সময়ের কাজ সময়েই করতে হয়। সময়কে ফাঁকি দিলেই জীবন টাও ফাঁকি রয়ে যায়। ( আমাদের প্রত্যেককেই সময়ের মূল্য বোঝা উচিত)

 

time-pass-with-friends-in-train-picture


আমরা প্রতিদিনই ভাবি এবার থেকে নিজেকে একটু বেশিই সময় দেব। নিজেকে কিছু করে দেখাতে হবে। আমরা নিজেকে একটা অন্য পজিশনে দেখার জন্য প্রতিনিয়ত কত স্বপ্ন দেখি। কত শত স্বপ্নের জাল বুনি। ভাবি কাল থেকেই একদম আদা জল খেয়ে নেমে পরবো।


কিন্তু সেই 'কাল' টা আর আগামী কাল হয় না। সকাল হয় চোখের পলকেই ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। ভাবতে ভাবতে আর স্বপ্ন দেখতে দেখতেই আমাদের কাল কেটে যায়। মানুষের এখন অলস জীবনযাত্রায় নিজেরাই অজান্তে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। সোসাল মিডিয়া, মোবাইল স্ক্রলিং এ কখন যে সময়টা ফুরিয়ে যাবে টের ও পাওয়া যাবে না।


সামান্য শরীর চর্চা র কথাই ভাবুন একবার। এই ভাবি আজ থেকে শুরু করবো, কাল থেকে শুরু করবো। কিন্তু করাই আর হয়ে ওঠে না। ওজন বাড়তেই থাকে, রোগ শরীরে বাঁধা বাঁধতে থাকে। আর আমরা সময় নষ্ট করে রেস্টুরেন্টে খেয়ে দেয়ে অর্থ তো ব্যয় করিই আবার শরীরটাকেও আস্তে আস্তে বিপদের মুখে ঠেলে দিই।


স্কুল লাইফে আজ পড়বো, কাল পড়বো এই ভাবে ভাবতে ভাবতেই পরীক্ষা এসে যায়। পরীক্ষার এক মাস আগে ভাবি, ইসসস! আরো একটু যদি আগে থেকে সিরিয়াস হতাম তাহলে খুব ভালো হত।। হাতে সময় বড্ড কম। তাই কাজকে কখনো অবহেলা করা উচিত নয়। কাজকে ফাঁকি দেওয়া মানেই নিজের জীবনকে ফাঁকি দেওয়া।


আমি এই পরিণত বয়সে এসে এ কথা খুব মানি। একটা সময় ছিল যখন  হেলায় হারিয়েছি মূল্যবান সময় গুলো। জীবনের স্বর্ণ যুগ টা অর্থাৎ যে বয়সে পড়াশোনা সব চেয়ে বেশি জরুরি সেই বয়সটাতেই বেশি ফাঁকি দিয়েছি। তাই তার মাশুল সারাজীবন আমায় বয়ে বেড়াতে হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম।


এখন প্রতিটা দিন চোখ খুলি এলার্ম এর শব্দে। তড়িঘড়ি জীবন।।সকাল থেকেই হুটোপুটি করি রান্না করতে। রান্না করতে করতেও ভাবি কত কিছু করব। কিন্তু বাস্তবে আর আমার সময় এ কুলোয় না। তবু চেষ্টা চালিয়ে যাই। আমার চেষ্টা বলতে ছেলেকে কিভাবে মানুষ এর মত মানুষ করবো। বর এর সফলতা কবে দেখবো?


এখন আমি সময় কে খুব শ্রদ্ধা করি। খুব মানি। আর যেসব ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গুলো স্কুলে , কলেজে প্রেম করে আড্ডা মেরে সময় কাটায় তাদের বলি, জীবনে প্রেম ভালোবাসা অনেক আসবে যাবে। আড্ডা দেয়ার জন্য সারাজীবন পরে আছে। আগে কেরিয়ার এ ফোকাস করা উচিত। লাইফে একবার সেই জায়গায় পৌঁছে গেলেই দেখবে জীবন সার্থক।


তারপর তো সময় সুযোগ বুঝে আড্ডা দেওয়া, প্রেম এসব করাই যায়। আমি একজন গৃহবধূ। আমার মুখে এইসব কথা মানায় না। অনেকেই ভাবতে পারেন, আমার কি এমন যোগ্যতা আছে যে এইভাবে কথা বলছি? আসলে আমি জীবনের এই স্টেজ টা পেরিয়ে এসেছি।


নিজের ভুল ভ্রান্তি গুলো খুব ভালো করে বুঝি এখন। তাই সকলকে পরামর্শ দিই। আগে সময়ের মূল্য বোঝো, ক্যারিয়ার গড়, তারপর সব কিছু। দেখবে বাকি জীবনটা খুব শান্তিতে কাটছে। 


আমার ব্যক্তিগত জীবনে সময়ের অপচয় এর কোন হিসেব ছিল না। স্কুল লাইফ টা প্রচুর আড্ডা দিয়ে কাটিয়েছি। সারা বছর বিশেষ পড়তাম না। টিউশন ছিল দুটো কিংবা তিনটে। টিউশন যাওয়ার পথে রাস্তায় হই হুল্লোড় টাই ছিল দিনের প্রধান আকর্ষণ। তাছাড়া স্কুল জীবন থেকেই টিউশন বন্ধ দিয়ে অনেক জায়গায় বান্ধবীরা মিলেই ঘুরেছি। আমার বাবার বাড়ি ছিল সিঙ্গুরে।


