- অবশেষে দম ফেলার সময় পেলি তাহলে বল? আমি তো ভাবলাম ছেলেটা সারাটা রাতই হয়তো তোর ওই পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিন টার দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দেবে।
- ওসব তুমি বুঝবে না শোফাদাদু। আধুনিক প্রজন্মের কাছে আমি এখন ভীষণ মূল্যবান। আমায় ছাড়া এদের একদণ্ডও চলবে না। ঘুম থেকে চোখ খুললেই আধো ঘুমে সর্বপ্রথম আমায় খুঁজবে। আবার রাতে ঘুমোতে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত অবধি আমাকে ওদের প্রয়োজন।
- সে তো দেখতেই পারছি স্ক্রিন বাবু। কি যুগটাই না এলো। বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই এখন তোমায় মুঠো বন্দি করে নিয়ে সর্বক্ষণ আগলে আছে। চোখ সবসময় তোমার স্ক্রিন স্ক্রল করতে ব্যস্ত। এ বাড়ির একরত্তি ছোটো খোকাও তো তোমার স্ক্রিনে ফুটে ওঠা রঙিন আলোর ঝলকানি আর ভিডিও ছাড়া খাবার খেতে চায় না।
- ও তুমি বুঝবে না সোফা দাদু। পৃথিবীর নানা প্রান্তের খবরাখবর, বিনোদন, ছবি সব ক্লিকেই মানুষ আমার থেকে পেয়ে যায়। জীবন এখন আর আগের মতো একটা ছোট্ট ঘরের মধ্যে আটকে নেই। এক ক্লিকেই এখন মানুষ মনের মতো সমস্ত কিছু দেখতে পাচ্ছে,জানতে পারছে, শিখতে পারছে, এসব আমারই কল্যাণে। তোমার তো বয়স হয়ে গেছে। ডাইনিংয়ের এক কোণায় চুপচাপ সারাদিন মুখ গুমরে শুয়ে আছো।
- আমার মন খারাপের গভীরতা তুমি বুঝবে না স্ক্রিন বাবু। এ বাড়িতে আমি বহু পুরোনো একজন সদস্য। পরিবারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ যে মানুষটা আছেন তার দয়াতেই একদিন এ বাড়ি আলো করে আমি এসেছিলাম। তুমি আসার আগে এ বাড়ির পরিবেশটা ছিল একদম অন্যরকম। প্রতিদিন বিকেল বেলায় পরিবারের সকল সদস্য এখানে জড়ো হতো। আমার কোলে গা এলিয়ে চায়ের টুং টাং শব্দ তুলে গল্প , গুজবে মেতে উঠত ঘরটা। আর ছিল অনাবিল অকৃত্রিম হাসির ধবনি। কিন্তু এখন এ দৃশ্য দেখাই যায় না।
- ওহহ! সোফা দাদু তুমি বড্ড বেশি আবেগী হয়ে পরেছো। তুমি চার - পাঁচজন মানুষকে যুক্ত করে একটি খুশির আমেজের কথা বর্ণনা করছো। কিন্তু দেখো আমি দেশ, বিদেশের সব মানুষ গুলোর সাথে তাদের কেমন নিমিষের মধ্যেই জুড়িয়ে দিচ্ছি। ঘরে বসেই একটা লাইক, কমেন্টের মাধ্যমেই তারা কেমন একে অপরের সাথে ভাব বিনিময় করে নিচ্ছে। আধুনিকতাকে একটু আপন করতে শেখো।
