- (আর্য্য) মা, এই তিন পাতা ম্যাথের হোমওয়ার্ক, আর ল্যাঙ্গুয়েজের ওই দু পাতা হোম ওয়ার্ক করলেই তো ছুটি হয়ে যাবে ?
সোমা কিচেনে রান্নায় ব্যস্ত ছিল। গরম কড়াই এ মাছটা ছেড়েই ওভেনের আঁচটা কমিয়ে দিয়ে রুমে ঢুকলো ।
- (সোমা) না, না । এখনো অনেক হোমওয়ার্ক বাকি আছে আর্য্য। সারাদিনে এটুকু পড়লে ভালো নম্বর পাওয়ার আশা তো ছেড়েই দিলাম। পাশ টুকুও করতে পারবি না ।
খাতার পাতা থেকে চোখ তুলে, মনখারাপি - আদুরে গলায় আর্য্য বললো,
- মা, আজকেও রোজকার দিনের মতো অতক্ষণ পড়তে হবে?
অবাক হয়ে সোমা জিজ্ঞাসা করলো নয় বছরের ছোট আর্য্যকে,
-কেন আজকে কি এমন দিন যে , সাততাড়াতাড়ি পড়াশোনার পাঠ তুলে দিতে হবে?
- (আর্য্য) আজ তো পঞ্চমী মা। সব পাড়ায় পাড়ায় পুজো মণ্ডপে দুগ্গা মা আসছে। আর কি পড়তে ভালো লাগে? মোবাইলে তো দেখলাম কলকাতায় কত ভিড় ঠাকুর দেখার। কত বাচ্চারা গেছে। ওরা তো কেউ পড়তে বসে নি।
সোমা, একটু হেসে বলল, আচ্ছা দেখছি ব্যাপারটা। আগে মাছটা কড়াই থেকে নামিয়ে দিয়ে আসি।
আর্য্য পুনরায় আঙুলের কর গুণে ম্যাথ সলভ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। খানিক বাদেই সোমা আবার রুমে প্রবেশ। করলো।
- আর্য্য ,পঞ্চমীর দিন কলকাতায় দুর্গা ঠাকুর দেখার ভিড় হয় ঠিকই কিন্তু আমাদের এখানে তো পঞ্চমী থেকে ঠাকুর দেখার ওতো হৈ হৈ হয় না। তুমি আর একটু পড়ে নাও আজ কেমন? কাল থেকে ছুটি পাক্কা।
বড় বড় চোখ করে একরাশ কৌতূহলের সাথে আর্য্য জিজ্ঞাসা করলো,
- কেন মা কলকাতার মতো আমাদের এখানেও আজ থেকে ঠাকুর দেখার , পুজো মণ্ডপে ভিড় হয় না?
- এটা তো পাড়া গাঁ। এখানে পুজোর ওতো আলোর রোশনাই, প্যান্ডেলের চাকচিক্য নেই। কিন্তু পুজোর এই পাঁচ দিন আনন্দ আছে অফুরন্ত। খুব মজা হয় তোর এই কয়দিন তাই রে আর্য্য?
খাতাটা চটপট বন্ধ করে, আর্য্য তার মায়ের পাশে এসে বসলো।
- সেতো হয়ই। প্রচুর আনন্দ হয়। মা এবারও কিন্তু আমার ক্যাপ , বন্দুক চাই। ফুলঝুরি, আতস বাজি, তুবড়িও। কবে কিনে এনে আনবে বাবা?
একরাশ গালে হাসির ঝিলিক টেনে সোমা আশ্বস্ত করে বললো
- আনবে রে। তোর বাবা বাজার গেছে। বলেছে আসার পথে কিনে আনবে। সবকিছু। পুজো বলে কথা। তোর জন্য সব কিছু বাবা আনবে।
কি মজা, কি মজা! আর্য্য দু হাত তুলে নাচতে লাগলো। আর সোমা ও ছেলের আনন্দ দেখে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। আর ভাবলো পুজো তো এদেরই। আনন্দ, উৎসব গুলো তো বাচ্চাদের জন্যই। ওদের হাসিখুশি দেখলেও চোখটা জুড়ায়।
- ওমা, বাবা কিন্তু আমায় নিয়ে যেতে পারতো। আমি পছন্দ করে কিনতাম?
