আমি হাজার সন্তানের মা ( মন ভালো করে দেওয়ার মতো গল্প)

  - সব গুলো টাকাই তো খরচ হয়ে গেলো। এখনো মাস শেষ হতে অনেক দেরি। কি করে চলবে?


- সে ভাবনা তোমায় ভাবতে হবে না রাজলক্ষ্মী। তুমি আমার ঘরের রানি। তোমায় সাজানোর জন্য কখনো অর্থ ভান্ডার আমার শূন্য হবে না।


- কাব্যের কথা কইও না। এই একজোড়া পায়ের নুপূর, আর এই শাড়িটার মূল্য বুঝি আমি অনুমান করতে পারছি না...


- তুমি অর্থ নিয়ে চিন্তা কোরো না। আমি যে তোমার জন্য ভালোবেসে এগুলো নিয়ে এসেছি আগে বলো পছন্দ হয়েছে কি?


- বেশ পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আজকাল তুমি বড্ড বেহিসেবী হয়ে যাচ্ছ। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করছো।


- কি করব বলো রাজলক্ষ্মী...আমারও তো ইচ্ছে হয়...


- তা বলে আগো পিছু না ভেবে জিনিস কিনে নিতে হবে? এবার সংসারটা কীভাবে চলবে বলো দিকি...


- সংসার কি আর তুমি,  আমি চালাচ্ছি? চালাচ্ছেন তো ওপর ওয়ালা। তাঁর আশীর্বাদ যদি সর্বদা মাথার ওপর থাকে দেখবে ঠিক হেসে খেলে আমরা জীবনটা কাটিয়ে দেবো।


- হ্যাঁ, তোমার ওই ওপরওয়ালার আশীর্বাদ কত আছে তা আমি জীবন দিয়ে টের পাচ্ছি। 


- আবার কি হলো রাজলক্ষ্মী? তোমার চোখে জল কেন?


- ছাড়ো...কিছু না...


- কি হয়েছে বলো আমায়? আবার তোমায় কেউ কিছু বলেছে বুঝি?


- না, কেউ আর কিচ্ছুটি বলে নি। মানুষ একসময় কু কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে যায়, কিন্তু ভগবানের , ভক্তের প্রার্থনা ,চোখের জল দেখতে দেখতেও মায়া হয় না। তাই তো উনি চান নি বলেই আমি বাজা।


- রাজলক্ষ্মী...তোমায় আমি কতবার বলেছি ওই শব্দটা আমার সামনে কোনোদিনও তুমি উচ্চারণ করবে না। 


- আর আমায় যে প্রতিনিয়ত আড়ালে, আবডালে এ কথা শুনতে হয়...


- তুমি আমায়  বলো কে বলেছে?


- শুনে তুমি কি করবে বলো না... কটা মানুষকে তুমি চুপ করাবে। আর তারা যেটা বলেছে ঠিকই তো বলেছে । এত বছর হয়ে গেলো এখনো সন্তান সুখ যে কি তা অন্তর থেকে বুঝতে পারলাম না।


- ওসব কথা ছাড়ো। আমায় এক গ্লাস জল এনে দাও। স্বামীটা কাজ থেকে ঘরে এলো কোথায় একটু জল দেবে তা নয়... পাড়া পড়শির কানাঘুষার আজগুবি গল্প নিয়ে দুঃখ করতে বসেছে। 


- বাহ: জল টা বেশ ঠাণ্ডা আছে তো। আগের সপ্তাহে হাট থেকে যে কুঁজোটা এনেছিলাম। তাতে বুঝি ছিল জলটা?


