ঘরের এক কোণে জানালাটা আমার ভীষণ আপন। দীর্ঘ এগারোটা বছর হয়ে গেল। এর সাথে আমার পরিচয়। এখন জানালাটা আমার নিসঙ্গের সঙ্গী। আমার একাকিত্বের দোসর। আমার না বলা কথা গুলো ও মন দিয়ে শোনে। আমার নীরবতার প্রতিটা অক্ষরগুলো ও নিজেই সাজিয়ে নিয়ে বাক্য তৈরি করে নেয়।
প্রকৃতিকে আহ্বান জানিয়ে ও যেন আমায় বুঝিয়ে দেয় আমার সব কথা সে বোঝে। যেমন - ভোরের আলো ফোটা মাত্রই আমি বিছানা ছাড়ি। সংসারের কাজে হাত দেয়ার আগে ওই ছোট জানালাটার সামনে যাই। ছিটকিনিটা নামিয়ে দিয়ে পাল্লা দুটো আলতো করে খুলি।
আলো আঁধারির ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসকে ও সঙ্গে সঙ্গে আমার জন্য নিয়ে হাজির করে। আমার আধো ঘুমের নেশা মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে যায়।
লম্বা একটা হাই তুলে চোখ রোগরে অবাক চোখে বাইরেটা দেখি। নির্মল শান্ত আকাশ, বাঁশ গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে হলুদ আভার এক চিলতে রেখা আমার শরীর ছুঁয়ে যায়। চারিদিক কি শান্ত, প্রকৃতির একটা আলাদাই মেজাজ এসময়। দু- একটা পাখির শিস আর তাদের স্হান পরিবর্তনের কিছু সড়সড় আওয়াজ ছাড়া কোন অকৃত্তিম শব্দের ঘনঘটা থাকে না।
আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় ওই পাখিগুলোর সাথে গলা মিলিয়ে একটু শিস দিই। ইচ্ছা হলেও- অন্তরাত্মা বলে, না এমন করতে নেই। এটা ওদের নিজস্বতা। প্রকৃতির দেওয়া এই উপহার চাক্ষুস উপভোগ করতে হয়। দুচোখ ভরে দেখতে হয়। অযথা ওদের বিরক্ত করতে নেই। এটা প্রকৃতির সম্পদ। তাদের অবমাননা করা মানে নিজেকে ছোট করা।
বাঁশ ঝড়ের শুকনো পাতা গুলো গাছ তলায় ঝিমিয়ে পরে থাকে। আমি কখনো গাছের সবুজ পাতার দিকে কখনো পড়ে থাকা নিথর পাতার দিকে তাকাই। মেলানোর চেষ্টা করি দুজনকে। মেলে না। প্রকৃতির কি অপার বিচার! কথাটা সত্যিই শতভাগ সত্য। রূপ কারো সারাজীবন থাকে না। এই যে পাতা গুলো অবহেলায় মাটিতে পড়ে আছে, আরো দুদিন পর মাটিতে মিশে নশ্বর হয়ে যাবে, এরও একসময় যৌবন ছিল, কচি সবুজ রং ছিল।
যৌবনে গাছের একদম সিংহভাগে বসে হাওয়ায় দুলতো। তপ্ত দুপুরে রোদের আলোয় ক্লান্ত হয়ে গোধূলির শান্ত হাওয়ায় জিরিয়ে নিত। আবার ঘুমিয়ে যেত নতুন ভোরের অপেক্ষায়। একটা নতুন দিনের সূচনা হত। যৌবনের রং দিন বদলানোর সাথে সাথে আরো ঘন সবুজ হত। হয়তো ওরাও সব বোঝে। প্রকৃতির হিসাব ওরাও রাখে।
