অভিজ্ঞতা ও দর্শনের মেলবন্ধনে সৃষ্টি তিনটি অণুগল্প। ( সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা অণুগল্প)

 আজ আবারো মনের মধ্যে অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে কয়েকটি অণুগল্প লিখতে বসলাম। জানি না মোট কয়টি অণুগল্পকে  আজ এখানে বন্দি করতে পারবো। তবু চেষ্টার ত্রুটি রাখবো না। ইদানিং বড্ড বেশি অণুগল্পের প্রতি ঝোঁক চেপেছে। নানারকম অণুগল্প পড়ছিও। আবার লিখতেও সাধ জাগছে। তাই ইচ্ছেকে আর দমিয়ে রাখতে চাই না। সাহস নিয়ে লিখতে বসলাম। দেখা যাক কি হয়। ইতিমধ্যে আমার আগে মোট চৌদ্দটি অণুগল্প লেখা হয়ে গেছে। সেগুলোও পড়তে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে। 



১: ঈশ্বরের দূত


বিল্টু আজকে খুব খুশি। কারণ ওর আজ আট বছরের জন্মদিন। প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে থেকেই ও আবদার রেখেছে বাবার কাছে ওই দিনকে সে ইলিশ মাছ খাবে। ছেলেটা বড় মুখ করে বাবার কাছে কিছু একটা চেয়েছে না দিতে পারলে যে মনটা বড় কষ্ট হবে ওর। ওতো ছেলেমানুষ। ওকি আর অভাব বোঝে? কুশলের বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। ছেলের জন্য মাত্র দুই পিস কাটা ইলিশ মাছের আশায় মাছ- বাজারে ঢুকলো। বাজার ভর্তি মাছের দোকান, হরেক রকম মাছ ও তাদের দাম শুনে কুশলের চোখটা ছলছল করে উঠলো। চারিদিক কেমন যেন ঝাপসা লাগছে। কানে বিঁধছে মাছের দর কষাকষির হাঁকডাক। দূর থেকেই ইলিশ মাছের দাম শুনে বুকটা কুশলের কেঁপে উঠলো।



 হাতে থাকা একশটা টাকার নোটটা

আরো শক্ত মুঠো করে ধরে ধীর পায়ে ভীড় ঠেলে  বাজারের বাইরের দিকে আসার চেষ্টা করলো কুশল। অবশেষে বেরিয়ে রাস্তার মোড় টার সামনে দাঁড়ালো। কুশল বুঝতে পারলো ততক্ষনে চোখে থাকা জলটাও পুরুষ জাতটাকে পাত্তা দেয় নি। গড়িয়ে গাল বেয়ে নেমে এসেছে। মুঠোয় বন্দি নোটটাও ঘামে ভিজে গেছে। 


নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো। বার বার বিল্টুর মুখের হাসিটা কুশলের চোখের সামনে ভেসে উঠলো। নিজেকে বারবার মনে মনে কুশল বলছিল - " সত্যিই আমি এক অপদার্থ বাবা, অকর্মণ্য পিতা। " শূন্য ব্যাগ, বুক ভর্তি হাহাকার নিয়ে ঘরে ফেলার পালা এবার। 


- ও দাদা, আরে, ও দাদা সেই থেকে যে আপনাকে ডাকছি আপনি দেখছি শুনতেই পাচ্ছেন না। আকস্মিক এমন শব্দ গুলো ভেসে এলো পিছন থেকে। কুশল মুখ ঘুরিয়ে দেখলো একজন মাছওয়ালা হাতে কালো পলিথিন নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। 

- আপনাকে দাদা অনেকক্ষণ ধরে ডাকছি। আপনি হেঁটেই চলেছেন। আপনাকে ধাওয়া করতে করতে হাঁপিয়ে গেলাম। 

কিন্তু আপনাকে তো আমি ঠিক চিনলাম না, কুশল কৌতহলীর সুরে বললো।

- বলছি দাদা, বলছি জোর হাঁপিয়ে গেছি। আগে ধরুন এটা।

- এই পলিথিনে কি আছে?

