সংসারে কাজের মাঝেও ঘরোয়া রূপচর্চা ও দুই জায়ের কথপোকথন

 

সংসারে-কাজে-মাঝেও-ঘরোয়া-রূপচর্চা-ও-দুই-জায়ের-কথপোকথন



 - ও দিদিভাই তুমি প্লিজ আমায় হেল্প করো। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না।


- আরে এত কান্নাকাটি করে ধরফর করে কি সব বলছিস? কি হেল্প করব? আমি তো সবসময়ই তোর পাশে আছি। কি হয়েছে বল? এত উতলা হয়ে পড়েছিস কেন? 


- সামনেই তো পুজো । আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা দিন বাকি।


-  হ্যাঁ তো কি হয়েছে? তোর আমার সবারই তো শপিং অলমোস্ট কমপ্লিট। কেন তোর কি কিছু বাদ পড়ে গেছে? তাহলে সামনের রবিবার কিনে নিলেই হয়। আমি তো ফ্রিই আছি।  অফিস রবিবার তো অফিস ছুটি।  


- কেনাকাটার কথা আমি বলছি না।


-  তাহলে কি হয়েছে খোলসা করে না বললে  কি করে বুঝব ? তোর মতো জা পেয়ে আমার কপালটা একদম ধন্য হয়ে গেছে।  বুঝলি তো ? নামেই তোর বিয়ে হয়ে গেছে।  ৩৫ বছর বয়স হয়ে গেছে।  স্বভাবে তুই এখনো তোর ছয় বছরের মেয়ের থেকেও কচি খুকি।


-  সে তুমি আমায় যা খুশি বলো।  আগে আমায় কথা দাও  আমায় হেল্প করবে কিনা? 


-  শোন তুই আগে এখানে চুপ করে বোস।  মাথাটা ঠান্ডা কর।  তারপর বলবি। আমি জানি তুই যখনই হাউমাউ করে কিছু বলতে আসিস  সেটা এমন কিছুই কঠিন প্রবলেম থাকে না । তোর সাথে তো আমি বছর আটেক ঘর করছি তোর নাড়ি নক্ষত্র এত দিনে আমি খুব ভালোভাবে বুঝে গেছি।


-  দিদিভাই তুমি আমায় নিয়ে খিল্লি করছো তো? 


- আরে বোকা মেয়ে।  তুই আমার সম্পর্কে জা হলে কি হবে তোকে আমি আমার বোনের মত স্নেহ করি, ভালোবাসি।  আর আমি এত জানি তুইও আমায় দিদি ভাই বলতে অজ্ঞান । কোন কিছু ভালো খবর থাকলেও আগে দিদিভাই দিদিভাই বলে বাড়ি মাথায় করে আমাকে বলতে আসিস । আবার কোনো দুঃখের কিছু হলেও আমাকে সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার করিস। 


- তুমি ঠিক বলেছ দিদিভাই । আমি বিয়ের পর যেদিন এ বাড়িতে প্রথম পা রাখি সেদিন থেকেই আমি তোমার থেকে অনেক স্নেহ, ভালোবাসা পেয়েছি। জানো তো বিয়ের আগে লোকে বলা কওয়া করত শাশুড়ি জা নিয়ে ঘর সংসার করা অনেক কঠিন । জায়েরা ভালো হয় না।  যে বাড়িতে দু তিনটে ছেলে আছে সেই বাড়িতে বিয়ে না করাই ভালো। কারণ জায়ে - জায়ে নাকি কখনো মিল হয় না। মনোমালিন্য হয়। ঝগড়া অশান্তি হয় ।মতের অমিল হয় । শাশুড়িরা এক বউকে ভালোবাসে।  অন্য বউকে চোখের বালি করে রাখে। আরো কত কিছু। মনে মনে ভয় পেতাম । কিন্তু আমি অরিজিৎকে সত্যিই ভালবাসতাম। সমাজের ওইসব কথাগুলো শুনেও আমি এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারি নি। যখন প্রথম প্রথম প্রেম করতাম আমায় অনেক বান্ধবীরাও বলেছে অরিজিৎ রা দুই ভাই। তার ওপর অরিজিৎ ছোটো। ওর দাদার বৌ চাকরি করে। তাদের দেখবি জায়ে জায়ে মিল হবে না।  কিন্তু দেখো,  আমার ক্ষেত্রে  সম্পূর্ণটা উল্টো। আমিতো মনে করি আমার আর অরিজিৎ এর বিয়েটা হতেই না যদি না তুমি দু বাড়ির মানুষ গুলোকে এত সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে  ম্যানেজ করতে।  সত্যিই দিদিভাই তুমি কত গুনী, বুদ্ধিমতী । আর রূপে লক্ষীও বটে।  তোমার এক অংশও যদি আমি পেতাম  সত্যি আমার জীবন ধন্য হয়ে যেত। 


