( তাল চাঁচা হলো। আমার ছবি কোয়ালিটি ভালো নয়। তবু দিলাম।)
অন্যান্য দিনের মতো আজকের বিকেল টা সাদামাটা ছিল না। নিত্যদিনের কাজের একটু হোলবদল হয়েছিল। বিকেলের দিকটা আমি সাধারণত একটু হাঁটতে বেড়োই। ওই ধরুন বিকেল ৫:০০ টা থেকে ৫:৪৫ মিনিট অবধি। শুধু আমি একা যাই না। একা একা আর রাস্তা হাঁটতে ভালো লাগে বলুন না? আমার একটা বান্ধবী আছে । দুজনে মিলে যাই।
আজকের বিকেল এ হাঁটতে যাই নি। কারণ বাড়িতে এসে গিয়েছিল ভাদ্র মাসের সেই বিখ্যাত তাল। এখনো অবশ্য শ্রাবণ মাস। কিন্তু তাল সে অল্প বয়সেই পেকে গেছে। যাকে বলে সময়ের আগেই সে পরিণত , রঙে, ঢঙে, গন্ধে ভরপুর। বছরে এই প্রথম হবে আজকে তাল দিয়ে কিছু রান্না। তাল দিয়ে কি করবো ভাবতে ভাবতেই তাল চাঁচতে বসে পরলাম।
হ্যা, আর বান্ধবীকে বলে দিলাম আজকে আর হাঁটতে বেরোব না। তবে সে যেন আমাদের বাড়ি আসে। ভাবলাম বান্ধবী বাড়ি আসলে ভালোই হবে। প্রথমত , দুজনে গল্প করতে করতে রাধবো। আর দ্বিতীয়ত, এই সময় তো হাঁটতেই বেরোনো হয়। আজ না হয় হেঁশেল এই আড্ডা টা সেরে ফেলা যাবে। সাথে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া।
সব মিলিয়ে একটা জমজমাট সন্ধ্যা। এখানে শহরের মত চাকচিক্য রেস্টুরেন্টের বাহারি খাবার নেই, বিদেশি গানের মৃদু সুরের আভা নেই। নেই কোন ঠান্ডা মেশিন। আছে একরাশ ভালোবাসায় পূর্ণ বাঙালির সেই ঐতিহ্য রান্না তালের বড়া। এ স্বাদের রেটিংস কখনো তলানিতে ঠেকবে না। হরেক রকম রেসিপি আবিস্কার হবে, মানুষ তার স্বাদ ও নেবে। কিন্তু কখনোই ভুলতে পারবে না পুরোনো দিনের এইসব রান্নার টেস্ট।
তাল চাঁচা প্রায় শেষ। বান্ধবী হাজির। বললাম , কি খাবি বল- তালের ফুলুরি, তালের লুচি, তালের রুটি, তালের বড়া, তালের ক্ষির, তালের পায়েস কোনটা। বলে,
- থাম, থাম । এবার একটু মুখটা বিশ্রাম নে। আমি জানি, তুই হরেক রেসিপি জানিস। তবে একসঙ্গে এত কিছু করতে গেলে রান্না ঘরের পচা গরমে মরেই যাবি। তারপর লোকে বলবে বান্ধবীর জন্য রান্না করতে গিয়ে অতিরিক্ত গরমে ছবি হয়ে গেছে। এক কাজ কর তালের ফুলুরি কর।
- যা, আজ্ঞা করবেন, তাহাই হবে।
দুজনে খুনসুটি করতে করতে রান্নার প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। তাল তো চাচা হয়েই গিয়েছিল। এদিকে বান্ধবী কিন্তু আমার কুঁড়ে নয়। ও হাতে হাতে সব কাজ করে দেয়। মিলেমিশে করি কাজ। খেতে খারাপ হলেও নেই লাজ। আমার রান্না ঘরে কোথায় কোন জিনিসটা থাকে সবই তার নখ দর্পণে।
এক এক করে এবার আটা, সুজি, চিনি সহযোগে তাল মেশানোর কাজ শুরু হলো। সাথে গল্প। এভাবে কাজ করতে থাকলে কাজটা যেমন করতেও ভালো লাগে তেমন দেরিও হয় একটু। কারণ কাজে ঢিলেমি, কথা বেশি। জানেন, তালের মিশ্রণ টা তৈরি করতে করতেই দুজন কাঁচাই একটু চেকে দেখে নিলাম মিষ্টি ঠিক হয়েছে কি না।
