ক্ষনিকের রাগ আর অতিরিক্ত জেদ একটি পরিবারকে কি ভাবে শেষ করে দিল তারই ঘটনা বর্ণিত আছে আজকের পাতায়।

 কথায় আছে অতিরিক্ত জেদ, অহংকার ভালো নয়। পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে যে চাহিদা গুলো অন্ধজেদ হয়ে মনের গভীরে এঁটে বসে,  তার পরিণতি কখনোই সুখের হয় না। ছোট থেকে বড় আমাদের সকলেরই তা বোঝা উচিত। অবাঞ্ছিত ইচ্ছা, চাহিদার ঝুলি মানুষকে যেমন জেদি করে তোলে তেমনই তার সাথে পরিবারের অন্যান্য মানুষদেরও বিপদে ফেলে। 
তেমনই একটা ঘটনা আমি লিখতে চলেছি। অতিরঞ্জিত কিছুই বলবো না। কারণ ঘটনাটা সত্যি। আমি এখানে আমার ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতির ঘটনা গুলোই সরাসরি অথবা গল্প আকারে প্রকাশ করি। আজও একটি ঘটনা সংবাদপত্রের মাধ্যমে পড়লাম। গল্প কথায় তারই বিবরণ দিলাম। গল্পিটি পড়ে আপনাদের মতামত আমায় জানাতে পারেন। 
......…......................................................................
পঙ্কজ কুমার নায়েক একজন দায়িত্বশীল মানুষ। পরিবার অন্ত প্রাণ তিনি। স্ত্রী বিশাখা, ও একমাত্র পুত্র সন্তান রজত কে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। পঙ্কজ বাবু একটি বেসরকারি কম্পানিতে কর্মরত। তার একজন স্ত্রী সাধারণ গৃহবধূ। ছেলে রজত এবছর উচ্চমাধ্যমিক দেবে। বয়স আঠারো।
সংসারে কোনও বাড়তি লোক নেই, তাই চাপা অশান্তিরও সুযোগ নেই। বেশ ভালোই সুখে, শান্তিতে কাটছিল তাদের দিনগুলো। 
ছেলের সামনেই বোর্ড এক্সাম। সেইজন্য পঙ্কজবাবু এবছর  বাড়তি টিউশন দিয়েছেন। যাতে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো টানিং পয়েন্টের এই পরীক্ষাটা রজত ভালো ভাবে পেরিয়ে যেতে পারে। তাহলেই অনেকটা সুদূর ভবিষ্যতের তালা খুলে যাবে। চোখে এক রাশ স্বপ্ন আর মাথার ওপর বিশাল কাজের চাপ সাথে এক্সট্রা নাইটও করেন। দুটো টাকা বাড়তি রোজগারের জন্য।
নিত্যদিনের একইরকম সুখ দুঃখের ভিড়ে জীবন অতিবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই একদিন তাদের এই আনন্দের সংসারে অন্ধকার নেমে আসল। রাতের ডিনারের জন্য তখন একসঙ্গে খেতে বসেছে নায়েক পরিবার। সামনে টিভি চলছে। একসঙ্গে তিনজনে খেতে বসে একটু টিভি দেখা সাথে সারাদিনের টুকটাক গল্প। এই সময় টা যেকোন পরিবারের জন্যই খুব ভালো একটা মুহূর্ত। আজ সেই মুহূর্তের ছন্দপতন ঘটলো।
- বলছি,বাবা... আমার একটা আই ফোন চাই। আর সেটা এই সপ্তাহের মধ্যেই। 
রুটির টুকরোর সাথে চিকেনের একটু অংশ মুড়ে মুখ নাড়তে নাড়তে রজত খানিকটা বিরক্তি মেশানো গলায় বলল।
হাতে থাকা জলের গ্লাসটা রেখে, পঙ্কজ কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রজতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। 
প্লেটে থাকা চিকেনটা সবে নিতে যাবে এমন সময় ছেলের মুখে এইরকম কথাবার্তা শুনে বিশাখাও ভ্রু কুঁচকে, মারমুখী হয়ে ছেলের দিকে তেড়ে গেল।
পঙ্কজবাবু হাতের ইশারায় বিশাখাকে থামতে বলে, রজত কে প্রশ্ন করলেন, কি দরকার তোর আইফোনের? লেখাপড়া করার মত একটা ল্যাপটপ, একটা স্মার্ট ফোন তো তোকে দিয়েইছি। এটাই কি যথেষ্ট নয়?
