( ai generated picture)
১: হটাৎ দেখা :
মাঝখান থেকে কেটে গেছে সাতটা বছর। আজ এত গুলো বছর পর আবার সেই চেনা মানুষটিকে দেখে দুজনেই থমকে দাঁড়ালো। এই সাতটা বছরে দুজনের রাস্তা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তারা কেউই ভাবতে পারে নি কখনো এমন ভাবে তাদের আবার দেখা হয়ে যাবে।
ভালোবাসার টান হয়তো এমনই হয়, জীবনের পথ আলাদা হয়ে গেলেও একদিন হয়তো এভাবেই তারা মুখোমুখি হয়। আজ দুজনেরই সন্তান সাথে আছে।
পরিণত বয়সের পরিপক্ক মানসিকতায় আবেগ জড়িয়ে আসে। মুখ এর শব্দ গুলো বোবা হয়ে যায়। তখন চোখ কথা বলে, মন অনেক কিছু জানতে চায়।
আর পাশে থাকা তাদের বাচ্চা গুলো সম্পর্ক বোঝে না। তারা বোঝে হাসি, খেলা, সহজেই আপন করে নেওয়ার মত মন তাদের। তাদের একসঙ্গে মিলমিশ, খেলা, হাসি দেখে আবার পুরোনো স্মৃতিতে ডুব দেয় দুটি পরিণত মন।
সমাপ্ত
২: ফ্রেম ভাঙা চশমাটা
বছর পঞ্চান্নর বিপত্নীক অমিতবাবু প্রতিদিন ভোরবেলায় মর্নিংওয়াকে যান। এ তাঁর বহুকালের অভ্যাস। পরণে অতি সাধারণ টিশার্ট নীচে ট্রাউজার। চোখে সেই পুরোনো আমলের একটা ফ্রেম ভাঙা চশমা। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই ইনি একজন নামকরা গ্লাস ফ্যাক্টরির মালিক। নিতান্তই সাদামাটা।
বিগত ছয়মাস হলো সার্থকও হাঁটতে বেড়োয় পার্কে। সদ্য ব্রেকআপের পর আর বেশিক্ষন বিছানায় থাকতে ইছে করে না। খোলামেলা মুক্ত বাতাসে নিজেকে একটু ফ্রেশ লাগে , সবকিছু ভুলে থাকা যায়। সার্থক জানে অমিতবাবু বেশ অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তি। কিন্তু সার্থকের মনে প্রশ্ন জাগে তবে ওই ফ্রেম ভাঙা চশমাটা উনি জোড়াতালি দিয়ে কেন ব্যবহার করেন!
একদিন কৌতুহল সামলাতে না পেরে , সে জিজ্ঞাসাই করে বসলো, কাকু একটা কথা বলবো কিছু মনে করবেন না তো?
- না, না ! হ্যান্ডসাম তুমি বলো কি ব্যাপারে?
- আচ্ছা, আপনি তো এত বিত্তবান। কিন্তু এই ভাঙা চশমাটা এখনো ব্যবহার করেন কেন? রং ও ফিকে হয়ে গেছে। নতুন একটা তো কিনতেই পারেন?
উত্তরে খানিক হেসে , উদাসীন মনে অমিতবাবু বলেন , সব কিছুই কি সহজে ত্যাগ দেওয়া যায়? স্ত্রী এর পছন্দ করা জিনিস, ও আজ নেই। তবু আছে আমার এই চশমাটার মধ্যে দিয়ে। এটা পড়লে আমি অনুভব করতে পারি ও আছে সবসময় আমার সাথে। আমার প্রতিটা পদক্ষেপের সাক্ষী হয়ে ।
সবটা শুনে সার্থক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো এবং চোখ থেকে রোদ চশমাটা নিয়ে হাতে রাখলো। বুঝলো ও যে কষ্ট লুকানোর জন্য রোদ চশমা পরছে আর অমিতবাবু সেই ভালোবাসাকেই অমর করে রেখেছেন।
সমাপ্ত
৩ : একেই বলে দাম্পত্য জীবনের ভালোবাসা:
গভীর রাত। পাশাপাশি শুয়ে দুটি বিপরীত লিঙ্গের প্রাণ। নিঃশ্বাস পড়ছে অবিরত। দুজন দুইদিকে বিপরীতমুখী শুয়ে আছে। দাম্পত্য জীবনের এক চিরাচরিত অভ্যাসের এই রাত। অর্থাৎ কিছুক্ষন আগেই ডিনারের সময় তুমুল অশান্তি হয়ে গেছে। ঝগড়া এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একদম ডিভোর্স অবধি কথা এগিয়ে গেছে।
এখন দুজনের চোখেই ঘুম নেই। একে অপরকে রাগ, অভিমান দেখাতে তৎপর। কেউ এক বিন্দুও জায়গা ছেড়ে দেবেনা ভালোবাসাকে, প্রেমকে, অলিঙ্গনকে। কড়া কড়া বাক্যালাপ গুলো এখনো একে অপরের হৃৎপিণ্ডে গিয়ে আঘাত হানছে।
চোখের কোণ থেকে বাঁধ ভাঙা জলের ধারা বালিশে পরছে। জানালা ভেদ করে আসা শ্রাবনের জল- হাওয়ায় শরীরটা শীতল হয়ে আসছে। শাড়ির আঁচল টিকে ভালো করে জড়িয়ে কুঁকড়ে শুয়ে রইলো। বেশ কিছুক্ষণ। নিস্তব্ধ রাতে ঝমঝম বৃষ্টি পড়ার আওয়াজ ছাড়া চারদিক পুরো নিঝুম। আধো ঘুমে টের পেল শাড়ির উপর চাদরের আলতো প্রলেপ। চকিতে ঘুমটা ভেঙে গেল। শরীরের উষ্ণতা ফিরে এলো।