- স্ক্রিনবাবু , কথাটা তুমি যতটা সহজে বললে আসলে ব্যাপারটা কি অতটাই সোজা? আমি আধুনিক নাই হতে পারি। আমারও তো বয়স হয়েছে। কিছুটা হলেও অভিজ্ঞতা আছে। তুমি ভাবছো ডিজিটাল বাঁধনে একজনকে অপরজনের সাথে বাঁধছ আসলেই কি তাই? তুমি তাদের সামনাসামনি অনুভূতির সংবাদ কত টুকু রাখতে পারো? তাদের মনের গভীরতা কতটা বুঝতে পারো? এই তো সেই দিন আমাদের এই পরিবারের অসিত বাবু অফিস থেকে এলেন কতটা ঘর্মাক্ত হয়ে, এক রাশ ক্লান্তি নিয়ে। এসেই আমার বুকের ওপর ঢিপ করে বসে পড়লেন। পাশে বসে থাকা আমাদের চিন্টু, মানে অসিত বাবুরই ছেলে তোমার ওই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মাথা হেঁট করে এক দৃষ্টিতে মন, প্রাণ দিয়ে কাকে যেন ম্যাসেজ করতেই ব্যস্ত। পাশে থাকা মানুষটিকে একটু জল দেওয়ার ও তার সময় নেই। আসলে টের টুকুও পায় নি পাশে তার বাবা ক্লান্ত হয়ে বসে আছেন।
- কিন্তু মানুষ তো এখন তার খুশির মুহূর্ত গুলো, ঘুরতে যাওয়ার ছবি, স্পেশাল দিনের অনুভূতিগুলো, নতুন জামা - কাপড়ের শো আপ সব তো আমার মাধ্যমে শেয়ার করেই কত কত প্রশংসা কুরোয়। আনন্দ পায়। দুঃখের দিনের ঘটনা গুলো ও ছড়িয়ে দেয় চেনা পরিচিতি দের মধ্যে
- তা তো ঠিকই। মানুষ আগেকার দিনে ঘুরতে যেত প্রকৃতির মাঝে নিজেকে একটু আনন্দ দেয়ার উদ্দেশ্যে। একঘেয়ে জীবন থেকে একটু অন্যরকম হাওয়ার স্বাদ পেতে পারি দিত দিন কয়েকের জন্য। প্রকৃতির মনোরম দৃশ্যগুলো দু চোখ ভোরে দেখতো। আর এখন মানুষ নিজের চোখকে সার্থক করার পরিবর্তে ফেসবুক, সোস্যাল মিডিয়ায় দেয় অন্যের কাছ থেকে কয়েকটা সস্তার লাইক, কমেন্ট এর উদ্দেশ্যে। মানুষ আগে নিজের চোখে প্রকৃতি দেখতো, এখন মানুষ মনোরম দৃশ্য দেখলে সঙ্গে সঙ্গে তোমার লেন্সটা অন করে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পরে।
- মানুষের এইসব আচরণের দায় পুরোটাই কি আমার সোফা দাদু? মানুষ তো এখন কাজের চাপ, ব্যস্ততা, একাকিত্ব থেকে বাঁচতে আমার আশ্রয় নিচ্ছে। এখানে কিছুক্ষণ সময় কাটালে ওদের মন আবার সতেজ হয়ে ওঠে। পুনরায় কাজে মন লাগে।
- আগেকার মানুষের মনেও অবসাদ ছিল, ক্লান্তি ছিল। কাজের ব্যস্ততা ছিল। তারা অবসরে আমার মতো বসার স্থানে বসে একান্তে বই এর পাতায় ডুব দিত। সাহিত্যের পাতায় পাতায় চোখ বুলিয়েই মন প্রাণ তাদের সতেজ হয়ে যেত। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, কিংবা ঘরোয়া আড্ডা এসবের মধ্যে একটা নির্ভেজাল সুখ , আনন্দ খুঁজে পেত ।আজকাল আর এই দৃশ্যটা খুবই কম দেখা যায়। বিশেষ করে বাড়ির সেই অনাবিল আনন্দটা হারিয়ে গেছে। এখন সবাই তোমার সাথেই সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই বাড়ির মানুষগুলো আগের সেই নির্ভেজাল বিকেল গুলোর স্মৃতি হয়তো ভুলে গেছে। কিন্তু আমি তো একটা জড় বস্তু। দিনের পর দিন এই যে পরিবর্তন চোখের সামনে দেখছি , এসবের নীরব দর্শক আমি। আমার কোলে বসে তাদের সেই হই হুল্লোড়ের দিনগুলো গুলো আমি খুব মিস করি।
