যাবে। কমে যাবে আমার ব্যবহার। আমার জায়গায় অন্য কোন গামছার আগমন ঘটবে এ বাড়িতে। এক অমোঘ মায়ার প্রেমে পরে বউমনি খুব সহজে আমায় বিদায় দেবে না। হয়তো আমায় ভাতের হাঁড়ি নামানোর কাপড় করবে, নয়তো জানালার গ্রিল, ঝুল , ময়লা মোছার কাজে আমায় লাগানো হবে।
আমি গামছা। আমার বয়সের সাথে সাথে আমার লাল, সাদা কাপড় আবৃত শরীরে ফটোল ধরবে, ছিঁড়ে যাবে। রং চটে যাবে। ফিকে হয়ে আমি একসময় বিবর্ণ হয়ে যাবো। একটা সময় সংসারের এইসব কাজ করতে করতে একদম অকেজো হয়ে যাবো। তখন আমার ঠাঁই হবে ডাস্টবিনে। কিন্তু এমন জীবন নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নেই।
আমার জীবনে আমি শরীরের সবটুকু দিয়ে মানুষের ঘাম, কষ্ট, কান্না, ভেজা শরীর , সংসারের নানা কাজের মধ্য দিয়ে কর্ম করে গেলাম। কর্মই তো জীবন। আমার এ জীবন সার্থক। নাই হোক রাজকীয় জীবনযাপন। তবু তো একটা সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে আমি সারাটাজীবন উৎসর্গ করলাম। এতেই আমার জীবনের পরম শান্তি।
আজকের ব্লগটা এত টুকুই। আপনারাই বলুন আমাদের ঘরের প্রায় সকলের ঘরেরই থাকা গামছারই হয়তো একই জীবনকাহিনী? কি ঠিক বললাম তো? আজকের লেখাটা কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না। আমি অপেক্ষায় রইলাম।
আবার আসবো নতুন কোন ব্লগের পোস্ট নিয়ে। আমাদের চারপাশে থাকা আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি গুলোকে আমার লেখার মাধ্যমে ব্লগে সাজাতে। আজ তবে আসি। আপনারাও ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন।

0 মন্তব্যসমূহ