( Ai generated picture)
আমার শরীরটা স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি। ধাতব তারের মতো একদিকতা একটা গোল প্যাঁচানো হয়ে সরু সূঁচের মতো ধারালো। আর অন্যদিকে আমার এই সুচালো মুখ বন্ধ করার জন্য টুপি আবৃত ক্যাপিং আছে। যার সাহায্যে আমার ধারালো অংশটা আবৃত করা হয়। আমার রূপের বর্ণনা পেয়েই বুঝে গেছেন তো? আমি কে বলুন তো? ঠিক ধরেছেন। আমি সেফটিপিন।
বছরের পর বছর ধরে আমার ব্যবহার চলে আসছে ঘরে ঘরে। আধুনিক চাকচিক্যের আধিক্য যতই বাড়ুক আমার চাহিদা কোনোদিন ফুরোবে না। তা আমি হলফ করে বলতে পারি। দিন পাল্টায় , রং বদলায় অনেক পুরোনো জিনিসের হোল বদল হয়। কিন্তু আমার চেহারার কোন পরিবর্তন তেমন কেউ করতে পারে নি। একটা জিপলকের ভিতর ভরে আমায় রেখে দেওয়া হয় বিক্রয় এর জন্য।
আমার মত একই দেখতে আরো কয়েকজন আমরা সারিবদ্ধ ভাবে একসঙ্গে থাকি। অপেক্ষা করি কার বাড়ির অন্দরমহলে জায়গা হবে আমাদের সেই চিন্তায়। সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শেষমেশ এক মধ্যবয়স্ক মহিলা আমাকে নিয়ে যায়। আমায় বলতে , জিপিলকে থাকা আমাদের দলটাকে। সেইথেকে আমি একটা অন্ধকার বাক্সের মধ্যে বন্দি। জিপিলকের সাদা প্যাকেট এর ভিতর থেকেই আমি দেখতে পাই বাক্স ভর্তি সুতোর রিল, কাগজে আটকানো লাইন দিয়ে সাজানো চার, পাঁচটা সূঁচ। কয়েকটা বোতাম, হুকের কোলাহল , কাঁচি, আরো কত কি। তাদের মাঝে নিজেকে কেমন যেন অবহেলার জিনিস মনে হয়।
দিন কয়েক সেখানেই আমার ঠাই হয়। মনে মনে ভাবি ঠিকই তো আমি তো আর সোনা, হীরার মতো দামি গহনা নই, যে আমায় সুন্দর বক্সের ভিতর , ন্যাপথলির সুগন্ধে ভরা আলমারির ভিতর স্হান হবে। আমি হলাম গিয়ে সামান্য সেফটিপিন। আমার কাজ হলো দুটো অস্তিত্বকে একই সুতোয় মেলবন্ধন করানো।
শাড়ির আচলের শোভা বজায় রাখতে আমার জুড়ি মেলা ভার। ওড়নার পরিপাটি আমার সৌজন্যেই নিখুঁত দেখায়। তাছাড়া ছেঁড়া, ফাটা যেকোন জায়গায় আমায় ব্যবহার করলে আমি ঠিক তাদের খুঁত ঢেকে রাখতে পারি। একাজ করেই আমার জীবন সার্থক। নাই বা হলাম নারীর গলার অলংকার, তার কানের সৌন্দর্য্যের গহনা তবু তো এই জগৎ সংসারে আমার কাজের জুড়ি মেলা ভার।
হটাৎ একদিন আমার ডাক পড়লো। দেখলাম একটি কিশোরী মেয়ে তড়িঘড়ি বাক্সের দরজাটা সজোরে টেনে খুলল।বাইরের হাওয়া বাতাসের সংস্পর্শে আমার মনটা ভীষণ ফুরফুরে হয়ে গেল। আমায় আলতো করে সে তুলে নিল। ওর তালুতে বসেই আমি লক্ষ্য করলাম যিনি আমায় এ বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন উনি সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। জানলাম উনি সম্পর্কে কিশোরী মেয়েটির মা। এতক্ষন মেয়েটির পরণে পড়া নীল রাঙা শাড়িটির আঁচল হরকে বারবার খুলে যাচ্ছিল। এবার মেয়েটির মা পরম সযত্নে আমার সাহায্যে ব্লাউজের সাথে শাড়ীটাকে আটতে উদ্ধত হলেন। আমিও সূচালো অংশটা সজোরে শাড়ির সুতো ভেদ করে ব্লাউজের কাপড়ের সাথে জুড়ে তাকে নিরাপত্তা দিলাম।