- হ্যাঁ। রাতে কি খাবে বলো। অল্প একটু চাল আর গোটা দুই আলু আর একটা বেগুন আছে।


- এতেই খাওয়া একদম জমে যাবে। গোবিন্দ আমার জন্য এত সুস্বাদু খাবারের জোগান রেখেছেন। আর তুমি সব কিছু নিয়ে এত চিন্তিত। ওগো চিন্তা কোরো না। শুধু ওপর ওয়ালাকে ডাকো। তার নাম সর্বদা জপ করো। সংসারের কাজ করো, আর তাকে স্মরণ করো। দেখবে জীবনে কোনো কষ্টই তোমায় স্পর্শ করতে পারবে না। আজ আমায় ঈশ্বর বললো, যা হরিহর, বৌয়ের জন্য এক জোড়া নূপুর কিনে নিয়ে যা... মা লক্ষ্মীকে পায়ে নুপূর ছাড়া বড় বেমানান লাগে। তাই তো কিনে নিয়ে এলাম। সাথে শাড়িটা। কই তোমার পা দুটো আমার দিকে বাড়িয়ে দাও দিখি...


- ওমা, একি অলুক্ষণে কথা...স্বামীর দিকে পা এগিয়ে দেবো কেনো গো? এযে শোনাও মহাপাপ।


- এতে তোমার বিন্দুমাত্র পাপ হবে না গো। পা দুটো আগিয়ে দাও।


- আলতা পায়ে তোমার পায়ের সৌন্দর্য্য যেন আরও ঠিকরে পড়ছে গো রাজলক্ষ্মী। ঠিক যেন সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মীর পা। আলোকিত করে আছে আমার ঘর জুড়ে। আর এই পায়েই যে এই গয়না গুলো মানাবে।


- করো কি...তোমায় পড়াতে হবে না। আমি নিজেই পরে নিচ্ছি দাও। 


- দয়া করো রাজলক্ষ্মী। এটুকু কাজ আমায় নিজে করতে দাও। তাহলে নিজেকে মন থেকে ভাগ্যবান মনে করব।


- কি যে পাগলামি তুমি মাঝে মধ্যে করো না... লোকজন ও তোমার বউ ভক্তি দেখে মুখ বাকায়। পিছনে নানা মন্দ কথা বলে।


- আমি লোকের কথা শুনতে চাই না রাজলক্ষ্মী। তুমি আমার জীবনসঙ্গী। আমি শুধু তোমায় ভালো রাখতে চাই। তোমার সুখের কথা ভাবতে চাই। তোমার মুখে সর্বদা হাসি দেখতে চাই। ভালো করে চেয়ে দেখো, খুব সুন্দর সাজে সেজেছে তোমার পা গুলো। তুমি সবসময় এই নূপুর জোড়া পায়ে রাখবে। আমি মরে গেলেও। এই তোমায় দিব্যি দিলাম।


- ছি! ছি! ও কথা শোনাও যে মহাপাপ। তুমি এতটা নিষ্ঠুর কি করে হতে পারলে? আমায় আঘাত দিয়ে কথা বললে তুমি খুব সুখ পাও তাই না?


- আঘাত দিই নি তো। রাজলক্ষ্মী, তুমি আমার ঘরের লক্ষ্মী। যে যাই বলুক তোমার মধ্যে আমি দেবী দর্শন করতে পারি। তুমি কখনো বাজা হতে পারো না। ভগবান তোমায় নিজের সন্তান নাই বা দিল ভালো করে নিজের অন্তরকে পড়ে দেখো, তোমার মাঝে লুকিয়ে আছে এক অসামান্য মাতৃত্ব বোধ। আমি পরখ করেছি গো। আমি তোমায় ঠিক চিনে নিয়েছি। তুমি যে লুকিয়ে ইট ভাটার গরিব শিশুদের খাইয়ে পড়িয়ে তৃপ্তি পাও এ আমার অজানা নয় গো। আমি জানি। যে কিনা নিজে সাক্ষাৎ দেবী অন্নপূর্ণা তার ঘরে আবার অন্নের অভাব হয় গো? তুমি তো দশের মা, এই জগতের মা। গর্ভে ধারণ করলেই বুঝি মা হওয়া যায় নাহলে হওয়া যায় না? 


- তবু নিজের পেটের সন্তান...


