- কিরে, রাই বেশ তো ব্যালকনির একপাশে মোড়ায় বসে মেজাজ দিয়ে চা খাচ্ছিস? সব কাজ শেষ?
- হ্যাঁ, দিদিভাই। বিকেলের কাজটা মিটিয়েই একটু আমেজ দিয়ে চা খেতে বসলাম। তুমিও এসো না, এখানে বসো। আমি তোমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসছি ।
- নারে, আমার সময় হবে না। দেখ না, এক বালতি জমা ,কাপড় মেলতে এলাম। এখনো ঢের কাজ বাকি ।
- ধুর! রাখো তো তোমার কাজ। সেই ভোর পাঁচটা থেকে ঘুম থেকে উঠে সংসারের ঘানি তো টেনেই চলেছো। হাতে পায়ে বিরাম নেই। কাজের পর কাজ হয়েই চলেছে। একটু বিশ্রাম নাও। তুমি এখানে বসো। আমি জামা, কাপড় গুলো মেলে দিচ্ছি।
- আরে, ক্ষেপি তুই চা খাচ্ছিস তো। খেতে খেতে কেউ উঠে কাজ করে? চা জুড়িয়ে যাবে যে...
- সে যাক। দাঁড়াও কাপড় গুলো মেলে দিই। তারপর রান্নাঘর থেকে চা এনে দুজনে মিলে বসে খাবো।
- কেন খামোকা আবার আমার জন্য চা করতে যাবি বলতো? বেশ তো সময়টা উপভোগ করছিলিস। আমারই ভুল। তোকে না ডাকলেই ভালো হতো।
- না গো দিদিভাই। ডেকে ভালোই করেছো। একা একা চা খাওয়ার চেয়ে বরঞ্চ চা খাওয়ার একটা সঙ্গী পেলে মন্দ হয় না। তাছাড়া আমার তো ফ্ল্যাক্স এ চা করাই আছে। তোমার দেওরের জন্য করে রাখতে হয়। অফিস থেকে এসে কতবার যে খাবে তার হিসাব নেই। কাপড় গুলো সব মিলে দিলাম। তুমি একটু ওয়েট করো। আমি রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে আসছি।
- ঠিক আছে যা।
- দিদিভাই চা এর সাথে কীভাবে? বিস্কুট নাকি চিড়ে ভাজা?
- চায়ের সাথে আবার টা এরও ব্যবস্থা করেছিস দেখছি। তবে বিস্কুট আনিস না। মিষ্টি জাতীয় কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না এখন। চিড়ে ভাজাই আন।
- আচ্ছা। তোমার জন্য চিড়ে ভাজা, চানাচুর, ঝুড়িভাজা, বাদাম ভাজা সব মিক্সড করে স্পেশাল চাট করে আনলাম। দেখো গরম চা দিয়ে খেতে দারুণ লাগবে।
- আহ! চা গলায় পরতেই বেশ তৃপ্তি হচ্ছে রে। কতদিন এইভাবে বিকেল বেলায় শান্ত মনে চা খাই নি। একান্তে সুন্দর এই বিকেলটা উপভোগ করার সুযোগ পাই নি রে।
- তাহলে বলো ভালো লাগছে কিনা?
- ভালো তো লাগছেই। কিন্তু ওদিকে তো এখনো রাজ্যের কাজ পরে আছে সংসারের।
- ওহহ! দিদিভাই এই পনেরো মিনিট একদম সংসারের কথা ভুলে যাও। শশুর, শাশুড়ি, বর, সন্তান কারো কথা এখন ভাববে না। এই মুহূর্তটা একান্তই তোমার ব্যক্তিগত। এই সময়টা শুধু নিজের কথা ভাবো। নিজেকে নিয়ে ভাবো। নিজের ভালো লাগা গুলোকে বীজ বুনতে দাও। প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নাও। দিনের শেষ আলো টুকুর নির্যাস সারা গায়ে মেখে নাও। চেয়ে দেখো প্রকৃতি কি সুন্দর হলুদে আলোয় মেতে উঠেছে। দিন শেষে পাখিরা কি সুন্দর সারি দিয়ে বাসায় ফিরছে। আলতো বাতাসে কি সুন্দর সবুজ পাতাগুলো ঘাড় দুলিয়ে নাচছে। কি ভালো ভালো লাগছে না এইসব?
