- কই গো, তোমার হলো? আর কতক্ষণ সময় লাগবে তোমার?
পার্থর অবাঞ্ছিত প্রশ্নবাণে অতিষ্ঠ হয়ে,খোঁপাতে ক্লিপ টা আটকে আয়নার দিকে তাকিয়েই সোমা ,পার্থর প্রশ্নের জবাব দিল,
- দাঁড়াও আর পাঁচ মিনিট।
- উফ পাঁচ মিনিট -পাঁচ মিনিট ,বলে তো তুমি আধঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিলে।
কোন তাড়াহুড়ো ছাড়াই শেষ বারের মতো ঠোঁটে লিপস্টিকের টাচ আপ দিতে দিতে সোমা পাল্টা জবাব দিল,
- মেয়েদের সাজতে গেলে এমন একটু দেরি হয় বুঝলে? তোমার মত তো আর শার্ট প্যান্টটা গলিয়ে নিলেই হয়ে গেল। তা তো নয়। তাছাড়া আমার সংসারে সব কাজকর্ম সেরে রেডি হতে হচ্ছে। সময় লাগবেই।
পার্থ এবার একটু হেসেই জবাব দিল-
- বলি তুমি তো যাবে ঠাকুর দর্শন করতে। একটা বছর পর মা দুর্গা এই কদিনের জন্য মর্ত্যে আসেন। লোক তো ঠাকুরই দেখবে। তোমায় কে দেখবে ? তুমি যে অত গয়নাগাটি পরে, মেকআপ করে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে সাজছো ?
এ কথা শুনে সোমার রাগ তো একেবারে সপ্তমে চড়ে বসল। তবে মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে একটু সামলে নিল। নইলে এতক্ষণ ধরে যে মেকআপ করলো তা নষ্ট হয়ে যাবে যে।
- এই শোনো, মেয়েরা কাউকে দেখানোর জন্য সাজে না কথাটা মগজে নাও বুঝলে। নিজের আত্মসন্তুষ্টির জন্য সাজে। নিজেকে ভালবাসে তাই সাজে। নিজেকে গুছিয়ে, পরিপাটি রাখতে পছন্দ করে তাই সাজে। তোমার মত আমি অগোছালো নই।
ওরে বাবারে আমার দুর্গাই এবার ক্ষেপলো বলে ,মনে মনে এই কথা আওড়িয়ে পার্থ নিজেকে সংযত করে পুনরায় বলল-
- সে তো বটে । তবে একটা কথা কি বলতো? ইয়ে... মানে বলবো?
- উফ এতক্ষণ তো খুব মুখ চলছিল। এখন আবার কথা বলার জন্য অনুমতি কেন চাইছো? যা বলবে বলো তাড়াতাড়ি । আমার বডি স্প্রে টা লাগিয়ে নিলেই হয়ে যাবে। আমি রেডি।
- এমনিতেই তুমি সুন্দরী। কিন্তু সাজলে ,গুজলে তোমায় কিন্তু আরো সুন্দর লাগে মানতে হবে। এই আজকেই তোমায় এই নীল প্রিন্টে শাড়িটা পরে কিন্তু বেশ মানিয়েছে।
মুখে এক চিলতে হাসির ঝিলিক টেনে সোমা অস্ফুটে উচ্চারণ করল,
-সত্যি বলছো ?
পার্থ সোমার মুখের বদলে যাওয়া অভিব্যক্তি দেখে একটু সাহস পেল। কাছে এসে বলল ,
- হ্যাঁ গো। সত্যি বলছি অপূর্ব লাগছে তোমায় আজ। চোখে কাজল পরলে তোমায় দারুন লাগে। তোমার ঠোঁটের ওই হালকা রঙের লিপস্টিকের আভাটায় ভীষণ মানিয়েছে তোমায়।
-চোখ আছে তাহলে তোমার?
- মানে ?
