প্রতিদিন আটা মাখা , একজন গৃহবধূর একটি একঘেয়েমি কাজ : মনের কিছু কথা

 

Whole-Wheat-flour-pest-picture



(আটা মাখার ছবিটা আমারই। কিন্তু ai দিয়ে একটু আকর্ষণীয় করেছি। )

দিন শুরু হয় ঠাকুরের নাম স্মরণ করে। মনটাও সকাল সকাল ফুরফুরে ই থাকে। তবে সেটা আর কতক্ষণ ! রান্নাঘরে পা রাখা মাত্রই আমার চোখ, হাত ,পা সবই আটার কৌটোর দিকে এগোতে থাকে। এটা আমার প্রায় প্রতিদিনেরই রুটিন। কিন্তু ওই কৌটো টা দেখলেই আমার মুখ টা কেমন বাংলার পাঁচ এর মত হয়ে যায়। মনটা কেমন যেন ভিতর থেকে কাঁদো কাঁদো রবে বলে - ' আবার আটা মাখতে হবে!' ধুর! ভালো লাগে না।


কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। যার যা কাজ ডিউটি তাকে করতেই হবে। রোজকার এই একঘেয়ে কাজ করে করে বিরক্তি এসে গেছে। যেন আর ইচ্ছে করে না এইসব করতে । তবু মন কে জোর করে মানিয়ে গুছিয়ে কৌটো থেকে আটা থালায় ঢালি। নুনের কৌটো থেকে এক চিমটি নুন হেলায় নিয়ে তাতে মেশাই। এবার মাখার পালা।


এসময় মন টা আরো ঘ্যানঘ্যান করে। এবার আর বিশেষ পাত্তা দিই না মনকে। এতক্ষণ এ যখন আটা ঢেলে নুন মিশিয়ে নেওয়া টা সহ্য করতে পেরেছি বাকি টুকু গায়ের জোরে করে ফেলবো। রোজই তো করি। সংসারে এই কাজটা করার দায়িত্ব এখন আমারই। আর এটা করার অধিকার কেবল আমারই আছে। কারণ আমি এই বাড়ির বউ। মনকে আবোল তাবোল সান্ত্বনা দিয়ে ঢেলে দিই পরিমাপ মত জল তাতে।



সাথে সাথে হাতের তালুটা অর্ধেক শুকনো ও অর্ধেক ভিজে আটায় কেমন জানি আটকে যায়। থালা থেকে হাত টা তুলে একবার দেখি। আর ভাবি উফফ! কতক্ষণে এটাকে বাগে আনবো। আঙুলে লেগে থাকা আটা আর থালায় থাকা আটার সাথে মিনিট তিনেক চলে দুস্তর মারপিট। আমার অস্ত্র কিন্তু জল। ওকে দিয়েই আমি এই আটার গুষ্টির ষষ্ঠী পুজো করবো। 


তিন মিনিট ঠেসা ঠেসির পর আটা আমার কাছে একদম পুরোপুরি জব্দ। জল ওকে একদম পাউডার ফ্রম থেকে মন্ড করে ফেলেছে এবার। মন টা এতক্ষনে একটু শান্ত হয়। ওফফ! আজকের মত তাহলে আটা মাখার পর্ব টা মিটলো। এবার পালা গুচি করা। ওটা করতে আমার মন কষাকষি হয় না। ফটাফট কয়েকটা লেচি কেটে দু হাতের তালুতে ঘুরিয়ে একটা ভদ্র আটার গুচির শেভ দিয়ে দিই।


আমি আবারও বলছি এই পুরো প্রসেসটা করতে কিন্তু আমার ভীষণ রাগ ধরে, বিরক্তি লাগে। আমি এইসব চিন্তা করতে করতে কাজ হাসিল করি নিজের কাছেই। যাই হোক এবার পালা আটা বেলার। বেলন, চাকতি টা এবার হাতে নিই। এই বোরিং কাজ টা যাতে ঝটপট হয়ে যায় নিজের কাছে নিজেই একটা চ্যালেঞ্জ নিই। কি সেই চ্যালেঞ্জ শুনবেন?


আহামরি কিছুই নয়। সোজা একবার তাকিয়ে দেখি ঘড়িতে কটা বাজে.. তারপর নিজের পরীক্ষার দিদিমণি নিজেই হলাম। এই, রুটি গুলো যেন পনেরো মিনিটের মধ্যে হয়ে যায়। নাহলে কিন্তু তোর কপালে দুঃখ আছে। ব্যাস, আমার হাতের স্পিড বেড়ে যায়। যাকে বলে একদম নাকে দড়ি দিয়ে তৈরী আমি ।সব কটা গুচির আটা বেলে ফেলি।


