একটি টুথব্রাশের জীবনকাহিনী : একটা সংসারে তার অবদান

 

Tooth-brush-picture



বারান্দার দেয়ালের এক কোনে তার স্হান। এখানেই সে সারাদিন থাকে। একটা প্লাস্টিকের ছোট্ট বক্সের মধ্যে সারাদিন সে নীরব দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। সংসারে তার কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। তাই কদর ও হয় না। কিন্তু ও জানে যখন বয়স বাড়বে তখন ওর কাজের পরিধি ও বাড়বে। তার ক্ষেত্রে যেন জগৎ সংসারের উল্টো নিয়ম লেখা হয়েছে। 
বাক্সর ভিতর থেকে গলা বের করে সে সারাদিনের মানুষের ব্যস্ততা চুপ করে দেখে। এখন তার বয়স পূর্ণ বয়সের অর্ধেক। এটা তার নিজস্ব অনুভূতি। গায়ের নীল রং টা একটু হালকা হয়েছে। সকাল, রাতের জলের দোলাচলে ও টুথপেস্ট এর ফেনার  ঘনঘটায় তার রং টা বিবর্ণ হয়ে গেছে। নিজের চেহারার দিক টা একবার দেখে ভাবে আর হয়তো কয়েকটা দিন তারপরেই আমায় বয়স্ক বলে বিবেচিত করবে। মাথায় লাগানো প্লাস্টিক এর চুল গুলো অর্থাৎ যে গুলো মানুষের দাঁত পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত হয় সে গুলোও আস্তে আস্তে কালের প্রভাবে বেঁকে যেতে শুরু করেছে। 
এই বুঝি দিন ঘনিয়ে এলো। এভাবেই একটা একটা করে  চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত হয়। ভোর হলেই বাড়ির কর্তার প্রথম খোঁজ পরে তাকে। গত কাল রাতের পারিবারিক খুঁটিনাটি বিষয়ের অশান্তি, অফিসের কাজের প্রেসার, গভীর রাতের কিছু সুখের স্বপ্ন সব কিছু মিলিয়ে আধো ঘুম চোখে কর্তা তাকে মুঠোয় ধরে,  ভীষণ উদাসীন মনে। সকালে এই একটা সময়ই সে ডিউটি করে। 


সে চায় , তার মালিক একটু তৎপরতায় জড়িয়ে ধরুক, আলতো করে মাখিয়ে দিক টুথপেস্ট এর ক্রিম। কিন্তু তা আর হয় না। তার মাথায় ছড়ানো প্লাস্টিকের রোয়ার ওপর অযত্নে ঢেলে দেয় পেস্টখানি। বেখেয়ালে চালান করে একদম নিজের ব্যক্তিগত পরিসরে। মুখের ভিতর। কর্তার ইচ্ছায় হয় কর্ম।  তার ইশারা মতো মুখের সব তিক্ততা পরিষ্কার করতে তখন সে ব্যস্ত হয়ে পরে।



টুথ ব্রাশটা  জানে এর পুরো ক্রেডিট 

টাই তার একার নয়।  মাথার ওপর লাগানো শ্যাম্পুর মতো ফ্যানা হওয়া টুথ পেস্ট এর। যৌথ ভাবে কাজ করে তারা। তাকে নিয়ে হাতের কাজ করতে করতেই কর্তার আধো ঘুম ভাঙে। দাঁতের ঘাজে, ওপর পাটি, নিচের পাটি রোগরে সাফ করে। সেও তার  সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে কর্তার ইচ্ছা পূরণ করতে। কখনো তিনি বেখেয়ালে টুথ ব্রাশটিকে ঠেলে তুলে দেন মুখ গহ্বরের একদম ওপরে মাড়িতে। রক্ত বেরিয়ে ফ্যানায় মিশে সে এক বিচ্ছিরি কান্ড।


কিন্তু তাতে ব্রাশ আর পেস্ট এর কোন দোষ থাকে না। দোষ থাকে কর্তার। তবুও তিনি কখনো কখনো মেজাজ হারিয়ে টুথব্রাশকেই দোষারোপ করেন। সেই নাকি ভালো নয়। বয়স হয়েছে। মাথার ওপর প্লাস্টিকের রোয়ার কোয়ালিটি নাকি একদম বেকার। তার থেকেও  নাকি ভালো কোয়ালিটির ব্রাশ বাজারে এসেছে। একে এবার বাতিল করে দেওয়া দরকার। 


বিরক্তির স্বরে মুখে ঘনীভূত ফ্যানার স্তুপ টুকু বেসিনে থু করে ফেলে, চরম অবহেলায় ব্রাশের মাথার  প্লাস্টিকের চুল গুলো আঙুলের চাপে, বুড়ো আঙুলের মাধ্যমে বেসিনের জলে ধুতে থাকে। প্রয়োজনের অধিক জলস্রোতের চাপে ব্রাশের চুল গুলোর অবস্থা আরও বিগড়ে যায়। ইয়ং বেলায় তার সোজা সোজা চুলের এমন বাহার দেখেই কর্তাই তাকে ভালোবেসে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। ঠাঁই মিলেছিল এই সংসারের এক কোণায়।


