বৌ সোহাগী বর

 - আজকে কি বার বলো তো?


- বুধবার... দাড়ি তো অলরেডি কাটতে শুরু করেই দিয়েছো। আর জিজ্ঞাসা করে লাভ কি...


- বুধবার যখন অসুবিধা নেই কি বলো? তোমার তো আবার বৃহস্পতি বার, মঙ্গল বার, শনিবার , ছেলের জন্মবার এসব দিন গুলোয় চুল, দাড়ি কাটলে মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায়।


- তা যাবে না? যেটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মেনে চলছে সেটা তো মানতে হবে বইকি... আর সব কিছু কেই কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এগুলো গুরুজনদের দেওয়া আদেশ বলে আমি মেনে চলি। আর আমি মানবোও।


- তা বেশ তো...তুমি মানতেই পারো। আর আমি তোমার বাধ্য স্বামী কিনা...আমাকেও মানতে হবেই। তবে তোমার ছেলে, ছেলের বউ ভবিষ্যতে কি করবে বলতে পারবো না। এই নিয়ে আবার না ঝামেলা হলে হয়। 


- এই শোনো, ছেলের বয়স এখন মাত্র দশ বছর। আর বিয়ে হতে ঢের দেরি।


- তবুও...অদূর ভবিষ্যত টা যেনো আমি সামনে দেখতে পাই। তাই আশঙ্কা করি। 


- ওতো ভবিষ্যতে তলিয়ে যেতে হবে না। বর্তমানে ফিরে এসো। তাড়াতাড়ি সেভ করে নিয়ে বাজারে যাও।


- আবার বাজার? এই তো সকাল বেলায় কচু, ঘেঁচু যা বললে সব লিস্ট ধরে নিয়ে এসে দিলাম।


 - আর বোলো না...বিকেলে তোমার শশুর, শ্বাশুড়ি আসবে। সাথে মামা শ্বশুর, শালী সবাই। তার জন্য কিছু ব্যবস্থা করতে হবে তো না কি?


- আচ্ছা, ওনারা আসবেন আজ ...তুমি আমায় আগে কেনো বলো নি বলো তো?


- ওহ্...তুমি জানতে না বুঝি? আমি তো ভাবলাম শালী আসবে বলে তুমি দাড়ি, গোঁফ কামিয়ে ছোকরা হতে চাইছো।


- ধুর! তোমার সবসময়ই ইয়ার্কি জানো তো... যাও...আমি আর দাড়ি কামাবো না।


- এই রে...তাহলে একঘর আত্মীয় দের সামনে হাফ দাড়ি নিয়ে ঘুরবে?


- তোমার সাথে আমি আর বকতে পারবো না। কি কি আনতে হবে তাড়াতাড়ি লিস্ট করে দাও। আমি বাকি কাজটা সেরেই বেরিয়ে পরবো আনতে। নাহলে দুপুরের দিকে অনেক দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।


- হ্যাঁ দিচ্ছি। আরে আমিও জানতাম না ওনারা আসবেন। জানলে তো সকালের দিকেই আসতে বলতাম। বাবার বাড়িতে মামা, আর মাসির মেয়ে বেড়াতে এসেছেন। সেজন্যই মা বলল, মামাকে আর বোনকে আমাদের বাড়ি ঘুরিয়ে আনবে। তাই একটু আগে আমায় ফোন করেছিল।


- ওহঃ। তাহলে কি কি রান্না করবে ভাবছো?


- বিকেলের দিকে আসবে তো। আবার সন্ধ্যার সময় করেই চলে যাবেন। 


- আজ রাতটা তো থেকে যেতে পারেন ওনারা। এসেই আবার চলে যাবেন... 


- মা, ফোন করে বলতেই আমি বলেছিলাম জানো তো, আসছই যদি রাত টুকু অন্তত থেকে সকাল বেলার জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়বে। কিন্তু মা বললেন, মামার নাকি পরদিনই অফিস। তাই জন্য...


- হুমম...আসলে অনেকদিন পর তোমার মামা, বোন আসছেন। একটা দিন অন্তত থেকে গেলে আমাদেরও ভালো লাগতো। আর তাদেরও ।


- সে তো বটেই। কিন্তু কি আর করা যাবে বলো। এখন মানুষ বড্ড বেশি ব্যস্ত। এখন আর কেউ আগের মতো আত্মীয়দের বাড়ি গিয়ে দু - চারদিন করেও সময় কাটাতে পারে না। ওই অনুষ্ঠান, পুজো এইসময়ই সকলের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়। আগে তো আমরা গরমের ছুটি পড়লে, শীতের ছুটি পড়লে কত দিনের জন্য মামার বাড়ি, পিসির বাড়ি, সব ঘুরতাম। আর এখন ,তো স্কুলের ছুটিও কম। আর সিলেবাস ও প্রচুর। ছুটিতে পড়তে পড়তেই দিন শেষ। ঘুরতে যাওয়ার সময় কোথায়।


- এটা একদম তুমি খুব খাঁটি কথা বলেছো। আজকাল কার ছেলে মেয়েরা যেনো পড়াশোনা, একটিভিটি এসবের মধ্যেই ব্যস্ত। একটু প্রাণ খুলে হাসতে, খেলতে পারে না বেচারারা।


- কথায় কথায় বেলা অনেক হয়ে যাচ্ছে। তুমি চট করে বাজারটা করে নিয়ে এসো। আমি ফর্দ করে দিয়েছি।


- কি রান্না করবে ঠিক করলে শুনি?