- সত্যিই দারুণ লাগছে রে। কতদিন এইভাবে নিজেকে উপলব্ধি করিনি। সারাদিন সংসারের চাহিদা মেটাতে মেটাতেই সময় বয়ে যায়। বরের অফিস, ছেলের পড়াশোনা, শাশুড়ি মায়ের ওষুধ, রান্না বান্না , ঘর দোর পরিষ্কার এই সবের ভিড়ে মাথার ওপর এত বড় প্রকৃতিটাকে প্রাণভরে চাক্ষুষ করার অবসর মেলে কই। আজ তোর দৌলতে একটা নিখাদ মিষ্টি বিকেলের সাক্ষী হলাম।
- দিদিভাই , তুমি তো দেখছি খালি উদাস হয়ে বকেই চলেছো তোমার জন্য এত সুন্দর চাট বানিয়ে আনলাম খাচ্ছো কই?
- এই তো রে খাচ্ছি। হ্যারে রাই তুই কি রোজই এইসময়ে এখানে আসিস?
- প্রতিদিন নিয়ম করে আসি। তৃপ্তি করে চা খাই। নিজেকে সময় দিই। সারাদিনের মাত্র এই মুহূর্তটার জন্য আমি সকাল থেকে অপক্ষা করে থাকি। চটপট কাজ সারি। যাতে একটু ফ্রি সময় বের করা যায়।
- জানিস বিয়ের আগে এই বিকেল বেলাটায় ছাদে বসে গান করতাম। ভোর বেলায় তো উঠতে পারতাম না রেওয়াজের জন্য। তাই বিকেলে ঠিক এইসময়টা বসতাম। বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিত। আমি ছাদে বসে গান করতাম। আর আমার মা ফুল গাছ গুলোতে জল দিতেন। কি সুন্দর রং - বে রং এর ফলে ছাদটা ভরে থাকত। আর তার ঠিক মাঝখানে আমি বসে গান করতাম। নিজেকে বেশ রূপকথার পরীর মতো অনুভূতি হতো।
- আমি শুনেছি তো তুমি খুব ভালো গান করতে। কিন্তু এখন আর করো না কেন? একটুও কি সময় বের করা যায় না নিজের ভালো লাগা টুকু জিইয়ে রাখার জন্য?
- না রে, মনে ইচ্ছে থাকলেও গৃহবধূদের অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। পরিবারের কল্যাণে , অন্যকে ভালো রাখার জন্য।
- ধুস! তুমি এখনো সেই পুরোনো যুগে পরে আছো। এখন আর গৃহবধূরা শুধু সংসার সংসার করে হাপিয়ে মরে না। তারা সংসারের কাজ সামলিয়েই নিজেদের ভালো লাগা গুলোকে নিয়ে কাজ করে। স্বপ্ন দেখে। সফলও হয়। বাড়ির বউরা এখন মডেলিং পর্যন্তও করছে। আর সাকসেসও হচ্ছে। আচ্ছা দিদিভাই , তোমার কি ইচ্ছে করে গানটা আবার নতুন করে শুরু করতে ?
- সে তো করেই। পড়াশোনায় কোনোদিনও খুব মেধাবী ছিলাম না। ওই গড়পড়তা পাশ দিতাম। কিন্তু গান আমার ছিল ধ্যান জ্ঞান। জানিস রাই, আমি যেখানেই গানের কম্পিটিশনে যেতাম প্রথম হতাম। আমার অনেক প্রাইজ আছে। স্কুলে বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমিই প্রতি বছর উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইতাম।
- দিদিভাই তোমার চোখে যে জল?
