একটা সদ্য বা নববিবাহিতা মেয়ের জীবন কেমন হয়? তার জীবনসঙ্গী কেমন হয়? (রইলো মনের কিছু কথা)

 

payes-recepi-picture-story

তারপর একটা সময়ের পর বাবা তার রাজকন্যার বিয়ে দেন। আদরের দুলালী চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে নতুন সংসারে পা রাখে। নতুন বাড়ি, নতুন ঘর , নতুন পরিবেশ সব কিছুই তার কাছে এখন পরিচয়হীন। কিন্তু এই বাড়ির পরিচয়েই পরিচিত হয়ে সে এসেছে। সুতরাং হোক তা যতই অপরিচিত এক লহমায় তাকে আপন করে নিতে হবে এটাই সমাজের নিয়ম।


সমাজের এই নিয়ম কে উপেক্ষা করে নিজের পরিচিত গন্ডির রীতি নীতি ফলানো এখানে যায় না। এই বাড়ি টার নাম শ্বশুর বাড়ি। এখানে বাবার বাড়ির রীতি নীতি গুলো সব সময় খাটে না। মানিয়ে নিতে কষ্ট হলেও  মুখ ফুটে টা বলা যাবে না। খিদে পেলে "মা গো , জোর খিদে পেয়েছে। খেতে দাও" এই সব বলে চিৎকার চেঁচামেচি করা মেয়েটাও কেমন যেন ক্ষুধা সহ্য করে নেয়। 


দুরন্ত গতিতে হেঁটে চলা মেয়েটার এখন চলন ধরণ বেশ শান্ত হয়ে গেছে। নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে কষ্ট হলেও মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারে না। অত ভোর বেলা স্নান করার অভ্যাস নেই। তাও এখানে করতে হয়। ঠান্ডা লেগে সর্দি হয়েছে। সাথে ঘুষঘুষে কাশিও। কাশতে গেলেও ভয় পাচ্ছে। পাছে পরিবারের অন্য কারো যদি অসহ্য লাগে। প্রানপনে কাশি দমানোর চেষ্টা করে। তবে বৃথাই সে চেষ্টা। 


কাশতে দেখে বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা ছেলের পিসি ঠাকমা বলে বসেন, দেখো কান্ড বিয়ে হতে না হতেই সর্দি , কাশি। একি ব্যারামে বউ এসে জুটলো না কি। আদরের দুলালীর চোখ টলমল করে উঠলো। মুখে কিছু বলতে পারল না। আড়াল থেকে শুনে আঁচলে চোখ মুছলো। 


ঘরে এসে দুঃখে, কষ্টে দোর বন্ধ করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। পরক্ষণেই , ওমা বৌমা, সাত সকালে দোর দিলে কেন গো? তোমার কি লজ্জা সরম কিছুই নেই। বাবার বাড়ি থেকে কি কিছুই শিখিয়ে পাঠায় নি ? 


সঙ্গে সঙ্গে দোর খুলে জবুথবু হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। 

- ও কি বৌমা, নতুন সবে বিয়ে হয়েছে। গুরুজন দের সামনে মাথায় ঘোমটা টা দিতে হয় সে টুকুও কি তোমার জ্ঞান নেই?

থতমত খেয়ে মাথায় ঘোমটা দিল। কান্না মাখা চোখ গুলো তখন ও ভেজা ভেজা। 

- শোনো বৌমা, বিয়েতে যারা এসেছিলেন তার মধ্যে যে কয়জন আত্মীয় আছেন, তারা আজই বাড়ি চলে যাবেন। তাদের ইচ্ছা তোমার হাতে রান্না খাওয়ার।

ভয় নেই। সব রান্না করতে হবে না। পায়েস টুকু করবে। পারবে তো নাকি?

- ঘাড় নেড়ে নীরব সম্মতি জানাল নতুন বউ।

এটুকু সে করতে জানতই। শ্বশুর বাড়িতে এসে প্রথম রান্না করা। যেমন ভয় , তেমন একটা রোমাঞ্চকর ঘটনাও বটে। 

কে না চায় তার রান্নাটা ভালো হোক। খুব মন দিয়ে পায়েস রাঁধলো সে। 

খাবার পাতে বসে অনেকেই পায়েস নিয়ে নানারকম ভালো মন্দ আলোচনা শুরু করে দিল। কেউ কেউ তো বলেই ফেলল একদম সুগার ফ্রি পায়েস হয়েছে। মিষ্টি এত কম কেউ দেয় পায়েস এ?

