- মা, আজকে ডিনারে কি হয়েছে?
- কি আবার হবে! রোজকার যা হয় রুটি, তরকারি , ছানা।
- ধুর! রোজ রোজ এই এক ঘেয়ে খাবার খেতে কার ভালো লাগে বলো তো? একটু ডিফারেন্ট কিছুও তো করতে পারো?
- তা তো করিও মাঝেসাঝে। এই তো গত মঙ্গলবার চিকেন চাউমিন করে দিলাম। ভুলে গেলি?
- উফফ! সে তো অনেকদিন হয়ে গেলো মা। তার স্বাদ এতদিনে ভুলে গেছি।
- প্রতিদিন ওইসব তেল, মশলার জিনিস খাওয়া ভালো নয় মানা। ভাত, মুড়ি, রুটি খেতে হয়।
- তোমায় যখনই বলি তুমি তখনই এইসব কথা বলে আমায় দমিয়ে রাখো। আমার আজ একটু মোমো খেতে ইচ্ছে হচ্ছে । করে দিতে হবে তোমায়।
- এখন রাত দশটা বাজে। এখন আমি তোর জন্য মোমো বানাবো? তুই পাগল নাকি? আজকে রুটি তরকারি খেয়ে নে। কালকে করে দেবো।
- কিন্তু আমার আজকেই ভীষণ খেতে ইচ্ছে করছে। ও মা, মা গো প্লিজ করে দাও না?
- ধুর! তুই এত বিরক্ত করিস আমায়। আগে বল তোর পড়া হয়েছে? স্কুলের হোমওয়ার্ক গুলো করেছিস?
- হ্যাঁ সব হয়ে গেছে। মা, আমার খুব খিদে পেয়ে গেছে। আমায় এখন পড়াশোনা নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করো না। আমার ভালো লাগছে না।
- কে তোকে খেতে বারণ করছে? রুটি, তরকারি তো হয়েই গেছে। খেয়ে নে।
- সেই আবার সেই একঘেয়ে খাবার রুটি , তরকারি। আমার শুনলেই খাবার রুচি চলে যায়।
- ছি ! ছি! তোকে না কতবার বলেছি খাবার নিয়ে ওরকম কথা বলতে নেই। আমাদের দেশে এখনো কত গরিব অসহায় মানুষ আছে জানিস? যাদের কাছে প্রতিদিন এই রুটি, তরকারি টাও বিলাসিতা। খাবার হলো মা লক্ষ্মী। কোনোদিন খাবারকে অবজ্ঞা করবি না বুঝেছিস?
- আমি ওই ভাবে কথাটা বলতে চাই নি। তুমি ভুল বুঝছো আমায়। প্লিজ মা, কোনোভাবেই কি আজকে মোমোটা বানানো যায় না? ভীষণ খেতে ইচ্ছে করছে। নাহলে বাবাকে বলছি কিনে এনে দিতে?
- না, একদম নয়। মানুষটা সারাদিন পর খেটেখুটে, ট্রেনে, বাসের ভিড় ঠেলে বাড়ি ফিরেছে। ফ্রেশ হয়ে একটু টিভি দেখতে বসেছে। একদম বিরক্ত করবি না।
- তাহলে? একটা আইডিয়া আমি পেয়েছি। বলব?
- কি?
- তুমি রাগ করবে না তো?
- রাগ না করার মতো কথা হলে রাগবো না। রাগ করার মতো কথা হলে রাগবো। কি বলবি তাড়াতাড়ি বল। আমার দেরি হচ্ছে। অলরেডি দশটা কুড়ি বাজে। তোর বাবাকে খেতে দেব এবার। তুই কি খাবি, না খাবি তোর ব্যাপার। আমার এখন ফালতু সময় নষ্ট করার মতো ইচ্ছে নেই।
- ধুর! তুমি না মা, একটুতেই বড্ড অধৈর্য হয়ে পরো। কথাটা একবার শোনোই না?
