ছবি : Ai Generated
আচ্ছা কিছু কিছু মানুষের স্বভাব এমন কেন বলতে পারেন? কিছু মানুষ আমাদের সমাজে আছে, যারা নিজে থেকেই ভালোবাসার প্রস্তাব নিয়ে আসে। বার বার ফিরিয়ে দিলেও আসে। নানা বাহানায়, অজুহাতে, বিভিন্ন অবাক করা টেকনিক দেখিয়ে নিজের ভালোবাসার গভীরতা প্রমান করে। কখনো ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তার সামনে তার জন্য অপেক্ষা করে। কখনো নিজের ভালোবাসা জাহির করার জন্য প্রেমিকার বাড়ির গেটের সামনে ভর দুপুরে, গভীর রাতে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিছুদিন এভাবেই তার চেষ্টা চালিয়ে যায়। এখনকার জেনারেশন এ তো মোবাইল নম্বর জোগাড় করাটা ক9ন ব্যাপারই না। সুতরাং এরপর ফোন করে তার ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে চায়। মেয়েটা প্রথম দিকে পাত্তা দিতে চায় না। সে তার নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে চায়। নিজের পড়াশোনা, কেরিয়ার এই সব নিয়েই সে বাঁচতে চায়।
এরপর চলে আরও এক কদম অন্য লেভেল এর টেকনিক। মেয়েটি কলেজ, টিউশন যেখানেই যাক না কেন, পিছন পিছন ছায়ার মতো যাবে। তাকে মেয়েটা না পাত্তা দিলেও কোন পরোয়া নেই। সে জানে নারীর মন খুব কোমল। আর এই বয়সী মেয়েদের মন জয় করার টেকনিক ছেলেটা অলরেডি জানেই।
এবার মেয়েটার মনটাও আস্তে আস্তে গলতে থাকে। সেও মনে মনে এটাই আশা করে যে, আজকেও কলেজ ফেরার পথে চায়ের দোকানের সামনে ছেলেটা দাঁড়িয়ে থাকে কি দেখা যাক! এবার তার মনেও হালকা দোলা লাগে। আসা- যাওয়ার পথে এই আড়াল আবডাল টা মেয়েটার ও বেশ ভালো লাগতে শুরু করে।
সরাসরি কিছু না বললেও মেয়ে টাও এবার এই মুহূর্ত গুলো খুব উপভোগ করে। জীবনে আসা প্রথম প্রেম কে উপেক্ষা করতে চাইলেও মনের কাছে সে হেরে যায়। ছেলেটির ব্যাপারে বান্ধবীদের সাথে এই নিয়ে আলোচনা করে। কেউ হাসাহাসি করে, কেউ বা প্রেমের নিত্য - নতুন টিপস দেয় আবার কেউ হয়তো বলে তুই ও শেষ পর্যন্ত এমন হয়ে গেলি? তুই তো তোর কেরিয়ার নিয়ে খুব সিরিয়াস ছিলিস! হটাৎ এইসব এর ফাঁদে জড়িয়ে নিজের ভবিষ্যৎ টাকে নষ্ট করার কি কোন মানে হয়?