- তোকে এখানে চুপ করে বসে আগে মাথাটা ঠান্ডা করতে বললাম আর তুই কন্টিনিউ বকবক করে চলেছিস। বাবা!  আমার জন্য তোর কাছে এত ভালো ভালো সার্টিফিকেট তোলা ছিল আমি জানতামই না।  ভাগ্যিস তোর মাথাটা একটু ঠান্ডা হলো তাই নিজের সম্পর্কে এত মিষ্টি মিষ্টি কমপ্লিমেন্ট শুনতে পেলাম। 


- এবার বল তোর প্রবলেমটা কি? কি হয়েছে?


-  বলব ? তুমি আবার শুনে মাথায় গাট্টা মারবে না তো? 


-  না বল। নিঃসংকোচে বল দেখি তোর কি এমন গুরুতর সমস্যা হয়েছে । আর আমি দেখি এই প্রবলেম থেকে তোকে বের করতে পারি কিনা? 


-  আসলে দিদিভাই তুমি তো ভালো করেই জানো আমার স্কিন ভীষণ ড্রাই।  আর দুর্গা পুজো আসতে হাতে গোনা মাত্র এক সপ্তাহ বাকি।  আমার মুখটা দেখো স্কিনে  কোনো উজ্জ্বলতা নেই । আমি কি করবো? প্লিজ হেল্প। 


-  বাবা!  এটাই তোর প্রবলেম ? যার জন্য তুই হাউমাউ করে কেঁদে কেটে বাড়ি  মাথায় করে ফেলেছিলিস? 


-  মনটা আমার ভীষণ খারাপ গো দিদিভাই।  তোমার মুখে কি সুন্দর একটা উজ্জ্বলতা আছে । আমার মুখটার দিকে তাকিয়ে দেখো আমায় পঞ্চাশ বছরের একটা বুড়ি লাগছে।


-  এটা কার দোষ? তোর  নিজের দোষেই এইরকম হয়েছে।  তোকে বাড়ির সবাই বলে বলে পাগল বেশি করে জল খা।  তুই তো কারো  কথাই শুনবি না।  সারাটা দিন সংসারের কাজ করতেই ব্যস্ত । নিজের একটুও যত্ন নিস না। তোকে বারবার বলি শুধু বাড়ি, ঘর  পরিষ্কার রাখলেই হয় না।  নিজেকেও পরিষ্কার , পরিচ্ছন্ন টিপটপ করে গুছিয়ে রাখতে হয়।  নিজেকেও একটু ভালবাসতে হয়।  তোর ড্রাই স্কিন।  ভেতর থেকে হাইড্রেটেড  না রাখলে বাইরে থেকে যতই ক্রিম ফেসিয়াল করিস না কেন কখনই গ্লো দেবে না।  আর এটা ধ্রুব সত্যি। 


- জল তো খাচ্ছি দিদিভাই।  আর কত খাব ?


- ফালতু মিথ্যা কথা বলিস না । তুই খাবারও ঠিকমতো খাস না টাইমে,  আর জলও নয়। আমি সারাদিন অফিসে ব্যস্ত থাকি বলে কি ভাবিস  কিছুই খবর পাই না?  যাই হোক তুই রূপচর্চার ঘরোয়া উপায় গুলো করিস না কি ওগুলো ও করিস না? 


- আসলে এই কদিন বাড়ি- ঘর দোর ধোয়া মোছা বেশিই করেছি তাই সময় পাইনি। সামনেই তো পুজো বলো। সব কিছু তো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। 


- তা বলে নিজের খেয়াল না রেখে রাত দিন গাধার মতো খেটে যেতে হবে? আরে, মালতী মাসিকে বললেই এক্সট্রা কাজ করে দিত। তুই না বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করিস। ইচ্ছে করছে তোর মাথায় একটা গাট্টা মেরে মাথা ফুলিয়ে দিই। 


- সেই জন্যেই তো তোমায় আগেই বলেছিলাম গাট্টা মারবে না তো?


