- ভালো আছেন বৌদি?
- হ্যাঁ গো...ভালো আছি। তুমি ভালো আছো প্রহ্লাদ?
- এই তোমাদের আশীর্বাদে চলে যাচ্ছে। করে কর্মে খেতে পারছি এই যা... তা দাদা কেনো এবারে এলেন না?
- আর বোলো না ...ওদিকে কাজের ভীষণ চাপ। বিয়ের সিজেন চলছে কি না। তাছাড়া সারাবছরই কম বেশি চাপ আছেই। তাই এই বছর আর আসতে পারলেন না। তুমি ঘরে এসো প্রহ্লাদ। রোদে দাঁড়িয়ে কথা বলছো। ঘরে এসে বসো।
- বৌদি আজ নাহয় থাক। পরে একদিন আসবো। চা খেয়ে যাবো। এখন তো বেশ কয়েকদিন আছেন... কি তাইতো?
- না ভাই, এবারে আর বেশিদিন থাকবো না। ওদিকে তোমার দাদা আর ভাইপো ওখানে আছে। নিজেরা রান্না করে খাবে। তাই আর বেশিদিন থাকলে চলবে না। ওই যে
কথায় আছে শিকড়ের টান। সেই টানেই প্রতি বছর এখানে আসতে হয়। দেশের মাটি, দেশের মাটির গন্ধ , চেনা মানুষজন ...বড্ড টানে জানো তো মনটা। তুমি ঘরে এসো ভাই। তোমায় কিছু জিনিস দেওয়ার আছে।
- এই সোফাটা কি নতুন কিনেছেন বৌদি? বেশ নরম কিন্তু।
- হ্যাঁ গো। দিল্লি তে থাকালীনই ফ্লিপকার্টে অর্ডার দিয়ে আনিয়েয়েছি। আমার শাশুড়ি মায়েরও ভীষণ পছন্দ হয়েছে। উনি তো এখন এখানেই বসে টিভি দেখেন। এই মাস খানেক হলো নেওয়া হয়েছে। তাই হয়তো তুমি লক্ষ্য করো নি। আমরা না থাকলেও মাঝে মাঝে আসবে প্রহ্লাদ। তোমার কাকিমাকে একটু দেখে যাবে। যদিও আমার শাশুড়ি মা সব সময়ই তোমার কথা বলেন। তোমার কথা, রিয়ার কথা, তোমার ছোট্ট মেয়েটার কথা। ওর শুনছি খুব পাকা পাকা কথা হয়েছে?
- আর বলবেন না বৌদি। রিয়া তো ওকে নিয়ে নাজেহাল। সংসারের কাজ করবে নাকি ওকে ধরবে। সবসময় নয় এটা ধরে টান দিচ্ছে, না হয় জল নিয়ে খেলছে। সারাদিন কিছু না কিছু অন্যায় করতেই আছে। ওকে নিয়েই যে দিন কোথা দিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে বোঝার উপায় নেই। আর এখন তো আবার একপা দু পা হাঁটতে শিখেছে। টলমল করে হাঁটছে। সব সময় পরে যাওয়ার ভয়।
- হুমম, এসময়টা খুব সাবধান। বাচ্চারা তো ভীষণ দুরন্ত হয়। সব সময় চোখে চোখে রাখবে। রিয়াকে বলে দেবে, যা হোক যেকোনো একটা পদ রান্না করলেও চলবে। তবু বাচ্চার যেন সবটুকু খেয়াল রাখা হয়। এদিকে আমার কাণ্ড কারখানাটা একবার দেখো, তোমায় এক গ্লাস জলটা পর্যন্ত দেওয়া হয় নি।
- ওহ ঠিক আছে। ঘরের লোকের সাথে ওতো ফরমালিটিস করলে চলে না।
- না গো... আমারই ভুল। শোনো , ভাই প্রহ্লাদ... এই ধরো... জিনিসগুলো সাবধানে নিয়ে যাবে।
- বাবা! বেশ ভারী কিন্তু। কি আছে এতে?
- পুঁচকিতার জন্য একটা খেলনা। এটা নিয়ে যেও। আর ওর জন্য দুটো জামা কিনেছি, রিয়ার জন্য একটা চুড়িদারের পিস ওগুলো কাল পরশু করে তোমার বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসবো। আর পুচকি টাকে দেখে আসবো।
- সেই ভালো বৌদি। কাল পরশু করে যেও। আমি তাহলে আজ আসি বৌদি।
- এই বসো তো। এসে থেকে শুধু যাচ্ছি যাচ্ছি। আমি নিজে হাতে করেছি জলখাবারে মোগলাই পরোটা। নিয়ে আসছি ।
- ওরে বাপ রে...এই একটু আগে বাড়ি থেকে মুড়ি আলুর তরকারি খেয়ে বেরিয়েছি। এখন আর কিছু পেটে ধরবে না বৌদি।
- তুমি থামো তো। এই বয়সে খাবে না তো কোন বয়সে খাবে শুনি? তুমি বরাবরই ভীষণ লাজুকে। সেই আমার বিয়ের পর থেকেই তোমায় দেখছি এখনো এত বড় হয়ে গেলে লজ্জা ভাবটা এখনো যায় নি। নাও...ধরো...সবটা খেয়ে নেবে কিন্তু। আর দেখো তুমি এসেছো শুনে আমি রান্না ঘরে মোগলাই আনতে গেছি মা আবার সাথে দুটো নারকেল নাড়ু আর তিলের নাড়ু ও দিলেন। বললেন ,আমাদের প্রহ্লাদটা নাড়ু খেতে ভীষণ ভালোবাসে।
- বাবা...এত কিছু...খেলে তো একদম পেট ফেটে যাবে।
- কিচ্ছু হবে না। আসতে আসতে খেয়ে নাও। আর আমি রিয়ার জন্য একটা মোগলাই আর কয়েকটা নাড়ু টিফিন বক্সে দিচ্ছি। নিয়ে যেও...