- আচ্ছা, ঠিক আছে। পরের বার বলব নিয়ে যেতে। তখন পছন্দ করে কিনবি।
ওই দেখো। কলিং বেলের আওয়াজ। তোর বাবা চলে এসেছে। যাই দরজাটা খুলে দিয়ে আসি।
আর্য্য ও লাফাতে লাফাতে সোমার সাথে সাথে দরজা অবধি এলো। দরজাটা খুলতেই,
- ( পার্থ, আর্য্যর বাবা ) এই নাও। সবজির ব্যাগটা ধরো। আর আর্য্য তুই একটা জামা, প্যান্ট পরে রেডি হয়ে নে।
- ( আর্য্য) তুমি আমার জন্য বন্দুক, ক্যাপ কিনে আনো নি বাবা?
- (পার্থ) না রে, এ বছর ভাবলাম তোকে নিয়ে গিয়েই তোর পছন্দ মতো কিনে দেবো। তাই বলছি রেডি হয়ে নে। আমি আর বাইক ভিতরে ঢোকাবো না। ওয়েট করছি। তাড়াতাড়ি যা।
- (সোমা) বাহহ! ছেলেকে ভালোই প্রশ্রয় দিচ্ছ দেখছি। নিজে পছন্দ করে আনলেই পারতে এবছরটা। পরের বছর না হয়....
- ( পার্থ) ওহ! সোমা। ছেলে এখনো ওতো টাও ছোটো নেই। ওরও তো একটা পছন্দ - অপছন্দ আছে নাকি?
তাছাড়া আমি আসার সময় দেখলাম অসিত দা ওর ছেলেকে নিয়ে বাজি, রংমশাল কিনতে গেছে। কি সুন্দর বাচ্চাটা ছোট ছোট হাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পছন্দ করে খেলনা , আতস বাজি কিনছে। এই সব দৃশ্য দেখলেও চোখ জুড়িয়ে যায়। এখনই তো সময় একটু আনন্দ করার করে নিক।( একটু থেমে) আর ভগবান যখন আমায় এতটুকু কৃপা করেছেন, সাধ্যমত এটুকু কিনে দেওয়ার- তবে আমিই বা কেন এই আনন্দ দৃশ্য থেকে বিরত থাকি বলো ?
- ( সোমা) তুমি ঠিকই বলেছ বাচ্চারা যতদিন ছোট থাকবে ততদিনই তারা একটু আনন্দ মজা করবে। তারপর তো আস্তে আস্তে পড়াশোনার চাপ, চাকরি , বাক রি ,দায়িত্ব ,কেরিয়ার এসবের মাঝে আটকা পরে পুজোটা আর এইভাবে কি উপভোগ করতে পারবে? সত্যি, পুজো তো ওদেরই আমরাও তো ছোটবেলায় কত আনন্দ করেছি হইহুল্লোড় করেছি। কিন্তু এখন বড় হয়ে সংসারের মাঝে আবদ্ধ হয়ে দায়িত্ব, কর্তব্যের ভিড়ে কোথায় যেন সেই উচ্ছাসগুলো হারিয়ে ফেলেছি। এখন আর পুজো আসলে সেই ছোটবেলাকার মতো উৎসাহ জাগে না।
- ( আর্য্য) বাবা ,চলো আমি রেডি।
মা, আমি হোমোওয়ার্ক গুলো এসে করে নেব।
- ( সোমা) ওরে আর হোমওয়ার্ক করতে হবে না। যা আজ থেকেই পূজোর ছুটি দিয়ে দিলাম।
কথাটা শোনা মাত্রই আর্য্য খুশিতে লাফাতে শুরু করে দিল।
আর্য্যর মুখের সেই বাঁধ ভাঙ্গা হাসি দেখে সোমা আর পার্থ ( আর্য্যর বাবা) একে অপরের দিকে চেয়ে মুচকি হাসলো।
-( সোমা) , কিন্তু আর্য্য তুই তো চুল না আঁচড়িয়েই বেরিয়ে পড়েছিস। জিভ কেটে আর্য্য আবার রুমের দিকে ছুটল ।
এই ফাঁকে পার্থ একটু সোমার সাথে রোমান্সে মেতে উঠল।
পার্থ একটু সোমার দিকে ঝুঁকে এসে বলল,
-( পার্থ) তোমার কি লাগবে বলো, চাইলে আমাদের সাথে যেতে পারো ।
- (সোমা) ধুর! আমার আবার কি লাগবে? শাড়ি, চুড়িদার কসমেটিকস সবই তো কিনে দিয়েছো।
- ( পার্থ) তবুও যদি কিছু আতশবাজি কিংবা বেলুন লাগে?