আত্মীয় দের নানারকম সমালোচনা শুনে শ্বাশুড়ি মা গেলেন বেজায় চোটে। নতুন বউ মুখ বুজে নিজের ব্যর্থতা শুনে গেল। ঘরে এসে নীরবে রাতে চোখের জল বালিশ ভিজিয়ে দিল। হঠাৎ একটা হাত তার কপাল স্পশ করলো। মেয়েটা একটু কেঁপে উঠলো। তড়িঘড়ি চোখের জল মুছে নিল।

বর কে কিছু বলার আগেই , জড়িয়ে ধরে বলল, দুপুরে তোমার রান্না করা পায়েস টা খুব সুন্দর খেতে হয়েছিল। হয়তো দুপুরে গরম গরম খেতে পারলে আরো ভালো লাগতো । কিন্তু কি করবো বলো? অফিস এর তো ছুটি বেশি পেলাম ই না। ওই বিয়ের তিনটে দিন শুধু।

- কিন্তু ওসব বাদ দাও, আগে বলো তো  এত রাতে তোমার চোখে জল কেন? 

স্বামীর মুখে নিজের রান্নার প্রশংসা শুনে স্বামীর বুকে মাথা রেখে সে আরো ডুকরে কেঁদে উঠলো।

- কি হয়েছে, তুমি আমায় বলো। আমি তোমার স্বামী। আমি তোমায় অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করে এ বাড়ি তে এনেছি। তোমার চোখের জল মানে এ বাড়ির অমঙ্গল। 

স্বামীর বুকে মাথা রেখে দুপুরের ঘটনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সব বললো সদ্য বিবাহিতা মেয়েটি। 

কিন্তু সদ্য বিবাহিত ছেলেটি সে রাতে বউ কে আর না কাঁদার আশ্বাস ছাড়া বাড়তি কোন কথাই বললো না। 

ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন বউ ঘুম থেকে উঠে পরলো। পাছে আবার কেউ কিছু বলুক সেই ভয়ে এমনি ই রাতে আবছা আবছা ঘুমিয়েছে সে। তার ওপর আজ সকালেই সব অতিথী রা বাড়ি যাবেন। 

happy-couple-picture



কিন্তু তাঁরা বাড়ি যাওয়ার সময় ই হলো আসল ঘটনা টা। নতুন বউ, ও বর আত্মীয় দের প্রণাম করলেন। এবং সদ্য বিবাহিত ছেলেটা তাদের উদেশ্য করে নিজের বউ কে সামনে রেখে বললেন, ইনি আমার বাড়ির লক্ষহী। ইনি ভুল করুক, ঠিক করুক। এনাকে যেন এই বাড়ি র বোমার যোগ্য সম্মান দেওয়া হয়। ভুল করলে হাতে ধরিয়ে শেখানো হয়। ঠেস দিয়ে, কথা শুনিয়ে, তার বাবার বাড়ির মানুষ দের ছোট করে নয়। আর রইলো বাকি পায়েস এর স্বাদ। এখন অনেক বাড়িতেই চিনি কম খাওয়ার প্রচলন আছে। স্বাস্থ্যবিধির কথা মেনে। ও যেখানে বড় হয়েছে হয়তো সেই রকম সব মেনে রান্না হয়। তাই ঐরকম করেছে।


ওকে সেটা ভালোবেসে বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল। এক্ষেত্রে নতুন বৌমা যে রান্নাই করুক না কেন, যেমন ই হোক না কেন তাকে ভালো বলা উচিত ছিল। আমি বউ এর হয়ে কথা বলি নি। আমি শুধু  সত্য , ন্যায় টুকুই বলেছি। 


তার কথায় সবাই নিজেদের ভুল বুঝতে পারলো। নতুন বোমার প্রতি তাদের ও মনোভাব নরম হলো। এবং তারাও তাকে আপন করে নিল। আর সদ্য বিবাহিত মেয়েটির চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। আর বর এর প্রতি অনেকটা বিশ্বাস, ভরসা, ভালোবাসা, সম্মান  জন্মালো। এত ভালো মনের একটা মানুষকে সে জীবনসঙ্গী হিসাবে পেয়েছে সেজন্য সে ঈশ্বরের চরণে কোটি কোটি প্রণাম জানালো।


আমাদের সমাজে এই রকম বহু ঘটনা বলি হয়ে থাকে। এইরকম বৌমা, আত্মীয়, শ্বাশুড়ি মা, বর এইসব চরিত্র গুলো আমাদের চারপাশেই আছে। আপনাদের চারপাশেও কি এই রকম চরিত্ররা আছে? সেইরকম কোন গল্প থাকলে আমায় কমেন্ট করে জানাতে পারেন। 


আজকের ব্লগ টা তবে এত টুকুই। এখন বাজে রাত 11: 49 মিনিট। 12 টার মধ্যেই ব্লগটা পোস্ট করবো। আপনারা সকলে ভালো থাকবেন। আবার ফিরবো নতুন কোন লেখা নিয়ে। আজ তবে আসি।


ছবি : ai generated

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