মেয়েটা এবার পড়েছে ঘর বিপাকে। পড়াশোনায় আর আগের মতো মন বসে না। সে নিজেই বুঝতে পারছে ও পিছিয়ে পড়ছে। তবু সে ওই নতুন প্রেমের হাতছানি কে ফেরাতে পারছে না। মন থেকে ভুলতে পারছে না। এটাই কলেজের ফাইনাল ইয়ার। খুব গুরুত্বপূর্ণ এই বছর টা। তাই এই বছরটার প্রথম থেকেই খুব ভালো করে পরিশ্রম করার প্রতিজ্ঞা সে নিজেই নিয়েছিল। কিন্তু হটাৎ সব যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।
একলা ঘরে পড়তে বসে নানারকম বান্ধবীদের নানারকম উপদেশ মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। ওই দিকে বই এর পাতা হওয়ায় এপিঠ - ওপিঠ সজোরে হুটোপুটি খেতে থাকে। সেদিকে তার হুঁশ ই নেই। তার মন এখন সেই ছেলেটার জন্য পাগল। জীবনে আসা প্রথম প্রেম, প্রথম আবেগ , প্রথম ফোন কল এসব নিয়েই সে ভাসতে থাকে সারাটা সন্ধ্যা। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি র বই গুলো আর খুলেই দেখা হয় না।
নিচের তলায় মা- বাবা টিভি দেখেন আর আলোচনা করেন, আর তো মাত্র একটা বছর। মেয়ে আমাদের খুব মেধাবী। আর পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী। আমরা ওর ওপর খুব আশাবাদী। খুব ভালো নম্বর ই ও পাবে।
মেয়ের দিবা স্বপ্নে এখন আর কোন কেরিয়ার এর জায়গাই নেই। তার শরীর , মন জুড়ে শুধুই সেই অচেনা প্রেমিকের চোখ, ঠোঁট, হাতের ছোঁয়ার কল্পনা , শরীরের গন্ধ আরো কত কিছু। ভালোবাসার প্রথম আবেগ, সেই শিহরণ , লুকোচুরি সব কিছুতে মিলেমিশে মেয়ে এখন বাস্তব ভুলেছে। কল্পনায় অনেক কিছু এঁকেছে। পরদিন সকাল হওয়ার অপেক্ষায় ঘড়ির কাঁটা গুনছে। প্রথম প্রথম যে নম্বর থেকে ফোন আসলে সজোরে ডিসকানেক্ট করে দিত, রাগে ফোন সুইচ অফ করে দিত এখন সেই নম্বরটা থেকেই একটা ফোন কল এর অপেক্ষা যেন লক্ষ বছর মনে হচ্ছে তার।
ইচ্ছে করছে যেন, নিজেই সে ফোন টা করে বসে। বার বার নম্বর টা টাইপ করেও আবার মুছে ফেলছে। আগে যে ফোন কলটা কেটে দিত, এখন ভাবছে একবার কল করুক প্লিজ, আমি এখনই নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেব। অপেক্ষা করতে করতে নানা কথা ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত নামে। ঘড়ির কাটা রাত দশটা ছুঁই ছুঁই।
নীচে তলা থেকে গলা ভেসে এলো- কই রে, মানা.. রাত হলো তো? খাবি আয়।
মায়ের গলা পেয়ে মেয়ে তড়িঘড়ি নামতে গেল নিচে। ঠিক তখন ই সেই নম্বর টা থেকে ফোন কল এল। মেয়েটা কিছু না ভেবেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন টা রিসিভ করে নিল । ছেলেটাও বুঝে নিল সে সিগন্যাল পেয়ে গেছে।
ছবি : Ai Genareted
পরদিনই দেখা হলো। সেই প্রথম দৃষ্টি বিনিময়। প্রথম বাক্যালাপ। প্রথম প্রেম প্রস্তাব। জীবনে প্রথম ভালোবাসার আগমন। সব কিছুই যেন মেয়েটার কাছে এখন স্বপ্নের মতো। শুরু হলো প্রেম। ঘন্টার পর ঘন্টা রাত জেগে কথা বলা। রাত জেগে করা প্রজেক্ট এর খাতা গুলো ঠাঁই পেল মেয়টার পড়ার তাকের একদম কোণায়। সেই সময়টা কেড়ে নিল একটা মোহ। হ্যা , একে মোহ ই বলে।