- বৌদি থাক না...আবার...
- বড়ো দের কথা শুনতে হয় ভাই। তুমি খাও।
- বলছি... বৌদি আপনাদের যে দিল্লিতে সোনা, হিরের ব্যবসা এত কেনাবেচা হয়। এত কারা গয়না কেনে বলুন তো? সবসময়ই তো বলেন কাজের চাপ আছে। মানে এখন যা সোনার দাম সেই হিসাবে বলছি। মানে এর মাধ্যমেই বোঝা যায় এক শ্রেনীর মানুষের অনেক অর্থ আছে। আবার এক শ্রেনীর মানুষ পরিশ্রম করেও সেই অর্থ কামাতে পারছেনা।
- সে তুমি ঠিকই বলেছো ভাই। কিন্তু যারা না খেটে চালাকি করে দু হাতে টাকা কামায় তাদের কথা আমি বলতে পারবো না। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা সত্যিই পরিশ্রম করেই সফল হয়েছেন। এই তোমার দাদাই, দেখো না...কোন ছোটো বেলায় দেশের বাড়ি ছেড়ে মুম্বাই এ গিয়েছিল সোনার কাজ শেখার জন্য। তখন আর কত বয়স হবে ওই চৌদ্দ কি পনেরো। তোমার দাদা তো বলেন, এইট পাশ করেই কাজে ঢুকে পড়েছিল। তখন তো আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। পড়ানোর ক্ষমতা ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিল। তারপর সেখান থেকে কাজ শিখে লোকের দোকানে কাজ করে একটু একটু করে টাকা জমিয়ে তারপর দিল্লিতে এসে একটা দোকান ভাড়া নিয়ে প্রথম নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন। এর মাঝেই কেটে গেছে অনেক গুলো বছর। পরিশ্রম করতে করতে অর্থ জমিয়ে তারপর একটা দিল্লিতে নিজের একটা দোকান কেনেন। আসতে আসতে ফ্ল্যাট কেনা হলো। সেই সব দিনগুলোর সাক্ষী তো আমি। দেখেছি, তোমার দাদা দিন রাত খেটেই একটু একটু করে এসব করেছেন। এখনো পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
- ঠিকই বলেছেন বৌদি। ভিন রাজ্যে গিয়ে, থেকে, কাজ শেখা মুখের কথা নয়। সবাই পারে না টিকে থাকতে। ওখানে তো বলে খাবার, থাকার খুব প্রবলেম হয়। তবু ছোট বেলায় কাজ টা চেপে শিখে নিলে বড়ো হয়ে কিছু করা যায় ।
- হ্যাঁ গো ভাই। পরিশ্রমের দাম আছে বৈকি...এই আমার ছেলেটাও কলেজ পাশ করে কোনো চাকরির চেষ্টা করলো না। বাবার সাথে ব্যবসার কাজে লেগে পড়ল। আসলে ও ছোটো বেলা থেকে বাবাকে টুকটাক হেল্প করত। এখন দুজনেই ব্যবসা টা দেখছে। আগের বছরই তো আরো একটা সোনার দোকান আমাদের নেওয়া হলো। শুনেছো নিশ্চই?
- হ্যাঁ শুনেছি। আগের বছরই দাদা যখন এসেছিলেন কালি পুজোর সময় তখন আমায় বলেছিলেন। আমায় আর রিয়াকে ওখানে যাওয়ার কথাও বলেছেন।
- হ্যাঁ এবারে কিন্তু আমাদের ওখানে যেও ভাই। রিয়াকে নিয়ে। মেয়েটাতো এখন একটু বড় হয়ে গেছে। তোমরা গেলে তোমাদের সাথে দিল্লির আশেপাশের ঘোরার জায়গা গুলো দেখে নেবো। তোমার দাদার আর ভাইপোর তো সময় হয় না। তাই দিল্লিতে থেকেও দর্শনীয় স্থান গুলো সব দেখা হয়ে ওঠে নি।
- আচ্ছা। যাবো। পরের বছর শীতের দিক করে ভাবছি যাবো।
- এ বছরই চলো না...
- এ বছর আর হবে না বৌদি। পরের বছর কথা দিচ্ছি যাবো। আর রিয়াকে ঘুরিয়ে আনবো। এত কিছু খেয়ে পেট একদম দমসম হয়ে গেছে। আজ তাহলে আসছি বৌদি। তুমি তাহলে এসো বাড়িতে। রিয়া সবসময়ই বাড়িতেই আছে।
- হ্যাঁ, ভাই এসো। আর রিয়ার জন্য এই টিফিনটা নিয়ে যাও। আর পুচকিতার খেলনাটাও।
- আচ্ছা ...ঠিক আছে। কাকিমা কি করছেন এখন?
- মা ওই ওপরে গেলেন পুজো করতে।
- ওহ...আচ্ছা। আজ তাহলে আসি।
- হ্যাঁ ভাই এসো।
সমাপ্ত
0 মন্তব্যসমূহ