ওই সময় সিঙ্গুর প্লাটফর্ম থেকে সকাল 8 : 12 নাগাদ একটা আন্দোলন লোকাল নামে একটা ট্রেন ছাড়ত হাওড়ার উদ্যেশ্যে। ট্রেন টা আগের দিন রাতেই সিঙ্গুর স্টেশন এ চলে আসত। সারা রাত থেকে সকাল 8:12 ছাড়ত। আমরা কয়জন বান্ধবী সকালে কোনো কোনোদিন টিউশন না গিয়ে ওই ট্রেনে বসে আড্ডা দিতাম। 


টিউশন থাকতো সকাল 6 :00 টা থেকে 7:30 অবধি। ওই দেড় ঘন্টায় কে আর আসবে ওই ট্রেন টায়। সুতরাং ফাঁকা ট্রেন। কেউ দেখে ফেলার ও ভয় নেই। নির্ভয়ে আড্ডা দিতাম। আবার 7: 30 বাজলে ট্রেন থেকে নেমে পড়তাম। তারপর তো ওই ট্রেন এর প্যাসেঞ্জার হতো। 



মনে আছে শীতকালের সকাল গুলোর কথা। সকাল বেলা শীতের দিনে পড়তে যেতে ইচ্ছে হতো না। সোয়েটার চাদর নিয়ে ওই ট্রেন এ বাবু হয়ে বসে গল্প করার মজাই আলাদা। আবার যদি সেটা প্রেম, পিরিতের গল্প হত জমতো দারুন। এইভাবেই হারিয়েছি অনেক মূল্যবান সময়। এখন আফসোস হয়। 


তবে আমার সাথে যে সব বান্ধবীরা থাকতো তাদের সকলেরই জীবন বৃথা যায় নি। তাদের মধ্যে অনেকেই আজ সরকারি চাকুরী ও করে। কিন্তু সেভাবে আর যোগাযোগ নেই। 


তারপর এল কলেজ জীবন। এটা তো জীবনের খুব দামি একটা সময়। এই সময় টায় অনেকেই কম বেশি ফাঁকি দেয়। কিন্তু আমি ছিলাম মাত্রাতিরিক্ত ফাঁকিবাজ। আবার কলেজ কেটে ঘুরতে যাওয়া। এবার আর ছোট গন্ডির মধ্যে নয়, আরো বড়  বড় জায়গায় ঘুরতাম। কলেজ তো যেতাম ট্রেনে করে। উত্তরপাড়ায় কলেজ। কিন্তু কলেজ যাওয়ার নাম করে কখনো মালিয়া পার্ক, নিউদীঘা, ওয়ান্ডার ওয়ার্ল্ড কত কি পার্কে ঘুরেছি। বান্ধবীরা মিলে। 

time-pass-with-friends-in-the-way-picture



কলেজ এ পড়ার সময় শেওরাফুলি তে এক জায়গায় পড়তে যেতাম। সিঙ্গুর থেকে সকাল 6:50 ট্রেন ধরতে হতো। শেওরাফুলি নেমে এক একদিন পড়তে না গিয়ে গঙ্গা পেরিয়ে সেখান থেকে অটো ধরে ব্যারাকপুর থেকে ঘুরে আসতাম।


সত্যি এখন ভাবি স্কুল, কলেজ জীবন টাকে আমি কিভাবে নিজের হাতে নিজেই নষ্ট করেছি। আজ নিজের ভুল গুলো অকপটে এখানে শেয়ার করলাম। আমি যে ভুল গুলো করেছি আমি চাই না আমার সন্তান ও ওই একই ভুল করুক। তাই এ বিষয়ে আমি এখন থেকেই খুব শক্ত পোক্ত মা হতে চাই। শাসন একটু কড়া থাকাই ভালো। তবে যদি ছেলেটাকে মানুষের মতো মানুষ করতে পারি। 


আমি এখন থেকেই ছেলেকে বোঝাই সময়ের কি মহিমা। ওকে টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখাই। ঘড়ি দেখিয়ে সাব্জেক্ট করাই। একটা সাবজেক্ট এর জন্য বরাদ্দ 20 মিনিট। এই সময় এর মধ্যেই শেষ করতে হবে। অবশ্যই এতে বিরতির ও ব্যবস্থা আছে। 


আজ তবে ব্লগ টা এত টুকুই থাকুক। আর কিছু লিখবো না। আবার আসবো নতুন কোন পোস্ট নিয়ে। আর শেষ বারের জন্য আবার সকলকে রিকোয়েস্ট করছি বাবা, মা কে ফাঁকি দিয়ে নিজের সময় টা নষ্ট করে দেবেন না। সঠিক সময় টা কে লুফে নিতে হয়। সুযোগ বারবার আসে না। সেটাকে কাজে লাগাতে হয়।


ছবি : Ai generated

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