- ওগো সারদা মায়েরও যে নিজের সন্তান ছিল না। তিনি তাহলে কি করে সকলের 'মা ' হয়ে উঠলেন বলো দেখি। মনটাকে এতটাও সংকীর্ণ করে ফেলো নি সমাজের উস্কানিতে। সব কিছুর পরিকল্পনা সেই ওপর থেকে চালনা করছেন উনি। তোমার যে অনেক কাজ। তোমার জন্য কত অসহায় শিশু একটু আদর, স্নেহের জন্য অধীর অপেক্ষা করে থাকে আর তুমি হাপুস নয়নে জীবনে  কি পেলে কি পেলে না তার হিসাব কষতে বসো?


- জানো তো, ওই ইট ভাটার বাচ্চাগুলোকে একটু আদর যত্ন করলে আশেপাশের লোক গুলো নানারকম কু কথা বলে। বলে -' নিজে একটাও পেটে ধরতে পারে নি অন্যের বাচ্চা নিয়ে আদিখ্যেতা, কখনো আমায় বলে আমি নাকি বাজা। কোনো শুভ অনুষ্ঠানে তাই আমায় কেউ ডাকে না। ' আমার খুব কষ্ট হয় গো শুনে। বুকটা ফেটে যায়। তবে এটাই আমার জীবনের পরম পাওয়া তোমার মতো দেব তুল্য একজন মানুষকে আমি স্বামী রূপে পেয়েছি। আমি সারাটা জীবন তোমার চরণেই থাকতে চাই। সারা পৃথিবীর লোক আমায় দূরে সরিয়ে দিলেও তুমি কখনো আমায় বঞ্চিত করবে না তো? 


- এত দিনে তবে আমায় এই চিনলে রাজলক্ষ্মী? আমি তোমায় দেবী জ্ঞানে মানি। একটা কথা মনে রেখো রাজলক্ষ্মী...ভগবান সবাইকে যেমন একই রূপ, গুণ দিয়ে পাঠান নি তেমনই সকলে একই কর্ম দিয়েও পাঠান নি। দৃষ্টি ভঙ্গি বদলাও। কর্ম করে যাও। তাকে ডাকো। তিনি নিশ্চই কিছু পথ দেখাবেন। তোমায় নিয়ে ভগবানের পরিকল্পনা হয়তো অন্যকিছু। আর পাঁচটা সাধারণ নারীর মতো তোমার কাজ নয়। তোমার মনটা মমত্বে ভরা। তোমার যদি নিজের সন্তান থাকতো অন্য শিশুদের এত সময় দিতে পারতে? পারতে না। ঈশ্বরের এমনই ইচ্ছা। এটা মেনেই জীবন পথে এগিয়ে চলো তুমি। দেখবে মনে অনেক শান্তি পাবে।


- তুমি কি করে জানলে আমার এই পথেই শান্তি মিলবে?


- ওগো...তোমার চোখে যে আমি সেই গভীর মাতৃত্ব বোধ দেখেছি। সেই করুণা দেখেছি। 


- কিন্তু তুমি যে কোনদিন নিজের সন্তানের মুখ থেকে বাবা ডাক শুনতে পেলে না এ যে আমার কত বড় ব্যর্থতা। ভাবলেই মনে হয়, আর তোমার সামনে কোনো দিন দাঁড়াবো না। এই পোড়ামুখী মুখ টা নিয়ে যেদিকে দু চোখ যায় চলে যেতে ইচ্ছে হয়। শুধু আত্মহত্যা যে মহাপাপ তাই সে কথা ভাবি না। 


- ও কথা ভুলেও কখনো মনে এনো না। একটা গোটা বিশ্ব সংসারের ভার তোমার উপর ভগবান সপে দিয়েছেন। সেই দায়িত্বটা মন দিয়ে পালন করার চেষ্টা কোরো। 


- আজ তোমার পা দুটো ছুঁয়ে আরও এক বার প্রণাম করলাম।


- তা বেশ। আমি তোমার স্বামী। আমায় প্রণাম করতেই পারো। কিন্তু হঠাৎ প্রণাম...


- আমায় নব জীবন উপহার দেওয়ার জন্য। আর আশীর্বাদ করো আমি যেন ভগবানের নির্দেশ মতো সেই কাজ অন্তর থেকে পালন করতে পারি। আমি যে মা। আমি হাজার সন্তানের মা। লক্ষ লক্ষ সন্তানের মা। 


সমাপ্ত



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