- কয়েকপিস ইলিশ মাছ। 

কুশলের বুকটা চ্যাট করে উঠলো। কিছু না বুঝেই অন্যমনস্ক ভাবে সে হাতটা বাড়িয়ে মাছের প্যাকেট টা নিল ।

- আমার ছেলে , আর আপনার ছেলে বিল্টু  স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। গতমাসে আমার ছেলের জন্মদিন ছিল। বিল্টু আমার ছেলের জন্য ওর মায়ের হাতে তৈরি করা কেক এনে ওকে খাইয়েছিল। আর গতকাল বিল্টু আমার ছেলের কাছে গল্প করেছিল ওর আগামী কাল জন্মদিন আর ওইদিন ওর খুব ইলিশ মাছ খাওয়ার ইচ্ছে। অনেকদিন খায় নি। তাই আর কি। আমি তো মাছেরই ব্যবসা করি। ছেলে এসে আমায় বললো তাই ওর জন্য এটা রেখেছিলাম। নিয়ে যান বিল্টু খুব খুশি হবে।


কুশল কালো পলিথিনটা ভালো ভাবে সযত্নে ব্যাগে ভরলো। মাছ ওয়ালাটিকে ঈশ্বরের দূত মনে করে দুই তালু এক করে নমস্কার জানালো।


সমাপ্ত

.......................



রক্ত জাত চেনে না: 


কখনো কখনো ভালোবাসার সম্পর্কে থাকা দুটি প্রাণ একে অপরের সাথে বেইমানি করে না। নিঃস্বার্থ ভাবে দুটি মন একে অপরকে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তদের মিলন হয় না। এর মূলে থাকে পারিবারিক, সামাজিক বাঁধা। দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রেম, ভালোবাসায় বেশীরভাগ সময়ই অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় পরিবার, সমাজ। আর তাদের উপেক্ষা করে নিজেদের ভালোবাসাকে পরিণতি দেওয়ার সাহস অনেকেই পায় না। তাই সেই ভালবাসাকে তারা বিসর্জন দেয় পরিবারের কল্যাণে, সমাজের চাপে। 


রিজিয়া আর তন্ময়ের ভালোবাসার পরিণতিও শেষ পর্যন্ত ওই একই নিয়মের মধ্যেই পরেছিল। ভালোবাসা জাত, ধর্ম, বর্ণ মানে না। খুব ছোট বয়সেই রিজিয়া- তন্ময় একে অপরের প্রেমে পড়ে। স্কুল লাইফের প্রেম। দুজনের ভালোবাসা ছিল গভীর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ভালোবাসা পরিণতি পায় নি। বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল পরিবার , সমাজ। দুটি ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রেম, ভালোবাসা কোনোপক্ষই মানতে চায় নি। রিজিয়া আর তন্ময়ও চায় নি বাড়ির মানুষ গুলোকে উপেক্ষা করে নিজেদের জীবনটাকে নতুন করে শুরু করতে। 


শেষপর্যন্ত দীর্ঘদিনের ভালোবাসার ইতি টেনে তারা একে  অপরের ক্যারিয়ারে মন দেয়। যদিও এত বছরের সম্পর্কে ভুলে যাওয়া, ত্যাগ দেওয়া এতটাও সহজ ছিল না। তবু তারা অবশেষে ক্যারিয়ারকে শক্ত খুঁটির মতো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছে। আজ তাদের দুজনের পথ ভিন্ন হলেও তারা দুজনেই সমাজে খুব প্রতিষ্ঠিত। 


মাঝখান থেকে কেটে গেছে দশটা বছর। রিজিয়া এখন স্বনামধন্যা ডাক্তার। এবং তন্ময় বর্তমানে বিদেশে কর্মরত। 

