- কি দেখছো পৃথা?
- দেখছি অন্ধকারে হাজার হাজার তারায় মোরা অসীম আকাশটাকে।
- আর...
- আর দেখছি ওই স্থির, উজ্জ্বল ওই ধ্রুবতারা। ও যেন একাই একশো।
- উম ...হুমম...কিছুটা ভুল বললে। ও একাই কোটি কোটি তারাদের থেকে ব্যতিক্রম। যেমন আমার চোখে তুমি...সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র।
- তাই বুঝি?
- এতে অবাক হয়ে যাওয়ার কি আছে। যেটা সত্যি সেটাই বলেছি।
- আমার প্রশংসা এখন না করলেও হবে মশাই। এসো, দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখি।
- হাতে হাত রেখে রাতের আকাশের পানে চেয়ে চেয়েও যে মধুচন্দ্রিমা করা যায় আজ এই মুহূর্তে এসে তা বেশ উপলব্ধি করছি।
- সত্যিই...অভিক... যেনো মনে হচ্ছে মুহূর্ত গুলো এখনই ঠিক এই জায়গাতেই থমকে যাক। প্রকৃতি যেন নিজের রূপকে আর এক চুলও পরির্বতন না করে।
- আমিও প্রেমে পড়ে গেছি পৃথা। তোমার...এই পৃথিবীর...এই প্রকৃতির...সব কিছুর মায়ায় জড়িয়ে গেছি।
- পৃথিবীর রূপ, রস, সৌন্দর্যের গভীরতা যে এতটা অনুভব করতে পারে সে কি করে নিজেকে শেষ করে দিতে চায়?
- চাইতাম... একটা সময় ছিল, নিজেকে খুব একা মনে হতো। আসলে এই পৃথিবীর যে , কেউই আমার আপন ছিল না। তাই বাঁচার রসদটাই যে আমার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। দিনের পর দিন একা বড় হতে হতে একা বাঁচতে বাঁচতে বাঁচাটাও যেন মৃত মানুষের সমান হয়ে গিয়েছিল। যেন আমি চলছি। কিন্তু আমার নিজস্ব সত্ত্বারা ছিল নীরব। সময় চলত তার নিয়মে। আর আমি অন্ধের মতো তাকে অনুসরণ করে এগোতাম। কোনো টান নেই, কোনো উত্তেজনা নেই , কারো জন্য চিন্তা নেই, করো জন্য ভয় নেই। ভালোবাসা নেই, মমতা নেই। কিচ্ছু নেই। কিচ্ছু নেই। নাথিং।
- ওসব অতীত নিয়ে বলার সময় এখন নয় অভিক।
- অভিক... আমার নামটা নিয়েও আমার মনে হাজার প্রশ্ন জানো তো পৃথা?
- কেনো?
- একটা বাচ্চা জন্ম হলে তার নামকরণ কে বা কারা করে...নিশ্চই বাচ্চাটার বাবা, মা কিংবা তাদের পরিবারের মানুষজনরা। কি তাই তো? আর আমার দেখো...আমি জানিই না আমার নামকরণ কে করেছে। ওই অনাথ আশ্রমের একজন সেবায়েত কাকু নাকি আমায় খুব ছোটো বেলায় কোনো এক রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে আশ্রমে এনেছিলেন। তাঁকে নাকি আমি আমার নাম বলেছিলাম অভিক। কি জানি কী এই নামকরণ করেছিল। নাকি নিজে থেকেই...