ভালোবাসা গভীর হলো। প্রেমে ঘনিষ্ঠতা আসলো। মেয়েটার জীবনে এখন কেরিয়ার এর চেয়েও প্রথম প্রায়োরিটি তার ভালোবাসার মানুষটি। তার কথায় রাত নামে, তার কথাতেই ভোর হয়। জীবনের মূল্যবান সময়ের সমস্ত টা গ্রাস করে নিল সেই ছেলেটা। সরল মনে জীবনে আসা প্রথম প্রেম এমন ই হয়।
এ ভালোবাসায় কোন খাত নেই। নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসে ফেলল সে। কিন্তু কিছুদিন পরই তার স্বপ্নের জীবনের মধ্যে আসে ছন্দপতন। আসলে কিছু কিছু মানুষ আমাদের জীবনের ঠিক টার্নিং পয়েন্ট এ এসে আমাদের জীবনটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে চলে যায়।
আমি ওপরে মেয়েটার জীবন টা একটু ডিটেলস এ বর্ণনা করলেও আমার এই ব্লগটার আসল উদেশ্য হলো সমাজের সেই সমস্ত মানুষ গুলোর চরিত্র নিরুপন করা যারা অন্যের জীবনটাকে তছনছ করে দিতে আসে। এই ছেলেটার চরিত্র ঠিক সেইরকম ই।
ছেলেটি বছর খানেক ভালোবেসে, তারপর মেয়েটির সাথে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করে। কথায় কথায় ভুল ধরে। ব্যবহারে আচরণে বুঝিয়ে দেয় মেয়েটার সঙ্গ তার আর ভালো লাগছে না। অথচ মেয়েটা তার জীবনে যেচে আসে নি। সেই এসেছিল প্রথম প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে। আর মেয়েটা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট করে তার সবটুকু দিয়ে ভালোবেসে গেছে।
কিন্তু ছেলেটার মোহ কেটে গেলেই তাকে কথায় কথায় ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেবে। মিথ্যে কথা বলবে। ছোট ছোট ঘটনা গুলো নিয়ে তুমুল অশান্তির সৃষ্টি করবে। আসলে সে চাইবে নানা বাহানায় এই সম্পর্ক টা থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট করে প্রথমে বলতে চাইবে না সে আর এই সম্পর্ক রাখতে চায় না। কারণ তার মন এখন অন্য মোহে আকৃষ্ট।
আর এই সব মিথ্যে ভালোবাসার নাটকে ফালতু সময় নষ্ট করে মেয়েটার জীবনের সেরা পরীক্ষা টাই আর ভালো করে দেওয়া হয়না। অনেক সময় এমন ও দেখা গেছে সেই সব মেয়েরা এত টাই মানসিক দিক থেকে ভেঙে পরেছে যে পরীক্ষা তেই বসতে পারে নি।
সমাজে এই রকম চরিত্রের ছেলেদের অভাব নেই। এরা প্রথমে ভালোবাসার লোভ দেখিয়ে পরে মেয়েটার জীবনের সব ভালোবাসার জিনিস গুলো কেড়ে নিয়ে মেয়েটাকে অবসাদের মুখে ঠেলে দেয়। এত টাই মেয়েটাকে অন্ধকারের পথে ঠেলে যায় যে, সহজে সেই ট্রমা থেকে সে আর বেরোতে পারে না ।
আমি এই গল্পটা একদমই বানিয়ে লিখি নি। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। তবে হ্যা, এই রকম চরিত্র যে শুধু ছেলেদের থাকে তা নয়। অনেক মেয়েরাও এই চরিত্রের হয়। আমি একজন মেয়ে। তাই আর এক মেয়ের মানসিক অবস্থা আমি ভালো ভাবে অনুভব করতে পারি। তাই গল্পটা এইভাবে এঁকেছি।
আপনারাও কি এই ধরণের মানুষ দের কাহিনী শুনেছেন? আপনাদের আশেপাশেও কি এই ধরণের ঘটনা ঘটেছে? আমায় জানাতে পারেন কমেন্ট করে। আজ তবে আসি। আবার আসবো আগামী কাল। নতুন কোন লেখা নিয়ে। সকলে ভালো থাকবেন।


0 মন্তব্যসমূহ