-  সে আমি জানি  এই দিক থেকে তুমি খুবই ওস্তাদ। তোকে কতবার বললাম তোর এত ব্রাইট ফিউচার কোনো চাকরি বাকরি কর।  কিংবা কোন বিজনেস করতে পারিস।  এখন বাড়ি বসেও কত অনলাইন বিজনেসের সুযোগ হয়েছে।  কিন্তু তুই এত সংসার করতে ভালোবাসিস যে এই সংসার  প্রফেশনটা কেই বেছে নিলি।  সে যাই হোক যার যেটা চয়েজ , ব্যক্তিগত ব্যাপার।  কিন্তু সংসারে কাজের মাঝেও নিজের যত্ন নিতে হবে তো?  আমায় দেখ,  আমি তো একটা চাকরি করি। সারা দিনে কাজের পর বাড়ি ফিরে মিনিমাম স্কিন কেয়ারটুকু করি।  কিন্তু হ্যাঁ , বাজার চলতি স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট এর  চেয়ে আমার হোমমেড রেমেডি গুলোই বেশি ভালো লাগে। আর ভালো রেজাল্টও পাই। তুই তো জানিসই তোর মত আমারও  ড্রাই স্কিন। 


- সেই জন্যই তো বলছি দিদিভাই একটা কিছু হোম রেমেডি সাজেস্ট করো। বলতে পারি কিন্তু ভাবিস না এই হোমমেড ফেসিয়াল করলেই  স্কিন ফর্সা হয়ে যাবে।  এটা করলে স্কিন হাইড্রেটেড হবে।  স্কিনের রুক্ষ, শুষ্ক, ভাবটা চলে যাবে গ্যারান্টি।  স্কিন টা নরম হয়ে  স্ক্রিনে সত্যিই একটা উজ্জ্বলতা দেখা দেবে।  ফেসিয়ালটা একবার করলেই বুঝতে পারবি। একটা কথা মনে রাখবি ফেসিয়াল করলে কখনো ফর্সা হওয়া যায় না।  ফেসিয়াল করলে কিংবা,  ফেসপ্যাক ব্যবহার করলে এবং  নিয়মিত স্কিন কেয়ার করলে স্কিনে একটা উজ্জ্বলতা আসে। স্কিনে  থাকা ট্যান চলে যায়।  নিজের জন্মগত গায়ের রংটা ফিরে আসে।  তার ফলে মনে হয় ফর্সা হয়ে গেলাম বুঝি।


-  আচ্ছা ঠিক আছে এবার থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে স্কিন কেয়ার করব। প্রমিস।  এবার বলো পুরো ফেসিয়ালটা স্টেপ বাই স্টেপ। 


- আমিও তো করব ফেসিয়ালটা তোকেও করে দেব। 


-ওহ! তাহলে তো আমি সোনায় সোহাগা।  আমি শুধু আরাম করে চোখ বুজে থাকবো।  তুমি আমায় ফেসিয়ালটা করে দেবে।


- হ্যাঁ রে পাগলী,  করে দেবো ।


- দিদিভাই তুমি আগে বলো ফেসিয়ালটার স্টেপ বাই স্টেপ পদ্ধতিটা।  আমি আগে শুনে নিই যাতে পরেও করতে পারি।


-  আচ্ছা, তবে শোন ফেসিয়ালের প্রথম স্টেপ তো ক্লিনজার ।  তাই সবচেয়ে প্রথম আমাদের স্কিন টা ভালোভাবে ক্লিন করে নিতে হবে।  ক্লিনাজার এর জন্য এক চামচ ওটস এর গুড়োর সাথে ২ চামচ কাঁচা দুধ মিশিয়ে একটা পেস্ট তৈরি করে নিতে হবে।  তারপর এটি মুখে লাগিয়ে এক মিনিট আলতো হাতে ঘষতে হবে । এবং পরবর্তী এক মিনিট এইভাবেই মুখে রেখে দিতে হবে। তারপর জল দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। যেহেতু আমাদের স্কিন ড্রাই তাই ক্লিনজার হিসেবে ওটস দুধের মিশ্রণ টাই বেস্ট হবে। 


- এতে মুখে ধুলো, ময়লা সব পরিষ্কার হয়ে যাবে?