- ছাড়, ও কিছু না... একটু ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম আর কি... কথায় কথা বাড়ে। যা আর হওয়ার নয় তা নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করাও ঠিক না। এতে মানসিক অস্থিরতা বাড়ে, মন খারাপ হয়ে যায়।
- না দিদিভাই। তুমি ভুল ভাবছো। তুমি গানটা ছেড়ে দিয়ে একদম ঠিক কাজ করো নি। তোমার উচিত আবার গান টাকে নিয়ে চর্চা করা। তোমার শখটাকে তুমি এইভাবে নিজের হাতে শেষ করে দিতে চাও বলো? দেখো গানের প্রসঙ্গ উঠতে তোমার চোখে এখনো জল চিকচিক করছে।
- তুই কি পাগল হলি রাই? এই বয়সে আমি আবার গান বাজনা ...
- কেন নয়? কোনো কিছুই শেষ হয়ে যায় না। তুমি ভাবলে আজ থেকেই শুরু করতে পারো। দিদিভাই তুমি জানো না আজকাল হাউস ওয়াইফরা বাড়ি বসেই কত কিছু করছে। কেউ মেকাপ আর্টিস্ট হয়েছে, কেউ অনলাইনে টিউশন করাচ্ছে, কেউ গান শেখাচ্ছে, নাচ শেখাচ্ছে , অনলাইনে ঘরে বসেই জুয়েলারি বিক্রি করছে। কন্টেন্ট রাইটিং লিখছে। ইউটিউবে রান্না, রূপচর্চার ভিডিও দিয়ে স্বনির্ভর হচ্ছে। নিজেরা উপার্জন করছে। তারা সংসারের কাজ বজায় রেখেই এসব করে সাকসেসফুল হচ্ছে। সবসময় অন্যের জন্য নিজের প্রাণপাত করে দেওয়া ঠিক নয়। তোমার জীবন, তোমারও নিজের মত করে বাঁচার অধিকার আছে। তা বলে আমি সংসারকে অস্বীকার করতে বলছি না, পরিবারের সদস্য গুলোর ভালো মন্দ ভাবতে বারণ করছি না। এই সব কিছু সামলিয়ে নিজের জন্য একটু সময় বাঁচিয়ে নিজের শোখটাকে জিইয়ে রাখতে বলছি। দেখবে দিন শেষে তুমি খুব ভালো থাকবে। সারাদিন কাজের মাঝে একটা খিটখিটে ভাব আসে দেখবে সেটা আর থাকবে না।
- তুই ঠিকই বলেছিস রে রাই। তোর কথা গুলো শুনে আমার নিজেকে নতুন করে আবার গড়ে তুলতে সাধ জাগছে। তুই সত্যিই বলছিস এই বয়সে এসেও এসব সম্ভব? আবার নতুন করে রেওয়াজ করা শুরু করব?
- একদম সম্ভব। তোমার তো সবে চল্লিশ বছর বয়স। এই বয়সে মানুষ কত কিছু নতুন করে শিখছে, জানছে । আর তুমি তো গান জানো। একটু চর্চা করলেই দেখবে তুমি ঠিক সেই আগের মতোই ওতো সুন্দর গাইতে পারবে।
- তুই কিছু করার কথা ভাবছিস না? তুই ও তো কিছু করতে পারিস?
- আমি আবার কি করবো? আমি তো সবেতেই অকর্মার ঢেঁকি। আমার দ্বারা কিচ্ছু হবে না। আমি খাই দাই সংসারের কাজ করি। ভিডিও দেখি। সোস্যাল মিডিয়া স্ক্রল করি। এইসবই পরি। তোমার মত আমার ওতো গুণ নেই।
- ও ! আমায় আকাশ কুসুম হাজার স্বপ্ন দেখিয়ে নিজে কিছু না করার ধান্দা তাই না?