তন্ময়ের বাবা রজতাভ বাবুর হঠাৎই একটি রোড এক্সিডেন্ট হয়। স্হানীয় বাসিন্দারা তড়িঘড়ি তাকে কাছের হাসপাতালে নিয়ে যান। অনেকটা রক্তক্ষরণ হয় তাঁর। ইমারজেন্সি রক্তের প্রয়োজন পরে। ব্লাড গ্রূপ মিলিয়ে চলে তড়িঘড়ি রক্তের সন্ধান। শেষপর্যন্ত ওই হাসপাতালেরই কর্মরতা এক ডাক্তার তাকে রক্ত দেন। এবং সেই ডাক্টারেরই চিকিৎসায় উনি সম্পূন্ন সুস্থ হয়ে ওঠেন। 


সুস্থ হয়ে পরে রাজতভ বাবু  জানতে পারেন সেদিন তাকে রক্ত দিয়ে ও চিকিৎসা করে নতুন জীবন দিয়েছিলেন ডাক্তার রিজিয়া।


আসলে সত্যিই মানুষের কোনো জাত হয় না। কোনো ধর্ম হয় না। কোনো বর্ণ হয় না। মানুষের পরিচয় তার কর্মে, দায়িত্বে, কর্তব্যে, চরিত্রে। এই গল্পের প্রতিটি ছত্রে এই শিক্ষারই বীজ বপন করে গেলাম। 

......................................................................


৩ : ঈশ্বর দর্শন 


অনেকক্ষণ ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে প্রীতির হাতে, পায়ে কাঁপুনি আসছে। বুকটা ধড়ফড় করছে। মাথার ওপর প্রকৃতির তির্যক চাউনি ওর মাথার মাইগ্রেনের সমস্যাটাকে প্রশয় দিচ্ছে ক্রমাগত। লাইন যেন তবু সামনের দিকে এগোচ্ছে না। কিন্তু মাঝপথে লাইন ছেড়ে বেরিয়ে আসতেও ইচ্ছে করছে না। দুরাত মেল জার্নি করে সে এখানে এসেছে। শুধুমাত্র একবার দর্শন লাভের আশায়। এতদূর এসে তবে কি ফিরে যাবে? দেখা কি মিলবে না? মাগো জগৎ জননী মা আমার , তবে কি তোমার দর্শন আমার কপালে নেই? 


শুধু কি মেল জার্নি? মেল থেকে নেমে আরো আট ঘন্টার বাস জার্নি তারপর কাটরা থেকে হেঁটে তেরো কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে উঠে তবে জয় মাতাদির দর্শন পাওয়া সম্ভব। এতটা হেঁটে এসে প্রীতির শরীরটা প্রচন্ড ক্লান্ত লাগছে। 


শুধু মনে মনে " জয় মাতাদি "নাম জপে যাচ্ছে। এরপর সুড়ঙ্গ বেয়ে গুহার মধ্যে প্রবেশ। অবসন্ন শরীরটাকে প্রীতি কোনোমতে টানতে টানতে মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গুহায় প্রবেশ করা মাত্রই তার শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। প্রীতি অনুভব করতে পারলো তার হাত- পায়ের অসার কাঁপুনি ভাবটা সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে গেছে। এতক্ষন অবধি মাথার মধ্যে যে দপদপানি ভাবটা চলছিল তাও ভ্যানিশ হয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু ভক্তের দলের রব - জয় মাতাদি, জয় মাতাদি। 


প্রীতির বুকটাও ভক্তির অকুলতায় ব্যাকুল হয়ে গেল। চোখ ফেটে জল চলে এল। মা গো তোমার এত দয়া মা আমার ওপর? শেষ পর্যন্ত আমার মত একটা সাধারণ মেয়েকেও তুমি দেখা দিলে? মাগো , তোমার মন্দিরে প্রবেশ মাত্রই আমার শরীরের সব জ্বালা, কষ্ট সমস্ত দূর হয়ে গেছে মা। আমার যাত্রা সার্থক হয়েছে মা। মমতাময়ী মা তুমি সকলের মঙ্গল কোরো মা। আমার জীবনের সকল বাঁধা বিপত্তি তুমি দূর করো মা। 


মায়ের কাছে এই প্রার্থনা করে প্রীতি পরম শান্তিতে আবার ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। এ গল্প যেন প্রায় অনেক ভক্তদেরই মনের কথা। 


সমাপ্ত




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