১: ঈশ্বরের ডাক
রাতের শেষ ট্রেনটা সবে মাত্র বেরিয়ে গেল। দু- চারজন লোক নামলো। ট্রেনটা প্লাটফর্ম ছাড়ার সাথে সাথেই তারা স্টেশন থেকে নেমে মেঠো রাস্তা ধরলো। রুপম চেয়ে দেখলো এই শুনশান রাতের অন্ধকারে এক ভাবে বয়স্ক ভদ্র লোকটি বসে আছেন।
ইঁট, পাথরের জল- হাওয়ায় বড়ো হওয়া রুপম সদ্য স্ট্রেশন মাস্টারের চাকরিটা পেয়েছে।
গ্রামের দিকে হলেও চাকরী জীবনের প্রথম দিনগুলো তার কাছে ভালোই লাগে। শহুরে কোলাহল থেকে এই বেশ ভালো।
- দাদু, আপনাকে অনেকক্ষন ধরে লক্ষ্য করছি আপনি এখানে বসে আছেন। আপনি কি কারো জন্য অপেক্ষা করছেন? কিন্তু রাতের শেষ ট্রেন তো ছেড়ে চলে গেল।
বয়স্ক মানুষটি মাথা তুলে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, অপেক্ষা? হুমম, ঠিক বলছো বাবা, দীর্ঘ অপেক্ষা। এ এক সহায়, সম্বল হীন মানুষের ওপারের ডাক আসার লম্বা
অপেক্ষা।
.................................................................................
২ : স্বপ্ন এভাবেও পূরণ হয় :
পড়ালেখা অন্ত প্রাণ ছবির আঠারো পেরোতেই দেখাশোনা করে বিয়ে হয়ে গেল। গরীব ঘরে জন্মালে পড়াশোনা নাকি বিলাসিতা। এ কথাটা ওর মা কাজের ফাঁকে অনেকবার ছবিকে আওড়েছে। ছেঁড়া- ফাটা ঘরে মলাট বন্দী অক্ষর গুলো তখন ভিজে যেত ছবির চোখের জলে। মেয়ের করুণ মুখ খানি দেখে, হাতের কাজ সামলে ছুট্টে এসে তার তাপতি দেওয়া আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিত। আর বড় মুখ করে বলতো কাঁদিস না মা। দেখবি , তোর এমন ঘরে বিয়ে দেব তারাই তোকে পড়াশোনা করাবে। তোর স্বপ্ন পূরণ হবে।
ছবির মেয়ের আজ উচ্চ মাধ্যমিকের রেসাল্ট। দুই ট্রিপ অটো চালিয়ে এসে আর তার মন করলো না রাস্তায় গিয়ে অন্যদিনের মত প্যাসেঞ্জার তুলতে। অটোটা নিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল। একি বাড়ির সামনে এত বড় বড় গাড়ি কেন? বুকটা অজানা ভয়ে কেমন যেন করে উঠলো ছবির। অটোটা থামাতেই ভেসে এলো মাইকো ফোন নিয়ে প্রেসের লোকেদের সেই ভাষণ-
" আজকের বিশেষ খবর, দারিদ্রকে হারিয়ে জয়ের মুকুট : উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করলেন একজন অটোচালিকার মেয়ে।"
বাতাসের মধ্যে সেই স্বরটা আবার স্পষ্ট শুনতে পেল ছবি।
- বলেছিলাম না, তোর স্বপ্ন একদিন সত্যি হবেই। গরিবের কথা বাসী হলেও সত্য হয়। তুই পারিস নি তো কি হয়েছে , ও তো তোরই নাড়ি ছেঁড়া ধন।
.................................................................................