- সত্যি শোফা দাদু তোমার কথা গুলো শুনে বেশ নস্টালজিক হয়ে পড়লাম। কিন্তু তুমি জানো , এমনও অনেক মানুষ আছে যারা প্রচণ্ড ডিপ্রেশনে, কিংবা মানসিক অশান্তির তাড়নায় রাতের পর না ঘুমিয়ে গোপনে চোখের জল ফেলে আমি তাদের একাকিত্বের সঙ্গী হই। তাদের মোটিভেশনে মুখ্য ভূমিকা পালন করি।
- কিন্তু সত্যিই কি তাদের ওই কয়েকটা ভিডিও, অডিওর মাধ্যমে মানসিক শান্তি ফিরে আসে? হয়তো তাৎক্ষণিক তারা চোখের জল মুছে স্ক্রিনের পাতায় চোখ রেখে নিজেদের কষ্ট গুলো ভোলার চেষ্টা করে। কিন্তু এমন একটা সময় ছিল তখন আমার কোলে দুটি মানুষ পাশাপশি বসে একে অপরের সমস্যা গুলো শুনতো, অপর জনের কাঁধে ভরসার হাতখানি রাখতো। যার স্পর্শে সত্যিই এক অমোঘ শান্তি পেত। যেন মনে হতো এক ঝটকায় অনেকটা মানসিক চাপ যেন উধাও হয়ে গেল। মানুষ তখন মানুষকে বিপদে আপদে সশরীরে পাশে পেত।
- তুমি ঠিকই বলেছ সোফা দাদু যখন দেখি একই পরিবারের চারজন মানুষ পাশাপশি বসে আছে। কিন্তু চারজনই স্ক্রিন স্ক্রল করতে ব্যস্ত তখন সত্যিই ভীষণ খারাপ লাগে। আমি কিন্তু মানুষের এই ধরনের পরিবর্তন চায় নি। আমি চেয়েছিলাম গোটা পৃথিবীটাকে মানুষের জনকল্যাণে তাদের সামনে উন্মুক্ত করতে। এইভাবে পারস্পরিক দূরত্ব কখনোই আমি চাই নি। তুমি বিশ্বাস করো সোফা দাদু।
- স্ক্রিন বাবু অত নিজেকে অপরাধী ভেবে মন খারাপ করবে না। দোষটা আসলে তোমার নয়। প্রযুক্তি হিসাবে তুমি মানুষের কাছে সেরা। কিন্তু মানুষ তোমার সঠিক ব্যবহার করছে না। তুমি তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ওরা তোমায় তাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলছে। তারা বুঝতে পরছে না আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা গুলো মানুষকে আরো উন্নত করতে পারে, স্কিল শেখাতে পারে, আপডেট করতে পারে কিন্তু মানসিক উষ্ণতা, অনুভূতি ও ভালোবাসা দিতে পারে না।
- তাহলে এখন উপায় ? এ ব্যাপারে তোমার কি মত শুনি? মানুষ এই সর্বনাশের জাল থেকে নিজেকে কি ভাবে মুক্ত করবে? মানুষ কি আবার আগের মতো পাশাপাশি বসে সময় কাটাবে না? আগের মতো প্রাণ খোলা হাসি, গল্প, আড্ডায় মেতে উঠবে না?
- উত্তরটা খুব সোজা স্ক্রিন বাবু। যেদিন মানুষ মন থেকে বুঝতে পারবে ডিজিটাল দুনিয়া শুধু তাৎক্ষণিক মানুষকে স্বস্তি দেয়, কিন্তু অভাব, অনুযোগ, ভরসা , ভালোবাসার জন্য সত্যিই একজন রক্ত মাংসের মানুষের সান্নিধ্য বিশেষ প্রয়োজন জীবনে। সেইদিনই এর মর্ম উপলব্ধি করতে পারবে। প্রযুক্তিকে মানুষ যখন সত্যিই প্রয়োজনে কেবল ব্যবহার করবে সেইদিনই মানুষ প্রযুক্তি ও পাশে থাকার মানুষটার ভরসার মধ্যে কতটা পার্থক্য তা বুঝতে পারবে।
সমাপ্ত

0 মন্তব্যসমূহ