এবার ভাজার পালা। বান্ধবী বলে তুই বোস। আমি ভাজছি। এদিকে রান্না ঘর থেকে জানালায় উকি দিয়ে দেখলাম সূর্য্যি মামার আলো প্রায় নিভে এসেছে। গাছ পালার আড়াল দিয়ে অল্প অল্প আলো আর পাতার ছায়া মিলেমিশে সন্ধের আবহ তৈরি করছে।
বান্ধবী বললো, এবার কিন্তু দেরি হয়ে যাচ্ছে। চটপট করে নিই। নাহলে বাড়ি যেতে দেরি হয়ে যাবে। সত্যিই তাই। এবার সন্ধ্যা শীতল দেয়ার ও সময় হয়ে আসছে। কাজ মিটিয়ে ফেলাই ভালো।
তেল গরম হতেই তালের মিশ্রন বান্ধবী গোল গোল করে ছেড়ে দিল কড়াই এ। একটা একটা গোল হচ্ছে, একটা একটা টেরা বাঁকা। দুজনেই মানে এই কাজে সমান দক্ষ। আমার তো গোল হয়েই না। ও তো তবু পারে । এবার তাল এর ফুলুরি গুলো লাল লাল করে তুলে নামানো হলো।
( তালের ফুলুরি তৈরি হয়ে গেছে। কেমন লাগছে দেখতে?)
রান্না ঘরটা তাল ফুলুরি ভাজার সুগন্ধে মেতে উঠলো। প্রায় এক বছর পর আবার সেই চেনা ঘ্রাণ , চেনা স্বাদ। আহা, এর অনুভূতিই আলাদা। তাল ফুলুরি আমাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। খাঁটি বাঙালিয়ানার সাথে জুড়ে আছে। এর স্বাদ, এর গন্ধ যুগ যুগ ধরে বাঙালির রান্না ঘরে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে থাকবে।
গ্যাস অফ করে গরম গরম দুজনে কয়েকটা ফুলুরি দুজনে খেলাম। একে অপরকে খাইয়েও দিলাম। তারপর একটা টিফিন বক্সে ভরে ওর বাড়ির জন্য কয়েকটা পাঠিয়ে দিলাম। জানেন তো , আমরা গ্রামে ঘরে থাকি। ভর সন্ধ্যে বেলা এইভাবে কোন খাবারের জিনিস বড় রা নিয়ে যেতে বারণ করেন। তাই একটা পলিব্যাগে টিফিন কৌটো দিয়ে পাশে একটু সর্ষের দানা ও একটা শুকনো লংকা দিয়ে দিলাম। মদ্দা কথা হলো, এতে নাকি ভূত , প্রেত নজর দিতে পারবে না।
আমি কুসংস্কার মানি না। কিন্তু গুরুজনদের মানি। ওনারা যেটা পরম্পরায় মেনে আসছেন ওনারাও চান ওনাদের পরবর্তী প্রজন্ম ও যেন সেটা মেনে চলে। আমি ভেবে দেখি এতে উপকার বিশেষ না হলেও অপকার তো হচ্ছে না। আর তাতে সংসারে শান্তিও বজায় থাকবে। তাই আর কি!
যাই হোক, তালের ফুলুরি গুলো কিন্তু খেতেও ভালো হয়েছিল। আর তার রূপ টাও তেমন ই সুন্দর লাল হয়েছিল। আজকের বিকেল টা এইভাবেই হেসে রেঁধে কেটে গেল। মাঝে মাঝে এইরকম সময় কাটাতেও মন্দ লাগে না।
আপনাদের ও কি এই বছরে তালের রেসিপি রান্না করা হয়েছে? না কি এখনো হয় নি? অবশ্য অনেক জায়গায় এখন তাল পাওয়াও যায় না। শহরে এলাকা গুলোতে তাল এখন খুব একটা পাওয়া যায় না। কিন্তু অনলাইনে এখন তালের প্ল্যাপ পাওয়া যায়। সেটা দিয়েও নানান রকম তালের পদ করা যায়। আমি অবশ্য করি নি। ইউটিউবে দেখেছি।
আজকের ব্লগ টা তবে এত টুকুই। আবার ফিরবো নিত্যদিনের কোন আবেগ অনুভূতির গল্প নিয়ে। আজ তবে আসি। অনেক রাত হলো। সময় এখন রাত ১১:২২ মিনিট।


0 মন্তব্যসমূহ