-  একদম ওটস আর দুধ স্কিনের ময়লা , লমকূপে জমে থাকা ধুলোবালি ভিতর থেকে পরিষ্কার করে দেয় আর ওটসে থাকা উপাদান এবং দুধে ল্যাকটিক অ্যাসিড স্কিনে  থাকা ট্যান রিমুভ করতে সাহায্য করে । সেই জন্য অনুজ্জ্বল ত্বকে এটি  একবার ব্যবহার করার ফলেই প্রাণ ফিরে পায় । ত্বক সতেজ হয়ে ওঠে। 


- বাহ!  দারুন তো।  আমি তো বেশ এক্সাইটেড হয়ে যাচ্ছি।  এটি ব্যবহার করার জন্য।


-  এরপর আসবে স্ক্রাবিং।  একটা বাটিতে এক চামচ মুসুর ডালের গুঁড়ো ও দু চামচ কাঁচা দুধ নেব তার সাথে দেবো দু থেকে তিন ফোটা নারকেল তেল । সবগুলি উপাদান দিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করতে হবে।  এটি খুব ভালোভাবে স্ক্রাবিংয়ের কাজ করবে । কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে স্ক্রাবিং এর সময় এক মিনিটের বেশি ব্যয় করা উচিত নয়। নাহলে ড্রাই স্কিনে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।


-  তাহলে এই স্টেপটা খুব আলতো হাতে করতে হবে তাইতো ? 


- একদমই তাই । এটি  করা হয়ে গেলে ভালোভাবে মুখটা আবার জল দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।  ধুয়ে নেবার পর মুখটা অনেকটা ক্লিন লাগবে । এই স্টেপটা থেকেই পরিবর্তনটা লক্ষ্য করতে পারবি।  দেখবি মুখের ট্যান অনেকটাই চলে গিয়েছে। 


- আমি বৃথাই এতক্ষণ নিজের স্কিন নিয়ে টেনশন করছিলাম। তুমিই তো আমার মুশকিলের আসান। 


- আচ্ছা ঠিক আছে। আর আমার যশ করতে হবে না। ফেসিয়ালের পরবর্তী স্টেপ টা ভালো করে শোন। এটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। 


- বলো। শুনছি ।


- এরপরের স্টেপ হলো। ফেস মাসাজ । এই  মাসাজটা করার জন্য একটা বাটিতে দুই চামচ টকদই নেব। সাথে দু ফোঁটা নারকেল তেল ও এক চামচ আলোভেরা জেল দিয়ে মিক্স করে একটা পেস্ট তৈরি করে নিতে হবে। এভাবেই তৈরি হয়ে যাবে মাসাজ প্যাকটি। এবার এই মিশ্রণটা দিয়ে  দশ মিনিট মতো আলতো হাতে সার্কুলার মশনে মুখে ম্যাসাজ করতে করতে হবে। এই স্টেপ টা যত ভালো হবে ততই আমাদের মুখের ব্লাড সার্কুলেশন বাড়বে ও স্কিন গ্লো করবে। এটি হয়ে যাওয়ার পর ভালো করে মুখটা আবার ধুয়ে নিতে হবে ।


- তার পর আর একটাই স্টেপ তাই তো?


- হ্যা রে। এরপর একটা বাটিতে এক চামচ বেসন, দুই চামচ দুধ, এক চিমটি হলুদ গুঁড়ো, হাফ চামচ মধু মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করে মুখে প্যাকটি মেখে হাফ শুকনো অবস্থা থাকাকালীন ধুয়ে ফেলব। জল দিয়েই। তারপরেই দেখবি স্কিনে একটা ম্যাজিকাল গ্লো চলে এসেছে।


- দিদিভাই, তাহলে শুরু করে দাও। আমি সেই ম্যাজিকাল স্কিনটা দেখার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছি না।


- ঠিক আছে। আমি সব উপকরণ রেডি করছি। তুই ও একটু হেল্প করবি ।


- হ্যাঁ চলো।


সমাপ্ত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