- সত্যি বলছি দিদিভাই তোমার মত আমার কোনো স্কিল এ দক্ষতা নেই। তবে...
- তবে কি বল?
- ওহ! ছাড়ো বাদ দাও।
- বাদ দেব কেন? কি লুকোচ্ছিস আমার থেকে বল তো? আমি তো সব কিছু তোর কাছে শেয়ার করলাম। তুই কেনো পারবি না? আমি তো তোর সম্পর্কে জা। বড় দিদির মতো। আমায় বলা যাবে না?
- আসলে তা নয় দিদিভাই। আমার বলতে খুব লজ্জা করছে।
- ধুর! আমার কাছে আবার লজ্জা কিসের? মন খুলে বল।
- জানো তো দিদিভাই আমি লিখতে খুব ভালোবাসি। ছোটো ছোটো গল্প, কবিতা , কথপোকথন লিখি। ভাবছি এবার এটাকে নিয়েই একটু সিরিয়াস হবো।
- ওমা! এতো খুব ভালো গুণ তোর। তুই যে এত ভালো লিখিস আমায় কোনোদিন বলিস নি কেন?
- লজ্জায়। কাউকে কোনোদিন বলিই নি আমার এই শখের কথা। আমি রোজ বিকেলে পনেরো মিনিট মতো এখানে বসে চা খাই আর মনে মনে নিত্য নতুন গল্প বুনি। আর অবসরে সময় সুযোগ বুঝে লিখে রাখি।
- খুব গুনী মেয়ে তুই। আয় তোর কপালে একটা চুমু খাই। আমি বলছি তুই লেখালিখির চর্চাটা চালিয়ে যা। ছাড়বি না। তুই মিলিয়ে নিস তুই ঠিক একদিন বড় লেখিকা হবি।
- কি যে বলো না তুমি? আমি ওতো কিছু ভাবিই নি শুধু মনের ইচ্ছায় লিখি।
- জানিস, স্বপ্ন যখন দেখতে হয় অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে হয়। তাহলে কাজ করার তাগিদটা আরও বেড়ে যায়। তাই বলছি দেখবি তুই একদিন সফল হবিই । আর হ্যাঁ, তোর লেখা গুলো আমায় মাঝে মাঝে পড়ে শোনাবি কিন্তু।
- তুমিও দিদিভাই দেখবে একদিন তোমার একটা সুন্দর গানের স্কুল হবে। অনেক ছোটো ছোটো বাচ্চারা তোমার কাছে গান শিখতে আসবে। তোমার অনেক সুনাম হবে।
- চল তাহলে, আজ থেকেই নতুন উদ্যমে লেগে পরি নিজেদের স্বপ্ন গুলোকে পূরণ করতে। আমরা সারাদিনে সংসারের মাঝে কিছুক্ষণ সময় নিজেদের জন্য বের করে নেব। এর জন্য দরকার আমাদের স্মার্ট ওয়ার্ক। এত দিন হার্ড ওয়ার্ক অনেক করেছি। এবার স্মার্ট ওয়ার্ক করতে হবে। অন্যেরা পারলে আমারও শত কাজের মাঝে ঠিক সময় বের করতে পারবো নিজেদের জন্য।
- ঠিক বলেছো দিদিভাই। মনের ঠিক এই জোর টাই আমাদের দরকার। আর হ্যা, প্রতিদিন বিকেলে এই পনেরো মিনিট কিন্তু আমরা প্রকৃতির মাঝে নিজেদের রিলাক্স করার জন্য সময় দেব। কারণ নিজেদের শত কাজের মাঝেও একটু বিশ্রামের খুব প্রয়োজন।
- একদম। আজ তাহলে উঠি রে। আবার আগামী কাল এইসময়ে চায়ের আড্ডা জমে যাবে। কি বলিস?
- হ্যাঁ , সে আর বলতে? শুধু সময়ের অপেক্ষা।
সমাপ্ত

0 মন্তব্যসমূহ