একজন অপরাধী মায়ের খোলা চিঠি : ছেলের পড়াশোনা ও দুরন্তপোনা ও তার সাথে পাল্লা দিয়ে আমার মেজাজ হারানো।

parenting-stress-mother-child-reletionship-picture



ইদানিং একটুতেই মেজাজ হারিয়ে ফেলছি। অল্প কিছুতেই মুড সুইং হয়ে যাচ্ছে। সারাদিনের কাজ বাজ ব্যস্ত শিডিউল এর মধ্যে থেকে নিজের জন্য আর এক্সট্রা করে টাইম পাচ্ছি না। তার ওপর নানারকম চিন্তা। সংসারের কাজ যেমন তেমন কিন্তু পরিবারের কোন সদস্যের যদি আবার শরীর খারাপের খবর পাই কেমন লাগে বলুন তো?


এদিকে আমি শশুর বাড়ির দিক থেকেও একমাত্র বৌমা । আমার দায়িত্ব এখানে অনেক। আবার বাবার বাড়িতেও আমি একমাত্র সন্তান। সেদিক টা নিয়েও আমায় ভাবতে হয়। মিথ্যে বলবো না, সবসময় মায়ের কাছে থেকে মা কে সাহায্য করা আমার হয় না। কিন্তু মা, বাবার জন্য আমি প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি।


আমার তাদের দিতে পারার মতো নিজস্ব আর্থিক সামর্থ্য নেই। কিন্তু যতটা পারি তাদের পাশে থাকি। তাদের জন্য প্রার্থনা করি। কিন্তু ইদানিং আমার দিদা এসে মায়ের কাছে আছে। তাঁর শরীর টা খুবই খারাপ। সেজন্য মনটা আমার আরও বেশি খারাপ। সংসারে থেকে কাজ করে হুটহাট করে দেখতে যেতেও পারি না। এই চাপা কষ্টের ব্যাথা সবাই বোঝে না। যার হয় সেই বোঝে। 


আমরা যারা গৃহবধূ বিশেষ করে যৌথ পরিবারে থাকি আমরা হুট হাট করে দ্রুত কোন ডিসিশন নিতে পারি না। আবার নিজের দরকার এ বেরিয়ে গেলে পরিবারের অন্য সদস্য দের অসুবিধা হতে পারে এসব সাত পাঁচ ভেবে অনেক সময় নিজের দরকার গুলো ও দমিয়ে রাখতে হয়। এইভাবে কাজের পর কাজের প্রেসার মানিয়ে নিতে নিতে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক।


অন্যদিকে সমস্ত রকম কাজ মিটিয়ে ছেলেকে নিয়ে পড়ার টেবিলে বসানো ও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সামনের মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর এ ওর পরীক্ষা। আমি একটা ওর জন্য রুটিন তৈরি করি প্রতি দিনের। আমি মনে করি প্রতি দিনের ছোট ছোট সফলতা গুলোই আগামী দিনের জয়ের পথ। কিন্তু এটা যদি নিজের জন্য রুটিন টা করতাম যা হোক করে ঠিক কমপ্লিট করতাম ই।


এটা তো ছেলের জন্য করা। বয়স মাত্র নয়। ওর মন এখন শিশু সুলভ। তার সাথে ও ভীষণ রকমের দুরন্ত। আমি সারাদিনের রুটিন মাফিক যা যা লিখে রাখি দিন শেষে যদি দেখি সব করানো যাচ্ছে না, টাইম এগিয়ে যাচ্ছে তখন ই আমার মেজাজ যায় হারিয়ে। 

parenting-stress-mother-child-reletionship-picture



আচ্ছা, আমি তো সংসারের সমস্ত কাজ বজায় রেখে , পরিবারের সকলের জন্য আলাদা আলাদা রান্না বান্না করে, আনুষঙ্গিক সব কাজ করে টাইম ম্যানেজমেন্ট করে ওকে পড়াতে বসাই। তারপরেও যদি ও পড়ার সময় অমনোযোগী হয়, পড়তে না চায় নানারকম বাহানা দেয় কেমন লাগে বলুন তো?


