বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায় ফিরে যেতে চাই চিরন্তন অতীতে...

 


( আমার ই ছবি। ai দিয়ে এডিট করা)

আজও প্রকৃতির আপন খেয়াল এ বৃষ্টি নামে। বর্ষা নামে শহর জুড়ে। শুকনো পাতায় সজীব হয়। হালকা হওয়ায় নেচে ওঠে প্রকৃতির সাথে অমোঘ খেলায়। গত বছর যে বৃষ্টিকে সে প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে বিদায় দিয়েছিল, সে আবার আজ এসে ধরা দিল প্রতিটা ডালে, পাতায় .. শিরা , উপশিরার মতো শিকড়ে শিকড়ে। মনের গহিনের মতো মাটির অন্তরে অন্তরে। প্রকৃতি কথা রেখেছে। প্রকৃতি কথা রাখে। বিদায় নিলেও বর্ষ হন্তে আবার এসে সে ছুঁয়ে যায় ধরিত্রী কে। চির সবুজে ভরিয়ে দেয়। আবার নতুন করে । প্রকৃতি আবার ঝলমল করে ওঠে।



কিন্তু ভালোবাসা আর ফিরে আসে না। বৃষ্টি ভেজা ভালোবাসার মুহূর্ত গুলো স্মৃতি হয়েই থেকে যায়। কোন এক একান্ত বৃষ্টি ভেজা দিনে একলা মনে  আবার ও মনে পড়ে যায় সেই ফেলে আসা ভালোবাসার মানুষ টার কথা। তার সাথে কাটানো মুহূর্তের কথা। বড্ড বেশি জানতে ইচ্ছে করে তার ও কি ওপার প্রান্ত থেকে এখন ও আমার কথা মনে পড়ে? মনে পড়ে আমার সাথে কাটানো সেই বৃষ্টির দিনটার সময় গুলো? 


কি জানি... সময় অনেক টা পেরিয়ে গেছে। স্মৃতি রও বয়স হয়েছে নয় নয় করে প্রায় 13 টা বছর। যৌবন থেকে আমিও তো পরিণত হয়েছি। সংসারে ডুবে আছি। সেও হয়তো এই বৃষ্টি মুখর বিকেল এ অফিস, কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। বউ, ছেলে হয়তো ফোনে তার সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা সারছে। সুখে আছে। ব্যস্ত জীবন নিয়ে সময় কাটিয়ে দিচ্ছে আনন্দে।


আমিও আছি বেশ। এই বৃষ্টি। একান্ত ই একটা সুন্দর মনোরম বিকেল। আকাশ মেঘ করতে না করতেই এক ছুট্টে রান্না ঘর থেকে এক কাপ লিকার চা করে নিয়ে এসেছি। সাথে দুটো বিস্কুট। ঝমঝম বৃষ্টি টা উপভোগ করবো বলে। না... ছেলেকে আমার সাথে অনুমতি দিই নি আস্তে। ও নিজে থেকেও আসে নি অবশ্য। ও ফোন দেখে আঁকতে ব্যস্ত এখন। আর আমি তোমার স্মৃতিচারণা য়।


সময় গুলো চোখের সামনে স্পষ্ট চলে আসে সিনেমার মতো। বৃষ্টির শব্দ গুলো অস্ফুট হতে থাকে। ঠান্ডা বাতাস টা আরো স্মৃতির গভীরে তলিয়ে নিয়ে যায়। ফিরে যাই 13 বছর আগের কাহিনীতে...


ফোন করে বলেছিলে আজ কোচিং এ যেতে হবে না। চলো কোথাও ঘুরে আসি।

--- না, না আর কয়েকদিন বাদেই কলেজের পরীক্ষা। কামাই করলে হবে না গো। নোটস মিস হয়ে যাবে।


-- প্লিজ , চলো না... সারা সপ্তাহে অফিস শেষে এই একদিন ই তো ছুটি পাই। কথা রাখবে না তো??