- এই যে তোমার সামনে আমি হাতে হাত রেখে বসে আছি। তোমার চোখে আমার চোখ রেখে মুহূর্তটা উপভোগ করছি। তুমি কেনো পারছো না অভিক... আমি কি তবে ব্যর্থ? আমার ভালোবাসার প্রলেপ কি এক অংশও তোমার অতীতকাহিনীকে মুছে দিতে পারে নি? আমি যে তোমায় বড্ড আপন করে নিতে এসেছি। তোমার জীবনের সবটুকু অপূর্ণ আশা, সম্পর্ক, স্বপ্ন গুলোকে পূরণ করতে এসেছি।
- তাই তো...তাই তো তোমায় খুব শক্ত করে আগলে রাখতে চাই পৃথা... তুমি ছাড়া যে আমার এই পৃথিবীতে আপন বলতে আর কেউ নেই। এই একটা সম্পর্কই আমার কাছে সত্য। পৃথিবীতে মা, বাবা, ভাই, বোন কোনো সম্পর্কেরই ভালোবাসা, কষ্ট, অভিমান, অভিযোগ আমি বুঝি নি। ভগবান আমায় এই সত্যতা থেকে কেন জানি না বঞ্চিত করেছেন। কিন্তু তুমি সারাজীবন থেকে যেও আমার স্ত্রী হয়ে। আমার ঘরের লক্ষ্মী হয়ে। আমার জীবনের সঙ্গিনী হয়ে। আমি যে ভীষণ একা। মান - অভিমান হলেও কখনো ভুল বুঝে চলে যেও না।
- যে হাত আমি একবার ধরেছি সেটা ছাড়ার জন্য নয় অভিক। সারাজীবন সেই হাতকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চাই। আমি তোমার সন্তানের মা হতে চাই। তোমায় একটা পূর্ণ পরিবার দিতে চাই। এরপর একের পর এক সম্পর্কের বাঁধনে তুমি বন্দি হবে। আজ তুমি আমার স্বামী। কদিন পর তুমি বাবা হবে। তারপর দাদু...তারপর...
- ব্যাস ...অনেক হয়েছে...এত তাড়াতাড়ি আমি বুড়ো হতে চাই না পৃথা। আমি তোমায় নিয়ে অনেক অনেক জীবন সুস্থ হয়ে চির যৌবন হয়ে বাঁচতে চাই।
- তাই বুঝি?
- হ্যাঁ...গো। যে জীবনটা ভীষণ রকম একঘেঁয়ে, কঠিন লাগত, আজ সেই জীবনটাই বেশ রোমাঞ্চকর লাগছে। এই চাঁদ, এই আকাশ, এই লক্ষ লক্ষ তারার নিচে বসে তোমার কোলে মাথা রেখে অনেক অনেক জমানো গল্পের পাহাড় সাজিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তোমার সাথে কাটানোর খুব সাধ হয়।
- এ জীবনে যত কষ্ট, যত অবহেলা, বঞ্চনা তুমি পেয়েছো, বাকি জীবনে তার শত গুণ বেশি ভালোবাসা, আবেগ, যত্ন দিয়ে তোমায় সাজিয়ে রাখবো।
- পৃথা, আজ রাতে কি রান্না করেছো?
- তোমার পছন্দের চিকেন দিয়ে রাজমা কারি আর নান পরোটা। আমি সত্যিই ভুলে গিয়েছিলাম... টাইমের দিকে খেয়ালই করি নি কখন যে এতটা রাত হয়ে গেল...ইস ! তোমার খুব জোর খিদে পেয়ে গেছে তাই না অভিক? চলো, নিচে চলো। আর ছাদে বসে থাকতে হবে না। তাছাড়া হিম ও পড়ছে। কার্তিক মাসের রাত। এসময় একটু সামলে চলা উচিত।
- কিচ্ছু দেরি হয় নি পৃথা। আর আমার জোর খিদেও পায় নি। তুমি একটু বসো। আমি রাতের খাবারটা গুছিয়ে নিয়ে আসছি। এখানেই আজকের ডিনারটা করবো। মাথার ওপর দেয়ার জন্য সেই বড়ো ডেকরেটিং এর ছাতাটাও নিয়ে আসছি।
- আর সাথে একটা ক্যান্ডেল....কেমন হবে তাহলে ব্যাপারটা?
- তাহলে তো পুরো ছাদটাই আমাদের হানিমুনের জন্য পারফেক্ট হয়ে যাবে। আজকের রাতটা কিন্তু ভীষণ স্পেশাল হতে চলেছে। তুমি জাস্ট পনেরো মিনিট ওয়েট করো পৃথা। আমি এখুনি সব কিছু এরেঞ্চ করে আনছি।
- আমি তাহলে এই ফাঁকে কিছু রোমান্টিক গান সিলেক্ট করে রাখি। ওই সময় শুনবো।
- দারুণ আইডিয়া।
0 মন্তব্যসমূহ