- ( সোমা) পাগল নাকি ছেলেরই আর বেলুন নিয়ে খেলার বয়স নেই। আবার আমায় শুধোচ্ছে।
- ( পার্থ) তুমি তো ছেলের চেয়েও বাচ্চা। মাঝে মাঝে অবুঝের মত এমন ঝগড়া করো, অভিমান করো গাল ফুলিয়ে বসে থাকো।
- (সোমা) ধ্যাত, যাও তো । আর্য্যকে নিয়ে খেলনা কিনে নিয়ে এসো । আমার মেলা কাজ পরে আছে কিচেনে।
-( পার্থ) বাবা এ তো দেখছি লজ্জায় লাল হয়ে গেছে সেই কিশোরী বেলাকার প্রেমিকার মতো। লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে গেছে মুখ খানা।
ওদের দুজনের কথোপকথনের মাঝে শুনতে পাওয়া গেল দূর থেকে ঢাকের শব্দ , শঙ্খের প্রতিধ্বনি বাচ্চাদের কোলাহল আর বড়দের চিৎকার।
- ( পার্থ) ওই যে বুঝলে সোমা, আমাদের পাড়ারও মা দুর্গা চলে এলেন। আর্য্যকে ডাকো ।এক্ষুনি এখান দিয়ে ঠাকুর যাবে । ইতিমধ্যেই আর্য্যও ঢাকের শব্দ শুনে রেডি হয়ে বেরিয়ে এসেছে। এরপর মা দুর্গা ও তাদের সন্তানদের দর্শন করে আর্য্য মহানন্দে বাবার সাথে চলল আতশবাজি , খেলনা বন্দুক, ক্যাপ কিনতে । অবশ্য মাকে বলে বেরোলো-
- ( আর্য্য ) বাজি কিনে ফিরে কিন্তু আর পড়াশোনা নয়। সোজা পুজো মণ্ডপে যাবো।
মুচকি হেসে চোখ টিপে সম্মতি জানালো সোমা।
আর মনে মনে বলল, একটা বছর পর আবার মর্ত্য লোকে এলো আমাদের উমা। মা দুর্গা, তুমি সকলের মঙ্গল করো। ভালো করো। পুজোর এই কটা দিন তোমায় এবং তোমার সন্তান সন্ততিদের নিয়ে আমরা যেন সকলে মহানন্দের সময় কাটাতে পারি।
সমাপ্ত
বাঙালির সেরা উৎসব দুর্গা পুজো আসতে আর মাত্র হাতে গোনা একুশ দিন বাকি। এই দুর্গা পূজা উপলক্ষ্যেই আমি একটি পারিবারিক গল্প লিখেছি। মূলত এটি কথপোকথন ঘরানায় লেখা। আপনাদের পড়ে কেমন লাগলো অবশ্যই জানাতে ভুলবেন না।

0 মন্তব্যসমূহ