টুথব্রাশ টা মনে মনে ভাবে,  এখনো তার মনে আছে সেই দিনটার কথা। একটা ওষুধ এর দোকানে প্লাস্টিক বন্দি হয়ে  সে  ঝুলছিল। দোকানদার তাকে বিক্রি করবে বলেই আকর্ষণীয় ভাবে সাজিয়ে রেখেছিল দরজার পাশে কাঁচের শোকেশের একদম সামনের সারিতে।  উজ্জ্বল গায়ের রং। নীল বর্ণ। যৌবনের উছলে পরা আলোর মত। মাথা ভর্তি একরাশ ঠারো করা ঘন নরম চুলের বাহার। কর্তার এক দেখাতেই তাকে পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। 


দোকানদারও ব্রাশটার সম্পর্কে ভালো ভালো সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। নিয়ে যান দাদা, বাজারে নতুন লঞ্চ হয়েছে ব্রাশটা। ব্রাশ টা একটুও কড়কড়ে নয়। নরম দাঁড় গুলো। আর যেমন খুশি ব্যবহার করবেন। খুব বিক্রি হচ্ছে এখন এটা। কর্তাও সানন্দে তাকে ঘরে নিয়ে এসেছিলেন। সেই থেকে ব্রাশটা এই সংসারে। কর্তার রাতে বিছানা যাওয়ার আগে তাকে ব্যবহার করেন, আর সকালে বিছানা ছাড়ার সাথে সাথেই তাকে ব্যবহার করেন।


কিন্তু আজ কর্তার মন মেজাজ দেখে মনে হচ্ছে ওই ঝুলন্ত বক্সে থাকার দিন হয়তো ব্রাশ টার ফুরিয়েছে। কর্তার কুঁচকানো ভ্রু , আর ব্রাশটার দিকে তাকানো কটাক্ষ দৃষ্টিই বুঝিয়ে দিচ্ছে তার বয়স হয়েছে। এবার তাকে অন্য কাজে লাগানো হবে। আর সেটা কি কাজ ব্রাশটা  ভালো ভাবেই জানে। 


এবার ব্রাশটার কাজের ধরন পাল্টাবে। ওর জায়গায় অন্য কোন ঝকঝকে রঙিন  ব্রাশ এসে বারান্দার এক কোণে শোভা পাবে। নীল ব্রাশটার স্হান পরিবর্তন হবে। নতুন কাজে তাকে  পুরোদমে  লেগে পরতে হবে। আর তার জায়গাও হবে কোন কদরহীন আস্তানায়। 



 কর্তাবাবুর বউ এর শাখা জোড়া পরিস্কার এর কাজে এবার তাকে  লাগতে হতে পারে। কিংবা জানলা , দরজার ভাঁজে থাকা ধুলো ঝাড়তে তাকে দরকার পরবে। নইলে পায়ে  আলতা পরার সময় তার খোঁজ পরতে পারে। নয়তো বেসিন এর নোংরা জল পরিষ্কার করতে। 


এইভাবেই ব্রাশটার শেষ জীবনটা কেটে যাবে। কাজের মাঝে ব্যস্ত থেকে। আরো দুইমাস পর সে যখন একদম ই অচল হয়ে রং চটা, চুল উপড়ানো নাম মাত্র একটা প্লাস্টিকের কাঠিতে পরিণত হবে তখন তার  ঠাঁই হবে একদম ডাস্টবিনে।


এইভাবে  একটি সামান্য টুথব্রাশ মানুষের সকালের ডান হাত হয়ে , রাতের ঘুমোতে যাওয়ার আগে তার সব মলিনতা পরিস্কার করে, শেষে সেই সংসারেই আনাচে কানাচে থাকা নানাবিধ কাজ করে চিরতরে বিদায় নেয় এই সংসার থেকে। মাত্র ছয় মাসের মেয়াদে হাজারো স্মৃতি নিয়ে পরিশেষে চরম অবহেলার তকমা গায়ে মেখে মিলিয়ে যায় এই সংসার থেকে । কেউ খোঁজ ও রাখে না। 


এই হলো আমাদের প্রত্যেকটা ঘরেরই টুথ ব্রাশের জীবন কাহিনী। একটা টুথ ব্রাশের সাথে কম বেশি সবাই এর ঘরেরই প্রায় একই কাহিনী। নিত্যদিনের ব্যবহৃত এই সামান্য ও অথচ মূল্যবান বস্তুটিকে নিয়ে লেখাটা আপনাদের কেমন লাগলো? আমায় কমেন্ট করে জানাবেন। আমি অপেক্ষায় রইলাম। 


আজ তবে এত টুকুই। আবার ফিরবো আগামী কাল। নতুন কোন আবেগ, অনুভূতির গল্প নিয়ে। আজ তবে আসি। 







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