যৌথ পরিবারে রাজনীতি শিকার নাকি আলাদা সংসার? শান্তি কোথায়?

 প্রতিদিনের মতো আজও চলে আসলাম কিছু কথা কিছু উপলব্ধি, অনুযোগের ডালি সাজিয়ে। গতকাল আমি ডায়েরি লিখি নি। অবসর সময়টা ব্যয় করেছিলাম বই পড়তে। সম্প্রতি আমি ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের লেখা " জলে জাগে ঢেউ" এই উপন্যাসটি পড়ছি ।তিনদিনে আমি মোট একশত দশ পাতা পড়েছি । ভীষণ সুন্দর একটি উপন্যাস এটি। যদিও এখনো সবটা পড়ে শেষ করতে পারিনি। আপনারাও পড়তে পারেন। এই উপন্যাসটির বাঁধনে আটকা পরেই ডায়েরী লেখার সময় হয়ে ওঠে নি। কিন্তু এটি আমি যেহেতু শখের বশে লিখি তাই আজ আবার একটু সময় বের করে লিখতে বসলাম। 


জানেন তো, পলিটিক্স শুধু ময়দানে হয় না, সংসারেও পলিটিক্স চলে। আর তার ব্যাপ্তি ভীষণ রকম আকার ধারণ করে। কিন্তু এর আকার খালি চোখে মোটেও দৃশ্যমান নয়। ঘর মানে একটা শান্তির জায়গা, যেখানে স্বাধীন ভাবে থাকা যায়। রিল্যাক্স ফিল করা যায়। নিরাপত্তা বোধ হয়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে আজও অনেক বৌ দের এই শান্তির জায়গাটাতেও চলে পলিটিক্স। একবাড়িতে চার কিংবা ছয় কামরা রুম। প্রতিটি রুমে আলাদা আলাদা দম্পতি আর তাদের মধ্যে চলে ভীষণ রকম পলিটিক্স। সম্পর্কে তারা কিন্তু আপন মায়ের পেটের ভাই । এখন তারা বিবাহিত। যে যার আলাদা সংসার আছে। বৌ, বাচ্চা আছে। সামনে থেকে তাদের এই পলিটিক্স বোঝার উপায় নেই। আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে তারা খুব সুখী যৌথ পরিবার। 


এই জেনারেশনে যেখানে যৌথ পরিবারগুলি প্রায় বিলুপ্তের পথে,সেখানে দাঁড়িয়ে এই যৌথ পরিবারটিকে ব্যতিক্রমী দৃষ্টিতে মানুষ দেখেন। দূর থেকে দেখলে মনে হয় তারা বংশ পরম্পরায় পরিবারের একতাকে কি সুন্দর করে বহন করে চলেছে এখনকার দিনেও। কিন্তু তার গভীরে যে কতটা ফাটল তা শুধু জানে সেই পরিবারের সদস্যরা।


এদের সামনে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই। একে অপরের প্রতি এদের বিষের জ্বালা ঠিক কতটা তীব্র। কিন্তু তলে তলে তারা একে অপরের প্রতি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সেটা সম্পত্তি সংক্রান্ত হোক কিংবা কারো উন্নতিতে বাধা সৃষ্টি করতে। ভালো মানুষী রূপের অন্তরালে থাকে এদের অপরকে প্রতারণা করার অদম্য ইচ্ছা। তবুও ওল্ড জেনারেশনের কিছু প্রবীণ মানুষ তাদের সংসার দেখে চোখ জুড়ায়, বাহবা দেয়। তাদের নৈতিক শিক্ষকতায় শিক্ষিত এক আদর্শ পরিবার হিসাবে ভালোবাসে, স্নেহ করে।


আর যারা অশান্তি এড়িয়ে, বিবাদ থেকে দূরে থেকে নিঁখাত শান্তির জন্য আলাদা ভাবে সংসার গড়ার তাগিদে নিজের করে ঘর সংসার বাঁধে তাদেরকেই সমাজ বলে স্বার্থপর। আত্মদম্ভিক, অশিক্ষিত। আমি যদিও যৌথ পরিবারেই থাকি। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত ভাবে সেইসব মানুষগুলোকে সমর্থন করি যারা আলদা ভাবে সংসার পেতেছে। কারণ তারা সংসারের মারপ্যাঁচ, কূট কাচালীতে জড়াতে চায় না। তাদের জীবনের একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে। এইসব সংসারের তুচ্ছ ঘটনা গুলো নিয়ে সমালোচনা করতে তারা পছন্দ করেন না। তারা চায় একান্তে নিজের মত করে সংসারটা গোছাতে, সাজাতে। যেখানে কোনো আড়িপাতা, চোখ ঠেলাঠেলি , কানাঘুষা থাকবে না । স্বাধীনভাবে ভাবে শান্তিতে বসবাস করা যাবে। সারাদিনের ক্লান্তির পর মানুষ নিজের ঘরে এসে দুদণ্ড বিশ্রাম নিতে আসে। কিন্তু যৌথ সংসারে যখন তখন রেস্ট নেওয়াটাকে কু চোখে দেখা হয়। 