- মানে টা হলো, আমি ভাবলাম তুমি হয়তো আমার দিকে আর আগের মত চেয়েই দেখো না।
- না দেখে পারি কি করে বলো সুন্দরী? দশটা নয় , পাঁচটা নয় আমার একটা মাত্র বউ। ডানা কাটা পরী না হলেও আমার চোখে তুমি সুন্দরী। ভীষণ সুন্দরী।
খানিকক্ষণ এক দৃষ্টিতে দুজন দুজনের দিকে চেয়ে রইল। এগারো বছরের দাম্পত্য জীবন তাদের। তবু তারা যেন এই মুহূর্তে সেই যৌবন কালের প্রেমিক-প্রেমিকা।
খানিকক্ষণ নিস্তব্ধতা।
- কি হলো কি? আশ্চর্য তো ! এভাবে হা করে আমায় দর্শন করলেই হবে? চলো, তাড়াতাড়ি ঠাকুর দেখতে যাবে তো ? এর বেলায় তোমার দেরি হচ্ছে না বুঝি?
সোমার গলার আওয়াজে নীরবতা ভঙ্গ হলো। পার্থ যেন একটু চমকে উঠল।
- দিলে তো রোমান্সটা ঘেঁটে ঘ করে?
-আর অত রোমান্স করতে হবে না। দিন দিন যেন বয়স কমছে। যাও তোমার বাইকটা বের করো। আমি ঘরে তালা চাবি দিয়ে আসছি।
( এরপর রাস্তায় বেরিয়ে)
- সত্যি পুজোর এই সময়টা চারপাশের পরিবেশটা কেমন বদলে যায় তাই না সোমা?
- ঠিক বলেছ। চারিদিকে ঢাকের আওয়াজ ,মাইকে স্বর্ণযুগের গান, কখনো পুজো প্রস্তুতির ঘোষণা, আলোর রোশনাই সত্যিই সবকিছু মিলে এক অপূর্ব অনুভূতি।
- এই শোনো না সোমা সেই গানটা করতে ইচ্ছা করছে।
- কোনটা ?
- ওই, সেই গানটা ... করব?
- করো । আবার জিজ্ঞাসা করার কি আছে?
- এক্ষুনি যদি আবার বলো, বয়স হয়েছে এত রোমান্স কিসের! একটু আগেই তো বলছিলে।
সোমা বাইকের পিছনে বসে পার্থর ঘাড়ে আলতো করে হাতটা রাখলো আর কানের কাছে মুখটা রেখে বললো গাও না...
- "এই পথ যদি না শেষ হয়
তবে কেমন হতো তুমি বলতো।"
বাইক এসে থামল একটি পুজো মন্ডপের সামনে। কলকাতার মত লাইন দিয়ে এখানে ঠাকুর দেখতে হয় না। এখানকার পরিবেশ ভীষণ সুন্দর ।খুব ভালোভাবে এই গ্রামে ,গঞ্জে ঠাকুরের দর্শন করা যায়।
বাইক থেকে নেমে তারা হাত ধরাধরি করে পূজা মন্ডপে প্রবেশ করলো।
- বাহ! মা দুর্গার কি অপরূপ রূপ! চোখ ফেরানোই দায়।
- শুধু কি মা দুর্গা ? ভালো করে দেখো সোমা, সরস্বতী লক্ষী ,কেও কি সুন্দর লাগছে!
ঠিক বলেছ । কার্তিককেও বেশ মানিয়েছে কিন্তু।
- গণেশ বাবাজিও কেন বাদ যায় বলো সোমা? এ তোমার ভারী অন্যায় । তুমি সবার প্রশংসা করছ । আর গণেশ বাবাজির করছো না ।
-ওগো ,ভগবান তো এমনই সুন্দর। তার ওপর উনি আমাদের গণু দাদা। উনি তো বরাবরই সুন্দর।
পার্থ আর সোমা দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। প্রণাম সেরে আবার তারা রওনা দিল অন্য পুজ মণ্ডপের উদ্দেশ্যে । বাইকে উড়ে চলল দুই কপোত - কপোতি।
সমাপ্ত।
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব হলো দূর্গা পূজা। এই পুজো প্রেমের গল্পটা আমাদের বাঙালিদের খুব চেনা একটি দৃশ্য। পুজো মানেই প্রেম, খাওয়া দাওয়া, ঠাকুর দেখা, আর জমজমাট আড্ডা। আজকের এই চিরাচরিত পুজো প্রেমের গল্পটা আপনাদের কেমন লাগলো অবশ্যই সকলে কমেন্ট করে জানাবেন কিন্তু।
আজকের ব্লগটা এত টুকুই। আবার ফিরব নতুন কোনো ব্লগের লেখা নিয়ে। আজ তবে আসি। সকলে ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন।

0 মন্তব্যসমূহ