( তখন তুমি সদ্যই একটা বেসরকারি কোম্পানি জয়েন করেছ। ঠিকঠাক  দেখা হতো না। ফোন অবশ্য তখন ভালো ই করা হত।  তোমার কথা আর ফেলতে পারি নি। রাজি হয়ে গেলাম। আর অন্য একটা বন্ধুকে বলে দিলাম। ব্যাপারটা ম্যানেজ করে নিতে। আর পরে নোটস গুলো দিয়ে দিতে।)


দেখা হলো ঠিক চেনা সেই জায়গায়। এখনো মনে পড়ে ওখানে একটা বিরাট কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। গাছ ভর্তি লাল ফুল হতো। কত ফুল নীচে পরেও থাকতো। দূর থেকে দেখতাম তুমি বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। তারপর বাইকে উঠে চলে যেতাম একটা পার্কে। ফেলে আসা কৃষ্ণচূড়া ফুল পেরিয়ে আমরা এখন উদ্দাম প্রেমিক প্রেমিকা। বাইক চলছে ধীর গতিতে। প্রেম চলছে গভীরে। ওদিকে আকাশ এ মেঘের ঘনঘটা।


- বললাম তোমায় আজ মেঘ করেছে বেরোতে হবে না। কোচিং চলে গেলেই ভালো হতো। 


- মেঘ তো কি হয়েছে। আজ তো আমরা বৃষ্টিতে ভিজবো।

-- উম ! খুব শখ।

পার্কে ঢুকতে না ঢুকতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি এসে গেল। বাইক টা রেখে এক ছুট্টে একটা শেডের নীচে এসে দাঁড়ালাম। সঙ্গে সঙ্গে একটা বিদ্যুতের ঝিলিক আকাশের বুকে চিড়ে এঁকে গেল। আমি ভয়ে তোমার হাত টা চেপে ধরলাম। বৃষ্টিতে ভিজে তোমার লোমশ হাত টা আরো মোহময় লাগছিল। হাত টা চাপতেই তুমি পাশ ফিরে আমার চোখে চোখ রাখলে। আলতো ছোঁয়ায় তোমার শরীরটা আমার শরীরকে স্পশ করলো। ব্যাস এত টুকুই। সেই ছিল প্রথম ভালোবাসা। প্রথম স্মৃতির বৃষ্টি। সুন্দর একটা মুহূর্ত। আর বেশি ঘনিষ্ঠ তা ছিল না। তারপর... তারপর আর কি বৃষ্টি থামার জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা। সাথে আমাদের প্রেম। 


সে সবই চোখের সামনে ভেসে এলো। আজ ও একটা বৃষ্টির বিকেল। কিন্তু অন্যরকম। এটাও খারাপ নয়। এখন আমি পরিণত অনেক টা। সে ভালোবাসা পরিণতি পায় নি। ফেলে আসা কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতোই সে ভালোবাসাও আমরা ফেলে এসেছি। সময় এখন অনেকটা গড়িয়েছে। বলা ভালো অনেক গুলো বছর। তবু সে স্মৃতি ফিরে আসে মাঝে মাঝে। 


দুঃখ , কষ্ট, সেই না পাওয়ার বেদনা আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। চরম ব্যস্ততায় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি প্রতিটা দিন। পরিবার এর প্রতিটা মানুষের দেখভালের দায়িত্ব আমার। আমি তা নিয়েই সুখী। সেও হয়তো তার পরিবার নিয়ে খুব সুখী। তবুও এমন মেঘলা দিনে কিংবা কখনও বিষন্ন ঘুম না আসা  রাতে যদি তার কথা মনে পরে যায় ভাবি আজ কি মনে আছে তার সেই অষ্টাদশী প্রেমিকার কথা? এক ফোটা চোখের জল গাল দিয়ে বেয়ে যায়। সন্তর্পণে হাতের মুঠোয় মুছে নিই। চকিতে ফিরে আসি বাস্তবে। ফিরে দেখি কর্তা মশাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তার  কপালে একটা চুম্বন এঁকে, ঘুমন্ত ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে পরম সুখে তাদের মাঝে আবার সুখনিদ্রা দিই।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