এরপর একটা একটা করে দিন ফুরোয়। রং ফিকে হয়, শক্তি আলগা হয়ে আসে। অমোঘ নিয়মে শেষমেশ ঝরে পরে সিক্ত মাটিতে। এটাই তো জীবনচক্র। ওরা কি সুন্দর সবটা মেনে নিয়েছে। আমি মেনে নিতে পারবো তো? চমক ফেরে নিজের কাছে রাখা প্রশ্নটার মাধ্যমে। জানালা থেকে সরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়াই। সত্যি আমিও অনেকটা এগিয়ে গেছি জীবনচক্রের নিয়মে। মনটা একটু উদাস হয়ে যায়।
ওই এক টুকরো জানালাকে আবার বিদায় জানিয়ে আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসি সংসারের কাজে। সারাদিনের বাসন ধোয়া, উত্তপ্ত হাঁড়ি, খুন্তির বেখেয়ালি নাচন, ভাজা ভুজির সোঁ সোঁ শব্দ, ডাল শাধলানোর ঝাঁজলো ধোঁয়াটে গন্ধের মাঝেও আমার ওই জনালাটার দিকে মন পড়ে থাকে। হাতের কাজ সামলাতে সামলাতে সকাল পেরিয়ে বেলা গড়িয়ে আসে।
কখনো কখনো সংসারে কাজের মাঝে ওর একটু যত্ন নিতে আসি। নরম কাপড়ের ছোঁয়ায় ওর সারা শরীরটাকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিই। কাঠের নিষ্প্রাণ দেহ টায় আঙুলের স্পশ রেখে বুঝতে পারি ও সূর্যের তাপে কতটা উত্তপ্ত হয়েছে, কিংবা বৃষ্টির ছাটে কতটা সিক্ত হয়েছে। ওরও বোবা মনের কষ্ট গুলো আমি অনুভব করতে পারি। গায়ে জমে থাকা ধূলিকণা মুছিয়ে ওকে পরিচ্ছন্ন করে রাখি। যেমন মমতায় লালন করে একজন মা তার সন্তানকে।
দুপুর গড়িয়ে অপরাহ্ন ঘনিয়ে আসে। সংসারের সকল সদস্যরা ভাটঘুমে আছন্ন। সারা পাড়ার কোলাহল ক্ষীণ হতে মিলিয়ে যেতে থাকে সময়ের তালে তালে। সংসারের থালা বাসনের ঠুকিঠাকি, কলপাড়ের আড্ডা, ঠেলা গাড়ির হর্ন, ফেরিওয়ালার কর্কশ কন্ঠ সব নীরব হয়ে যায়। বাতাস ও যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। দু- একটা মনকেমন করা পাখির আর্তনাদ কানে আসে, তখন আমি আবার আসি ওই জানালার ধারে।
জানালার এগিয়ে আসতেই বুঝতে পারি ওর তখন আলগা অভিমান হয়। সারাদিনের ব্যস্ততায় ওর সাথে সময় কাটাতে পারি না তাই ওর মন খারাপ হয়। আমি খুব গভীর ভাবে বুঝি ওর মনের ব্যাথা। এ বাড়ির আর কোন সদস্যরা ওর গায়ের কাছে এত ঘেঁষে না। কেউ ওকে এমন করে উপলব্ধিই করে নি কখনো। একমাত্র আমিই ওর সই।
এ বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই এই জানালা দিয়েই আমি এক ফালি আকাশ দেখতাম। সামনে একটা সোজা রাস্তা। যেটা পুরো গ্রামের ভিতর গিয়ে মিশেছে। রাস্তার ওপারে একটা বিশাল বাঁশঝাড়। তারপরে বিরাট এক পুকুর। পুকুরটার নাম 'চাতরা ' পুকুর। বিশ্বাস করুন আমি কোন কাব্যিক কথা বলছি না। আমার এ লেখার একটা অক্ষরও কল্পনাপ্রসূত নয়। আমার ঘরের কোণের একটুকরো জানালা দিয়ে এ দৃশ্য সত্যিই দৃশ্যমান।