৩ : সময় ও স্মৃতি :
প্রফেসর সৌমিতা গাঙ্গুলী। আজ এই নামেই সকলে এক নামে চেনে রিনিকে। নাম, যশ, সম্মান, এসব কিছুর ভীড়ে রিনি নামটা কোথায় যেন তলিয়ে গেছে। আজ কলেজ ছুটি। তাছাড়া এক্সট্রা কোন কাজের শিডিউলও নেই। অন্যান্য দিন নাহলে কলেজ থেকে এসেই কোনো সেমিনারে জয়েন করতে হয় কিংবা কোন সাহিত্যিক মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসাবেও তাঁর আমন্ত্রণ থাকে। দিনের পর দিন ব্যস্ততার মধ্যে থাকতে থাকতে মনটাও একটু মুক্ত হতে চাইছিল।
আজ সেইরকমই একটা দিন। বন্ধ ঘরের মধ্যেও সৌমিতার নিজেকে ডানা মেলা পাখি মনে হচ্ছিল। অনেক দিন পর আজ সে সময়কে একটু একটু করে উপভোগ করতে পারবে। হাতে এক কাপ ব্ল্যাক টি আর মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বড্ড প্রীতমের কথা মনে পড়ছিল। সত্যিই পরিস্থিতি কতটা নিষ্ঠুর। মানুষ নিজেকে গড়ার দায়ে, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বাসনায় , সাফল্যের পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে গ্রাম ছেড়ে শহর, শহর ছেড়ে ভিন রাজ্য, আবার রাজ্য পেরিয়ে দেশকে ছাড়ে।
ফেলে যায় তার শৈশব, অতীত, ভালোবাসা, দুঃখ, কষ্ট সব। আজ অনেকদিন পর প্রীতমকে খুব গভীর ভাবে সে মিস করছিল। ওই নাম মাত্রই তাদের বিয়ের সম্পর্ক। বিবাহিত তারা। অফিসিয়ালি খাতায় কলমে তারা একে অপরের জীবনসঙ্গী। একটা ঘরের সঙ্গী হয়ে থাকতে পারল আর কটা দিন?
বাস্তবে তারা একে অপরের থেকে কত দূরে। এক দেশ থেকে অন্য দেশের তফাৎ। কাপের শেষ চুমুক টা জানান দিল কফি শেষ। সৌমিতা অনেকদিন পর পুরোনো স্টোর রুমে এল। আলো আঁধারী ছায়ায় একটা ধূলো মাখা ডায়েরি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো । ডায়েরিটা যেন ওরই অপেক্ষায় দিন গুনছিল।
মলাটে থাকা ধুলো গুলো ঝাড়তে ঝাড়তেই ডায়েরির ভিতর থেকে একটা সাদা- কালো ছবি মেঝেতে পরলো। সৌমিতা ছবিটা হাতে তুলে দেখতেই চমকে গেল। ছলছল চোখে , কাঁপা কাঁপা আঙুলে ডায়েরির পাতা ওল্টালো,
-প্রিয়তমা,
রিনি- প্রেম, ভালোবাসা গরীব মানুষের জন্য হয়তো নয়। তাই ভগবান এই জনমে হয়তো তোমার সাথে আমার মিল লেখেন নি। তোমার বিদেশে চাকরি করা স্বামীর সাথে বাকি জীবনটা সুখের কাটুক। ভগবানের কাছে এই কামনা করি। দেখা হবে অন্য আর একটা জন্মে। তখন না হয় বড়লোক হওয়ার মন্ত্র টা জেনে আসবো ওপর থেকে।
ইতি
- তোমার সমীর।
ধূলো মাখা ডায়েরিটা বুকে জড়িয়ে সৌমিতা কাঁদতে থাকলো, আর ছবি খানা হাতের মুঠোয় নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, রিনি.. আমি শুধু তোমারই রিনি।
..............................................................................
৪: "রতনে রতন চেনে "
বইয়ের প্রতিটা পাতা জুড়ে এত কষ্ট , বিষাদ , বিরহ, দারিদ্রতা পড়তে পড়তে মনটা বড়ই বিষণ্ণ হয়ে যায়। চারিদিকে এত রং, সুর, গন্ধ কোন কিছুই কি আপনার চোখে পড়ে না কবি? আপনার প্রতিটা ছন্দেই শুধুই অবহেলা, লাঞ্ছনা , না - পাওয়ার বেদনায় কালো অক্ষররা জ্বলজ্বল করে টলমল চোখে। আপনার লেখায় কোন রস বোধ নেই।
বলি কি, কবি আপনার মধ্যে এতটুকুও রসনা নেই। নাহলে এত ভুরি ভুরি বিরহের ছবি মলাট বন্দি করে মানুষের হৃদয়কে বিচলিত করতে পারতেন না।
কোন সুখের কাহিনী, সুরেলা স্মৃতির ভান্ডার আমাদের উপহার দেন না কেন?
- কারণটা জানতে চাও?
- বলুন
- কারণ,
"রতনে রতন চেনে।"
সমাপ্ত
0 মন্তব্যসমূহ