আর প্রতিটা দিন সন্ধ্যে বেলায় পড়তে বসেই একবার বলবে জল খাবো, একবার বলবে টয়লেট যাবো, এক বার বলবে পটি পেয়েছে। আমি না সত্যি বলছি, আমি আর পেরে উঠছি না। পড়াটা এগোচ্ছে না শুধু ওইসব করে সময় কাটিয়ে দিচ্ছে। 


একবার টয়লেট যাওয়ার নাম করে ওয়াশ রুমে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আবার ওকে সেখান থেকে টেনে টেনে নিয়ে আসা। কারো ভালো লাগে বলুন তো? আর শুধু বলবে জল খাবো। যদি বারণ করি বলবে, পাপাই কে বলে দেব। মানে ওর বাবাকে। 


তাহলেই এবার ওর বাবার সাথে আমার অশান্তি বাঁধবে। বলবে ছেলেটাকে জল টা পর্যন্ত খেতে দাও নি? এত পড়াশোনা? ওরকম পড়াশোনার দরকার নেই। আমার ছেলেটা এমনি সময়ে জল খেতে চাইবে না। আর পড়ার সময় অনেকটা করে জল খাবে আর টয়লেট যাবে। 


গতকাল একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। একেই দিদার জন্য মনটা খারাপ। সংসারের কাজের চাপ। সামনেই ছেলের পরীক্ষা। সব কিছু কাজ বজায় রেখে মাথা ঠান্ডা রেখে রুটিন মাফিক সব শেষ করবো সেই উদ্দেশ্য নিয়ে পড়াতে বসেছি। সেই একই বদমাইশি করে যাচ্ছে। কখনো শুয়ে পড়ছে, কখনো লিখতে বলছি যখন অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। কখনো জল খাবো, টয়লেট যাবো । আমার ধিতকার এসে যাচ্ছিল।


বার বার লিখতে বলছিলাম,  শুধু বলছি, তাড়াতাড়ি লেখ নাহলে পরের সাব্জেক্ট গুলো কভার করানো যাবে না। রাত হয়ে যাচ্ছে। সে কে কার কথা শোনে। চুপ করে বসে আছে। রাগের মাথায় পিঠে দিয়েছিলাম এক ঘা। ওমনি কাঁদতে কাঁদতে পাপাই এর কাছে গিয়ে রিপোর্ট দিয়ে দিল। সেই নিয়ে এবার তর্কাতর্কি স্বামী - স্ত্রী এর মধ্যে। 


আমি রাগে , দুঃখে, হতাশায় বলি আমি আর ওকে পড়াতে পারছি না। ও আমার একটা কথাও শোনে না। ওর জন্য একটা টিউশন টিচার দাও। আর আমায় রেহাই দাও। যখনই এমন অশান্তি হয় আমি টিউশন টিচার এর কথা বলি। ওর বাবার সেই একই বক্তব্য। সব বাচ্চারা কি সমান হয়? কেউ একটু বেশি দুরন্ত। কেউ বা শান্ত। যে বাচ্চা যেমন তাকে তেমন করে পড়াতে হবে। মা কে ওত ধৈয্য হারা হলে চলে না।


আমার সবচেয়ে কষ্ট কোথায় জানেন? ছেলেকে ভালোবেসে বোঝায় আমার বর। আর আমায় ঝাঁঝি দিয়ে কথা বলে। বলবে, সংসারের ওইটুকু কাজ করেই মেজাজ হারিয়ে ফেলছ তাহলে যদি বাইরে কাজ করতে চাকরি বাকরি করতে তাহলে কি করতে গো? রাগের চোটে? 


অনেক মানুষ রা ভাবে সংসার সামলানো টা কি এমন কাজ। কিন্তু দিনের পর দিন বিনা পারিশ্রমিক এ যারা এই কাজ টা করে তারাই জানে। যখন আমার মনের অসুখ টা কেউ বুঝতে না পারে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। 