আরে ভাই, যুগ বদলেছে, সময় বদলেছে, কাজের ধরন বদলেছে। আগেকার দিনের মানুষরা ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠতো। সারাদিন কাজ করত। সন্ধ্যে হলেই বাড়ি ফিরে খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত তাড়াতাড়ি। কিন্তু এখন মানুষকে অনেক রাত অবধি কাজ করতে হয়। গৃহবধূ রাও বাড়ির কাজ সামলে রাত জেগে কিছু স্কিল শেখে, শখের কাজ গুলো করে। সেইজন্য তাদের সকালে উঠতেও হয়তো একটু দেরি হয় । কিন্তু ওল্ড জেনারেশনের মানুষরা এটা মেনে নিতে পারেন না। তাদের বক্তব্য "আমাদের সময় আমরা সূর্য ওঠার আগেই বিছানা ছাড়তাম। আর এদের কাণ্ডকারখানা দেখলেই অঙ্গ জ্বলে । " এইসব চিরাচরিত ডায়লগ কমবেশি অনেক সংসারেই আছে । 


সেইদিক থেকে বিচার করলে আমি বলব আলাদা থাকাই  শ্রেয়। কিছু কিছু ওল্ড জেনারেশনের মানুষ আধুনিকতাকে গ্রহণ করে নিলেও কিছু মানুষ এখনো তাদের আদ্যিকালের চিন্তা ধারাকে মাথায় গেঁথে রেখেই এখনকার জেনারেশনের মানুষগুলোকে ছোট করে। তারা আধুনিকতাকে মেনে নিতে পারে না। তাদের সাথে তর্কে জড়ানো মানে নিজের মূল্যবান সময় গুলোকে অপচয় করা। এনারা এতটাই গোঁড়া প্রকৃতির হন যে, তাদের যতই বোঝানো হোক তারা নিজেদের শিক্ষাতেই অনড় থাকবে ।


আর এক শ্রেনীর মানুষরা এই দুই জেনারেশনের দ্বন্দ্বকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। অন্যের সংসারে ভাঙন ধরলে, অশান্তির সূত্রপাত ঘটলে তারা মন থেকে খুশি হয়। এতে তাদের কোনো ব্যক্তিগত স্বপ্ন সফল হয় না। কিন্তু অন্তরে একটা পরিতৃপ্তির ঢেউ জাগে। অর্থাৎ অন্যের সংসারে ভাঙন এর আভাস পেলে তারা খুশি হয়। কেন? সেটা আমি বুঝি না। হয়তো এদের জীবনের কোনো উদ্দেশ্য নেই। লক্ষ্য নেই। অলস জীবনযাপনে তারা অভ্যস্ত। পাশের বাড়ির কেচ্ছাকাহিনী এ-কান থেকে সে-কান , এ-পাড়া থেকে ও পাড়া পৌঁছে দেওয়াই তাদের কাজ। এই ধরনের মানুষগুলোর উপস্থিতি আমাদের গ্রাম বাংলায় প্রচুর আছে। শহর অঞ্চলে এই ব্যাপারটা নেই। তারা যে যার নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালোবাসে। অন্যের সমালোচনা থেকে তারা বিরত থাকে। আসলে তারা খুব কাজ মুখো মানুষ। তাদের বেঁচে থাকার জন্য, এই শহরে টিকে থাকার জন্য অর্থের চাহিদা অনেক। আর গ্রাম অঞ্চলের মানুষরাও যে কাজ করে না তা নয়। সে কথা আমি বলতে চাই নি। কিন্তু এখানে সমালোচনা করার মানুষের অভাব নেই। এটা কিন্তু সত্য।


আমার এই অভিযোগ, অনুযোগ কিন্তু অনেকটাই সত্য। যদিও সমাজের এই চিত্র সব জায়গায় দেখা যায় না। কিছু কিছু গ্রাম্য এলাকায় এই ধরনের মানুষ আজও আছে। আমি সেই বাস্তব দৃশ্যপট থেকেই নিজের অনুভূতির কথা গুলো আজ লিখলাম। আপনারা পড়ে গঠনমূলক কমেন্ট করবেন। জানি অনেক নেতিবাচক কমেন্ট আসবে। তবে আমার ব্যক্তিগত দিক থেকে যেটা মনে হলো সেটাই লিখলাম অকপটে। 


আজকের ব্লগটা এত টুকুই। আবার ফিরব নতুন লেখা নিয়ে। আজ তবে আসি।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