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির মুখে এক উজ্জ্বল হাসি লক্ষ্য করলাম। মা, এতক্ষন শাড়ি, গহনা, অলংকার পড়েও এতটা কম্ফোর্টেবল ফিল করছিলাম না। এইযে, শাড়িটায় টানটান করে তুমি সেফটিপিন টা এটে দিলে, দেখো আমায় কতটা কনফিডেন্স লাগছে। শাড়ির আঁচলটা এতটা পারফেক্ট শেড হয়েছে যে আমার লুক টা আরো এলিগেন্ট লাগছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মা, মেয়ের এই কথোপকথন শুনে শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে আমি পরম তৃপ্তিতে গর্ব বোধ করি।
আসলে সত্যিই তাই। দামি গয়না, গাড়ি, বাড়ি কোন কিছুই আমাদের স্বর্গীয় সুখ দিতে পারবে না। কাউকে যদি হিরে, জহরত, সোনায় মোড়া রাজপ্রাসাদে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় , আর যদি কোনকিছুই সেখানে না থাকে, তাহলে সে সাময়িক ভাবে নিজেকে রাজা ভাববেন। কিন্তু যখন ক্ষুধার জ্বালায় পেট জ্বলবে, প্রচন্ড তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে আসবে তখন এক মুঠো অন্ন আর অল্পটুকু জলের জন্যেই মনটা কেঁদে উঠবে। সোনা, হীরা সব তুচ্ছ মনে হবে। সুতরাং জগতে যা কিছু সাধারণ, যা কিছু সহজাত তার মর্যাদাই আলাদা। সেইরকমই একটি জিনিস হলো সেফটিপিন।
এক টুকরো সেফটিপিন এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি আমাদের অসময়ের সঙ্গী। রাস্তা ঘাটে চলতে, ফিরতে হটাৎ যদি জামার একটু কাপড় ফেঁসে যায়, কিংবা চেন কেটে যায় তা সাময়িক ভাবে জোড়া লাগাতে সেফটিপিন এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। একটুখানি একটি বস্তু। কিন্তু তার প্রভাব বিস্তর।
একটা সেফটিপিন এর জীবন তাই খুবই অমূল্য। এটি মানুষের বিপদে আপদে, দরকারে অদরকারে সবসময়ই কাজে লাগে। কিন্তু সব জিনিসেরই একদিন না একদিন কদর ফুরায়। সেফটিপিন ও তার ব্যতিক্রম নয়। কালের প্রবাহে তার সুচালো অংশের ধার একদিন কমে যাবে, শরীরে বাসা বাঁধবে মরচে রং। কার্য ক্ষমতা কমবে । স্টেইনলেস স্টিলের সেই চকচকে সুন্দর চেহারাখানি বয়সের ছাপে বেঁকে যাবে। শেষকালে একদম অচল হয়ে তার জায়গা হবে ডাস্টবিনের জঞ্জালের ভিড়ে।
এইভাবে একটি সেফটিপিন তার জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষের উপকারে সহায়তা করে বয়সের সাথে সাথে জরাজীর্ণ হয়ে অন্যকে সুরক্ষা দিয়ে নিজের জীবনটা সম্পন্ন করে।
আজকের এই ব্লগটা আপনাদের কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। আবার আসবো আগামীকাল নতুন কোন অনুভূতির গল্প নিয়ে। আজ তবে আসি। সকলে ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন।

0 মন্তব্যসমূহ