আচ্ছা, আপনারাই বলুন আমর মতো যারা  হাউস ওয়াইফ আমরা তো ওদের জন্যই করি। বর এর সেবা যত্ন সন্তানের খেয়াল এসবই তো আমাদের কর্তব্য। এই নিয়েই তো আমাদের দুনিয়া। আর তারাই যখন দিন শেষে আমাদের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তোলে , কেমন লাগে?  আমার বুকের ভিতর টা কত টা হাহাকার করে ওদের বোঝাতে পারি না।  সব কিছু যেন শূন্য লাগে। সারাদিনের ক্লান্তির পর , একরাশ ব্যর্থতার তকমা গায়ে মেখে শুতে যাই।

parenting-stress-mother-child-reletionship-picture


নীরব কান্নায় ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে ভোর হয়। এত কিছু ওরা জানতেও পারে না। কারণ গোটা পৃথিবীর মতো তারাও তখন একটা নতুন দিনের সূচনায় নতুন কাজ এর উদ্যোগের জন্য শরীর , মন কে তৈরি করছে। আর আমি ক্লান্ত শরীরে নিজের সবটুকু অপমান, গ্লানি নিয়ে ডুকরে কাঁদছি। 


আর এভাবেই ভেঙে পরতে পরতে আবার উঠে দাঁড়াবার সাহস ও পেয়ে যাই মনের অজান্তে। হয়তো সে সময় ঈশ্বর আমার পাশে এসে তার ভরসার হাত টা আমার মাথায় ছোঁয়ায়। আমি কান্না থামাই। মনটা শান্ত হয়। ঘড়ির কাঁটা জানান দেয় 3:30 টের ব্রম্ভ মুহূর্তের সময় এটা। আমি সব কিছু ভুলে ঝেরেমেরে বিছানা থেকে উঠে বসি। আবার ঈশ্বর সাধনায় বসি নিত্যদিনের মতো। একটা দৈব শক্তি যেন আমার শরীর টাকে আবার সতেজ করে তোলে। 


প্রার্থনা সেরে আবার বিছানায় ফিরি। ছেলে স্বামীর মাঝে এসে আবার শুয়ে পড়ি। মাত্র 2 ঘন্টার জন্য। এত টুকুই আমার বরাদ্দ। কারণ এখন বুঝছি বাকি রাত টা হেলায় হারিয়েছি। আর সময় নেই। আমায় এই লড়াই এ জিততেই হবে। সংসার , স্বামী, সন্তান সব আমার। ওরা সব আমার ছত্র তোলে বড় হয়। আমি ভেঙে পরলে গোটা সংসার টাই ভেঙে পরবে।


সন্তান আমার ছোট। এই বয়সে দুস্টুমি করবেই। ভালো, মন্দ মিশিয়েই মানুষ। আমাকেই ওকে আদর্শ করে তুলতে হবে। এ প্রতিজ্ঞা আমার হওয়া উচিত। আর ঈশ্বর যেন ব্রম্ভ মুহূর্তে এই কথা গুলোই আমায় শিখিয়ে দিয়ে গেলেন। আমি হাল ছাড়বো না। নতুন লড়াই এ নামার জন্য যুদ্ধ বিরতিতে গেলাম। 


আর এভাবেই আমার নতুন দিনের সূচনা হয়। আমার মেজাজ ঠিক হয় ঈশ্বর সাধনা তেই। ধ্যান এর একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। যা আপনার মনকে শান্ত করতে পারে। আপনাকে সাহস জোগাতে পারে। আর পারে আপনাকে হারতে হারতে জিতিয়ে দিতে।


আমিও এইভাবেই প্রতিটা দিনের প্রস্তুতি নিই। গত কাল পারি নি তো কি হয়েছে, আগামী কাল নিশ্চই ছেলেকে রুটিন মাফিক পড়াতে পারবই । এই প্রতিজ্ঞা নিয়েই আমার প্রতিটা সকাল শুরু হয়। আর নিয়ম মাফিক সকল কাজ শুরু করি। আর পরিবারের সদস্যদের সাথে হওয়া ছোট খাটো মত ভেদ, কষ্ট, অপমান গুলো হাসি মুখে ক্ষমা করে দিই। আর এই শিক্ষা আমায় ঈশ্বর ই দিয়েছেন। 


আজকের ব্লগটা এত টুকুই। আবার ফিরবো আগামী কাল নতুন কোন পোস্ট নিয়ে। এখন ঘড়িতে বাজে রাত 11:30 মিনিট।  আজ তবে আসি।


ছবি : AI Genareted

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