- হ্যাঁ, আমি তো একটুতেই অধৈর্য হয়ে পরি। বাহ! খুব ভালো কথা বললি তুই। একটা বাচ্চাকে ছোট থেকে বড় করতে একটা মায়ের কতটা ধৈর্য এর দরকার হয় জানিস? বোধ হয় এই পৃথিবীতে মায়েদেরই সবচেয়ে ধৈর্য বেশি। ধৈর্যটা ছিল বলেই তুই এত বড় হতে পেরেছিস। আর এখন বড় হয়ে মুখে মুখে কথা বলতে শিখেছিস। যখন মা হবি বুঝবি এই মায়েরা সন্তান মানুষ করার জন্য কি পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করে। যত বড় হচ্ছিস তত অভদ্র হচ্ছিস ।
- আচ্ছা, ঠিক আছে। আমার ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো বলব না। এবার তুমি চুপ করে এই চেয়ার টায় বসো। আইডিয়াটা একবার শোনো।
- বলছি রাত হয়ে গেছে। বাবাকেও এখন মোমো কিনতে যেতে বলতে পারি না। কারণ বাবা এখন টায়ার্ড। তাই বলছি কি আমি মোমোটা অনলাইনে zomato জম্যাটো তে অর্ডার দিয়ে দিই?
- বাহ! একটার পর একটা অপশন একদম রেডি আছে তাই না? না, একদম নয়। বাইরের খাবার খাওয়া একদম ভালো নয়।
- তাহলে ? আমার যে এত খেতে ইচ্ছে করছে .... ( কাঁদতে কাঁদতে)
তুমি আমায় একটুও ভালোবাসো না।
- এই দেখো, বোকা মেয়ে অমনি কাঁদতে শুরু করে দিল। মোমোর জন্য কান্নাকাটি। তুই কি এখনো বাচ্চা আছিস নাকি? এবারে স্কুল ফাইনাল দিবি তুই। সতেরো বছর বয়স হয়ে গেল। এখনো ছেলে মানুষী গেলো না তোর বল? চোখ মোছ। আমি দেখছি কি করা যায়!
- ( চোখ মুছে, হাসি মুখে মা কে জড়িয়ে ধরে) আমি জানতাম মা, তুমি আমার জন্য মোমো করবেই। আমার আবদার তুমি ফেলতে পারবে না।
- আচ্ছা, খুব হয়েছে মা কে আদর করা। এবার চল আমায় একটু হেল্প করে দিবি।
- সে আমি করতে রাজি। তোমার সাথে সাথে কাজ করতে আমার বেশ ভালোই লাগে। সবজি কাটতে, খুন্তি নাড়তে।
- হুমম। পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে এসব করতে তো ভালো লাগবেই। নিজের পড়াশোনার কাজ করে সময় পেলে অবসরে এইসব করতে হয়। এখন পড়া হয়ে গেছে। তাই বললাম হেল্প করতে। তুই এক কাজ কর। আগে তোর বাবাকে রুটি , তরকারিটা দিয়ে আয়। আর হ্যাঁ, শোন দুটো রুটি কম দিবি। বলবি এটা এখন খেতে। মা মোমো করছে আধ ঘণ্টার মধ্যেই হয়ে যাবে। তখন খাবে। আমি এদিকে ফ্রিজ থেকে চিকেন টা বের করে ধুয়ে নিই। তুই খাবার টা দিয়ে এসে আদা, রসুন পেঁয়াজ এগুলো ছড়িয়ে দিবি। তাহলে চটপট হয়ে যাবে। আর একটু ধনেপাতার চাটনি আছেই। তাই চাটনি আর করব না।
- আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি এখুনি দিয়ে আসছি বাবাকে।
- মা, তুমি কি সুন্দর চটপট রান্না সেরে ফেলতে পারো। কত তাড়াতাড়ি সবজিও কাটতে পারো। আমার কত লেট হয় ।
- এগুলো তো অভ্যাস এর ব্যাপার। রোজদিন একই কাজ করলে যেমন দক্ষতা এসে যায় এটাও তো ঠিক এমনই। যাক গে, সেসব কথা। তোর বাবাকে বলেছিস তো একটু পরেই মোমো হয়ে যাবে। একটু অপেক্ষা করতে?