চাদরটা পরম যত্নে আঁকড়ে ধরে , হিসাব করে রাখলেন, আগামী কাল সকালে উঠে অফিসের জন্য ওনার জন্য চিকেন কারি, আর ওনার পছন্দের পোলাও রান্না করবেন।
সমাপ্ত
৪: ঈশ্বর সবার, মা সকলের
হাজার হাজার টাকা প্রনামী, ভারী ভারী গহনা নিত্য দিন দেবীকে উৎসর্গ করছেন প্রতিদিন অগুনতি ভক্তেরা। এখানে দেবী অত্যন্ত জাগ্রত। কত দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। মায়ের একবার দর্শনের জন্য। ভোররাত থেকে লাইন পরে যায় পুজো দেওয়ার জন্য। এখন আবার প্রভাবশালী মানুষগুলোর জন্য টাকার বিনিময়ে ভি আই পি লাইনেরও বন্দোবস্ত হয়েছে।
কথিত আছে এখানে মা কাউকেই খালি হাতে ফেরান না। যে যেমন মনস্কামনা করেন মা তা পূরণ করেন। মানত পূরণ হয়ে গেলে , ভক্তেরা দামি সোনার হার, কানের, কেউ বা রূপোর নূপুর নিবেদন করেন। অনেকে দামি বেনারসি শাড়িও মা কে দিয়ে পুজো দেন।
আজ রিনারও মনস্কামনা পূরণ হয়েছে। পাঁচ বাড়ি লোকের বাসন, ঘর মুছে যত টুকু উপার্জন করেন তা দিয়েই মেয়েকে সে এত দিন পড়িয়েছে। আজ তার জীবনের একটা পরম সুখের দিন। মেয়ে আজ মাধমিকে স্কুলের মধ্যে সেরা হয়েছে এবং জেলার মধ্যে দ্বিতীয়।
রিনা এতকিছু বোঝে না। ও শুধু বোঝে দারিদ্রতা চরম অভিশাপ। তীব্র মানসিক জেদ, আর অধ্যবসায়ের জোরে যেন তার মেয়ে এই দারিদ্রতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। আর পাঁচটা অভিশাপ গ্রস্ত দরিদ্র মানুষ গুলোর সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারে।
তাইতো, আজ এত খুশির খবরটা জগৎ জননী মা কে জানাতে মন্দিরে এসেছে রিনা। চারিদিকে কত বিশাল লাইন। ভক্তেরা ডালা ভরে দামি দামি ফল, মিষ্টি, শাড়ি সাজিয়ে মাকে পুজো দেবে বলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। রিনা নিজের হাতের দিকে চেয়ে দেখলো ও কেবল নিজের গাছের হওয়া চারটি জবা ফুল ও এক ঠোঙা বাতাসা এনেছে।
চোখে জল ভরে এল। লাইনে দাঁড়িয়েই মনটা কেঁদে উঠলো মাগো আমি তোমার জন্য এটুকুই আনতে পেরেছি। তুমি খুশি হবে তো মা? আমার নিবেদন করা প্রসাদ তুমি গ্রহণ করবে তো? আমার মেয়েটাকে দু- হাত ভরে আশীর্বাদ করবে তো মা?
প্রায় দুই ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অবশেষে পুজো দেওয়া হলো। চারিদিকে এত চাকচমক , ঝকমারী মানুষের ভিড় ঠেলে রিনা মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকলো। মনে মনে সেই একই ভাবনা, আমরা তো গরিব মা , এই অধমের সামান্য বাতাসা টুকু তোমার কি আর মনে ধরবে মা গো?
হটাৎই সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে রিনা হোঁচট খেল। চমকে দেখলেন একজন মহিলা চুল এলো করে মুখ নিচু করে বসে আছে। রিনা ,বললো, আমি বুঝতে পারি নি। অন্যমনস্কভাবে হয়ে গেছে। আপনার লাগে নি তো? এই বলে সে তার চরণ ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেলেন।
সঙ্গে সঙ্গে রিনার সারা শরীরে বিদ্যুতের মতো ঝিলিক খেলে গেল। এক ঝটকায় সে আবার ভালো করে দেখলো, আমি ঠিক দেখছি তো? আলতা রাঙা পা স্পশ করতেই উনি মাথা তুললেন, রিনা দেখলো উনি সেইরকমই পাঁচটা বাতাসা নিয়ে পরম তৃপ্তিতে খাচ্ছেন। আর সাথে নির্মল হাসি।
রিনা চিৎকার করে বলে উঠলেন মাগো, মা... দেখা দিলে মা.. জয় জগৎ জননী মায়ের জয়। জয় জগৎজননী মায়ের জয়।
সমাপ্ত

0 মন্তব্যসমূহ