আমি অপরাহ্নে চেয়ে দেখি কি বিশাল স্তব্ধতা গ্রাস করে আছে এই আস্ত প্রকৃতিটাকে। সব কিছু যেন থমকে থাকে এ সময়। প্রকৃতি যেন খানিক জিরিয়ে নেয় এই অবসরে। আলোর তির্যক চাউনি আকাশ, বাতাস, গাছপালা, পশুপক্ষকী সকলকে ঝিমিয়ে দেয়। জানালা থেকে পুরোটা দৃশ্যমান না হলেও যতদূর চোখ যায় দেখি বিশাল পুকুর টার জল এর প্রবাহ ধীর, স্হির। আমার সারাদিনের ক্লান্তি যেন ওদের সাথেই মিলেমিশে বিলীন হয়ে যায় বিকেল হওয়ার সাথে সাথেই।
এরপর খোলা জানলা বন্ধ করে দিই। ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। আমার টুকিটাকি কাজে আবার সময় বয়ে যায়। সংসারের মানুষ গুলোর জন্য নিত্য নৈমিত্তিক কাজ গুলো সারতে হয়। ছেলের পড়াশোনার দায়িত্বটাও আমিই সামলে নিই সন্ধ্যের দিকে। কর্মচঞ্চলতায় সন্ধ্যে ঘনিয়ে রাত নামে। এ জীবনের ঘোর হতাশা, দুঃখ, কষ্ট আবেগ গুলো রাত নামলেই আমায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে।
সংসারে থাকা আর পাঁচটা মানুষগুলোর মতো আমি সহজেই নিদ্রায় যেতে পারি না। অবসন্ন শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলেও নানান চিন্তাভাবনা আমায় অস্থির করে তোলে। বিছানা ছেড়ে আবার চলে আসি সেই জানালার ধারে। বন্ধ জানালাটাকে আবার উন্মুক্ত করে দিই। সহসা খানিক শীতল হাওয়া এসে আমার চোখে, ঠোঁটে, গালে চুমু দিয়ে যায়। এই পৃথিবীর যা কিছু না পাওয়ার দুঃখ, বেদনা, অধরা স্বপ্ন গুলোকে আমি ওই হাওয়ার সাথে ফিরিয়ে দিই আমার পরজন্মের ঠিকানায়।
এজন্মে যা কিছু পেলাম না , তা যেন পরজন্মে দ্বিগুন আশীর্বাদ হয়ে আমার কাছে আসতে পারে। এই এক টুকরো জানালার ফাঁক আমায় এ জিবনে অনেক কিছু দিয়েছে। মুক্ত আকাশকে অনুভব করার মতো মন দিয়েছে, শান্ত থাকার মত সহ্য ক্ষমতা দিয়েছে। চরম বাস্তবতাকে মানতে শিখিয়েছে। যা কিছু আমার নয়, তার কামনা থেকে বিরত থাকতে শিখিয়েছে। আমার নিঃসঙ্গ জীবনকে প্রাণবন্ত রাখতে প্রতিনিয়ত অক্সিজেন দিয়েছে। আমি সত্যিই চির ঋণী এই টুকরো বাতায়নকে আমার জীবন মাঝে পেয়ে।
আজকের ব্লগটা এতটুকুই। এই গল্পটা মানে অনুভূতিটা শতভাগ সত্য। আমার ঘরেই আছে এই জানালাটা। ছবিটা তুলেছি কিন্তু জানালার জাল আছে বলে ভালো করে উঠছে না। তাই বাইরে গিয়ে ছবিটা তুললাম। দেখুন রাস্তা, বাঁশগাছ, পুকুর সব আছে। ফোনের ক্যামেরা কোয়ালিটি ভালো নয়। তাই একটু ai দিয়ে এডিট করে দিলাম। আজকের লেখাটা কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। আজ তবে আসি। ভালো থাকবেন সকলে।

0 মন্তব্যসমূহ