- ঐতো...ভাবছি খাসির মাংস, লুচি, বেগুন ভাজা, শিমুই, আর একটু ঘুগনি করবো। মটর কড়াই ছিলই। ভিজতে দিয়েছি। মেনুটা ঠিক আছে?


- হ্যাঁ, ঘরোয়া একদম বাঙালি খাবার। আর মিষ্টি কেমন আনবো? রস জাতীয় নাকি সন্দেশ মতো?


- মিলিয়ে মিশিয়ে এনো। পাঁচ রকম আনবে। 


- আচ্ছা, সিংড়া আনবো?


- না না...ওনারা তো দুপুরের ভাত খেয়েই বেরোবেন। এসে আর ওতো কিছু খাবেন না। শুধু পাঁচ রকম মিষ্টিই দেবো। তারপর তো রান্না করছিই ।


- কোল্ড ড্রিঙ্কস আনবো তো?


- হ্যাঁ, নিয়ে নিও। আমি আসলেই প্রথমে দই এর ঘোল করে দেবো। আর কোল্ড ড্রিংক টা লুচি খাওয়ার পর লাস্ট এ দেবো।


- এটাই ভালো অপশন। আর ওনারা সবাই খাসির মাংস খান তো? নাকি অল্প করে চিকেন ও একটু আনবো?


- হ্যাঁ, খাসির মাংস খায় সবাই।


- ঠিক আছে। আমি তাহলে বেরিয়ে পরছি। 


- ঠিক আছে। আমি মশলা গুলো রেডি করে ফেলি। 


- বলছি, ওনারা এত দিন পর আমদের বাড়ি আসছেন। তোমার মামাকে, মাসির মেয়েকে একটা করে তো কিছু উপহার দেওয়া উচিত নাকি?


- হ্যা গো...ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছো। সত্যিই একদম খেয়াল ছিল না। কি যে লজ্জায় পড়তাম পরে। তুমি এক কাজ করো, মামার জন্য একটা জামা, প্যান্টের পিস কিনে এনো। আর মাসির মেয়ের জন্যও একটা চুড়িদারের পিস। 


- আর ওনাদের সাথে মা, বাবাও তো আসছেন। ওদেরও কিছু আনি।


- আনো। কিন্তু মা, বাবাকে তো দেওয়া হই সেজন্য আর কি...


- তবুও একসঙ্গে আসছেন। ওনাদের সবাইয়ের জন্যই কিছু নিয়ে আসি। 


- আচ্ছা, যা ভালো বোঝো। আনবে 


- একটা কথা বলবো চৈতি...


- আবার কি হলো?


- বলছি রাগ করবে না তো?


- না, কি বলছো বলো...


- জামা, কাপড় আমি একা কিনতে পারি না ঠিক মতো। তুমি তো জানোই। তুমি একটু সঙ্গে যাবে?


- হ্যাঁ...রাজ্যের কাজ ফেলে রেখে আমি এখন তোমার সাথে শপিং করতে যাই আর কি...


- আমি কি সবকিছু ঠিকঠাক আনতে পারব?


- হ্যাঁ পারবে। সেজন্যই তো রেডিমেড কিছু আনতে বলি নি তোমায়। জামা, প্যান্টের পিস, চুড়িদার পিস এসব আনতে বলেছি।


- আচ্ছা...ঠিক আছে। দেখি কতদূর কি করতে পারি। 


- হ্যা যাও...আর তাড়াতাড়ি ফিরবে। এক করো... আগে মুদিখানা, মাংস ওই গুলো নিয়ে এসে দাও। তারপর জামা কাপড় কিনতে যেও।


- ঠিক আছে গো। সেটুকু বুদ্ধি আমার আছে।


- তাও ভালো। সুবুদ্ধি হয়েছে তাহলে ...


- চটপট কেনাকাটা করে এনে, তোমার সাথে হাতে হাত লাগিয়ে রান্না তে হেল্প ও করে দেবো। অত টেনশন করতে হবে না তোমায় ।


- তাই নাকি? তাহলে তো আমি সোনায় সোহাগা। এত বাধ্য স্বামী আমার কবে থেকে হলে গো তুমি?


- যেদিন থেকে তোমার রণমূর্তি দেখেছি সেদিন থেকে।


- কি বিড়বিড় করে বললে বলো তো...


- ও কিছু না...ফর্দ দেখে হিসেব করছিলাম আর কি...


সমাপ্ত

- 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