- হ্যাঁ, খাবার দিয়ে আসার সময় তো বলে এলাম। বাবা তো শুনেই বেশ খুশি ।
- তা খুশি হবে না! তোরা তো শুধু বাপ - বেটি মিলে আমায় দিয়ে খাটাতে পারলেই বাঁচিস। আর এ করে দিলেই গাল ফুলিয়ে থাকবি।
- ( একটু হেসে) ও মা তোমার রান্না গুলো কিন্তু আমার খুব ভালো লাগে। তুমি কিন্তু রেস্টুরেন্টের থেকেও দারুণ রান্না করো। তোমার মত রান্না করা যে কবে শিখতে পারব।
- পারবি রে বাবা পারবি। রান্না তো একটা শিল্প। একটা আর্ট। আগ্রহ থাকলেই হবে। তাছাড়া এখন সোস্যাল মিডিয়ার দৌলতে রান্না শেখা এখন খুব সোজা। ইউটিউবে সার্চ করলেই এখন যে কোন রান্নার রেসিপি দিয়ে দেয়। ভিডিও দেখেই তো আমি শিখেছি। আচ্ছা দে, আদা রসুন পেঁয়াজ গুলো দে। আমি চিকেন এর সাথে আদা রসুন পেস্ট করে নিয়ে পুর টা রেডি করে নিই। তুই একটা কাজ কর। গাজর, বিন্স, বাঁধা কপি ফ্রিজ থেকে বের করে ধুয়ে চপার মেশিনে দিয়ে কুচিয়ে দে। আমি স্যুপটা ওভেনে বসিয়ে দিই।
- আচ্ছা। মা পুরো প্রসেসটা করতে কত সময় লাগবে?
- আর বেশিক্ষণ নয়। কুরিমিনিট মতো অপেক্ষা কর। ম্যারিনেট হয়ে গেছে। এবার ময়দা মেখে লেচি করে পুর ভরে মোমো সেভ করে দিলেই হয়ে যাবে। স্টিমে দশ/ পনেরো মিনিট রাখলেই হয়ে যাবে।
- মা তুমি লেচি করে দাও। আমি পুর ভরে মোমোর সেভ দিয়ে দিচ্ছি । তোমার সাথে কথা বলতে বলতে আমার সবজি চপ করা হয়ে গেছে।
- দুজনে মিলে করলাম বলে ঝটপট হয়ে গেল বলো?
- হুমম। যতক্ষণ মোমো টা স্টিম হচ্ছে তুই প্লেট বাটি গুলো সাজিয়ে নে। হয়ে গেলেই একসঙ্গে পরিবেশন করে দেব। একদিকে স্যুপ টা ফুটছে। আর একদিকে মোমো। আর পাঁচ - সাত মিনিটের মধ্যেই কমপ্লিট হয়ে যাবে।
- বাহ ! মা হেব্বি টেস্ট হয়েছে কিন্তু। উফফ! গরম গরম মোমো সাথে ধোঁয়া ওঠা স্যুপ , আবার ধনেপাতার চাটনি। ওহ! ব্যাপক লাগছে কিন্তু খেতে।
- তোর মন ভরেছে?
- খুব। মন, পেট দুটোই ভরে গেছে। বাবাও তো চেটে পুটে খাচ্ছে দেখে এলাম।
- যাক তোরা খুশি হলেই আমি খুশি। যাক , অবশেষে তোর আবদার মেটাতে পারলাম। যদিও তুই অনেকটা হেল্প করেছিস। নাহলে এত তাড়াতাড়ি পেরে উঠতাম না। রাত ও হয়ে গিয়েছিল। কাল কিন্তু ভোর ভোর উঠে পড়তে বসতে হবে। কোনো বাহানা কিন্তু শুনবো না।
- আচ্ছা, ঠিক আছে। লাভ ইউ মা। গুড নাইট।
- পাগলী মেয়ে আমার। গুড নাইট।
সমাপ্ত

0 মন্তব্যসমূহ