চাটু / তাওয়া বেলতে বেলতেই ওভেন এ ততক্ষনে চাপিয়ে দিয়েছিলাম। এবার ঝপাঝপ রুটি সেঁকে নেওয়ার  পালা। আটা বেলা, রুটি সেকা সব মিলিয়ে মাত্র পনেরো মিনিট সময়। ধড়ফড় , ধড়ফড় করে করতে থাকি। আবার টপটপ রুটি সিকতে গিয়ে যদি কাঁচা থেকে যায়, সেও বিপদ। আমি তো ফেল করলামই সাথে বর মশাই না জানি কি বলবেন। বলবে হয়তো অত ধড়ফড় করে কাজ কেন করো? ধীরে সুস্থে করতে পারো না? তোমার তো আর অফিস যাওয়ার জন্য ট্রেন এর তাড়া নেই । 


কথা গুলো মাথায় রেখেই রুটি করার ফাইনাল স্টেপ টা একটু সাবধানতার সাথেই করি। দু পিঠ উল্টে পাল্টে রুটি সিকে , হটপটে ভরে ছুটে গিয়ে একবার ঘড়িটা দেখে আসি। তখন নিজেকে নিয়ে  খুব গর্ব বোধ হয়। নিজেকেই নিজে বাহবা দিই। আহা! ঠিক টাইমের মধ্যে কি সুন্দর কাজটা করে ফেললাম। 


আসলে নিত্যদিনের এইরকম বোরিং কাজ গুলো আমি এভাবেই সম্পন্ন করি। এতে বিরক্তি ভেঙে কাজের জোশ আসে। আর আপনি যদি বিরক্তিকর কাজ গুলো মুখ বেজার করে করতে থাকেন, দেখবেন কাজ যেন এগোতেই চাইছে না। তাই এই পথ অবলম্বন করি।


এবার আপনারা বলতেই পারেন, রোজদিন আমিই কেন করি। সংসারে তো আরও অনেক মেম্বার আছেন, তাদের জন্যই তো আমি রান্নাটা করি। এক- এক দিন তো তারাও করতে পারেন। অবশ্যই পারেন। আমি বললেই  এই পরিবারের যে কেউ করে দেবেন। কিন্তু আমি বলি না। কারণ আমি জানি এটা আমার কাজ তাই এটা আমাকেই করতে হবে। আমি কারো ওপর খুব বেশি প্রত্যাশা রাখি না। আমার কাজ আমাকেই করতে হবে আমি এই নীতিতেই চলি। শুধু কাজটাকে একটু সহজলব্ধ করে নেওয়ার জন্য নিজের মনটার সাথে নিজেই মাস্টার গেম খেলে নিই।


কিন্তু আরেক দল হয়তো ভাববেন সংসার এর কাজ এমন আর কি কাজ। এত কিসের বিরক্তি। যদি অফিস, কাচারি, ব্যবসা সামলাতে হত বুঝতেন। কিন্তু এখানেও আমার একটা বক্তব্য আছে হাউস ওয়াইফ দের সাপোর্টে। দেখুন এখনকার জেনারেশন এ প্রত্যেকটা হাউস ওয়াইফ রাই অনেক শিক্ষিত। তাদের ও চাকরি, ব্যবসা সামলানোর মত শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে। শুধু পরিস্থিতি টা , কোন কোন ক্ষেত্রে জায়গা অনুকূল না থাকায় সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না।


আর রইলো বাকি বোরিং হওয়ার ব্যাপারটা। সংসারের কাজ নিত্য দিনের একই রকম। এর খুব বেশি হোলবদল হয় না। তাই কখনো কখনো কাজ করতে এক ঘেয়েমি লাগে। চাকরি, ব্যবসা র ক্ষেত্রে নিত্যনতুন আপডেট হওয়ার জায়গা থাকে, নতুন পরিবেশ, নতুন নতুন মানুষ জনের সাথে দেখা হওয়া, বাইরে বেরোনো। সব কিছু মিলিয়ে একটু নতুনত্বের স্বাদ।


কিন্তু হাউস ওয়াইফ দের এই চার দেয়ালের গন্ডির মধ্যেই থাকা কাজ গুলো নিয়ে নিত্য নাড়াচাড়া করতে হয়। তাই মুড সুইং হয়, মনটা ঘ্যান ঘ্যান করে , নিত্য দিনের একই কাজ গুলো মাঝে মাঝে বিরক্তি প্রকাশ করায়। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে এই সাংসারিক কাজ গুলো দিনশেষে তারা খুব পরিপাটি করেই সামলে নেয়।


আপনাদের ও সংসার এর এমন  কাজ আছে যা করতে বোরিং লাগে? এমন কি কোন কাজ আছে যেটা নিত্যদিন করতে করতে এক ঘেয়েমি এসে গেছে? তাহলে অবশ্যই আমায় কমেন্ট করে জানাতে পারেন। 


আজকের ব্লগ টা এত টুকুই। আবার ফিরবো আগামী কাল নতুন কোন ব্লগ নিয়ে। এখন বাজে ঘড়িতে বিকেল 3:32 মিনিট।  আজ তবে আসি। সকলে ভালো থাকবেন।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