- না নয়। আমার বন্ধুদের অনেকেরই আইফোন আছে। আমারও চাই। আর এটাই আমার শেষ কথা ব্যস। 
টেবিলে হাত মুঠো করে ঠুকে তীক্ষ্ণ নজরে বাবা, মায়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে অসমাপ্ত খাবারের প্লেটটা সজোরে হাত দিয়ে সরিয়ে রজত উঠে দাঁড়াল। 
- রজত বস। খাবার ফেলে যাস না। এতে সংসারের অমঙ্গল হবে। 
মায়ের কাকুতি তার কানকে ভেদ করে হৃদয় অবধি পৌঁছাতে পারলো না। কারণ ওই জায়গায় তখন ইতিমধ্যে ই বাসা বেঁধেছিল শয়তানের ত্রাস।
- তবে শুনে রাখ রজত,  আমি তোর এই চাহিদা এখনই পূরণ করতে পারবো না। সামনেই তোর পরীক্ষা। অনেক টাকা খরচ করে তোকে আমি পড়াচ্ছি। ওসব বাজে চিন্তাভাবনা মাথা থেকে সরিয়ে পড়াশোনায় ধ্যান দে। 
রজতের জেদ আরো চেপে বসলো। মনের ভিতরে থাকা শয়তানটা চেহারায় ফুটে উঠলো। বাবার চোখে চোখ রেখে তর্জনি তুলে সে হুংকার দিল আইফোনটা আমার চাইই চাই। তাও আবার এক সপ্তাহের মধ্যেই। আর এটাই আমার শেষ কথা।
- ওহ! এত স্পর্ধা হয়েছে তোর? বাবার চোখে চোখ রেখে মেজাজ দেখাস? তোকে আমি দেব না। মনে রাখ এটাই আমার শেষ কথা।
- আচ্ছা, তুমিও দেখে নেবে আমি কি করতে পারি। 
রাতের খাবারের চেয়ার গুলো খালি হয়ে গেল। কিন্তু  টেবিল ভরা খাবারের প্লেট গুলো চেয়ে রইলো বিশাখার বিধ্বংসী মুখের দিকে। রজত চলে গেল নিজের ঘরে। পঙ্কজবাবুও চরম হতাশায় চোখ বুজলেন এক নতুন ভোরের সূচনার অপেক্ষায়। 
কিন্তু নতুন ভোরের সূচনাটা আর পাঁচটা দিনের মতো কর্মব্যস্তময় , সাধারণ হয়ে রইলো না। গতকাল রাতের অসমাপ্ত অশান্তিটা আজ সকাল থেকেই মাত্রাতিরিক্ত হয়ে উঠলো। রজতের জেদ আজকে আরো তীব্রতর হয়ে উঠলো। শত বোঝানো হলেও সে কোন কিছুই শুনতে না রাজ। 
- তোর বাবা, কত কষ্ট করে বল তো , এই সংসারটার জন্য। তোকে একটা ভালো স্কুলে পড়াচ্ছে, তোর সাধ্যমত বই খাতা জোগাড় করে দিচ্ছে। তোর উচিত মন দিয়ে পড়াশোনাটা করার? আর তো কয়েকটা বছর বাবা, আর একটু পরিশ্রম কর। ভালো চাকরি বাকরি পেলে দেখবি তোকে কারো কাছে হাত পাততে হবে না। তুই নিজেই নিজের শখ গুলো মিটিয়ে নিতে পারবি। বাবা, মাথা গরম করিস না। ওসব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। মন দিয়ে লেখাপড়া করে।
- মা ,বেশি জ্ঞান দিতে এসো না।
-ছাড়ো, বিশাখা তুমি ওকে আর কিছু বোঝাতে যেও না। ও কচি খোকা নয়। ওর যা ইচ্ছে হয় ও করুক। আমি অফিস বেরোব ভাত নিয়ে এসো। ওর মতো নিত্যনতুন বায়না নিয়ে আমায় বসে থাকলে হবে না। আমায় আমার কাজে যেতেই হবে।
বিশাখা আঁচলের খুট দিয়ে গালে বেয়ে আসা নোনা জলে ধারা মুছে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। 
রজত সদরের দরজাটা সপাটে বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে গেল। 
বিশাখা ভাত বাড়তে বাড়তে দরজার আওয়াজে চমকে উঠলো। বুকটা এক অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলো। 
- কি গো ছেলেটা কোথায় বেরোলো বলোতো রাগ করে?
 - দেখো হয়তো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেল। একদম বখে গেছে। কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেছে। আমার জানো তো, বিশাখা আর কিছুই ভালোলাগছে না। আমি যে দিনরাত এত খাটছি। এত পরিশ্রম করছি কাদের জন্য বলতে পারো? তোমাদের একটু সুখে রাখার জন্যেই তো বলো? সেই ছেলেই যখন আমায় বুঝলো না। আর কি বলবো। সবই আমার কপাল।
বাইরে থেকে কলিং বেল বাজার শব্দ দুজনেরই কানে ভেসে এল। ভাবলো , রজতই বুঝি ঘরে ফিরলো।
বিশাখা, তড়িঘড়ি দুহাতের সগরীটা বেসিনের জলে ধুয়ে আঁচলে হাত দুটি মুছতে মুছতে সদর দরজা খুলতে গেল। 
..........................................
দরজা খুলতেই- একসঙ্গে অনেকগুলো শব্দের জোয়ার ধেয়ে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই,
- কাকিমা তাড়াতাড়ি চলুন। রজতকে দেখলাম গ্রামের পিছনের ওই খাড়া পাহাড়টার দিকে এগোচ্ছে। আমাদের শত বারণ সত্ত্বেও সে কোন বারণই শুনলো না। 
ততক্ষনে খাবার ফেলে পঙ্কজ বাবুও এসে দাঁড়িয়ে সবটা শুনে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলেন না।
কোনমতে হাতটা ধুয়েই ওই গ্রামবাসীদের সাথেই ছুটতে ছুটতে পাহাড়ের রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। বিশাখাও ছেলের নাম ধরে চিৎকার করতে করতে তাদের অনুসরণ করলো।
ততক্ষনে রজত একদম পাহাড়ের খাড়াই জায়গায় পৌঁছে গেছে। গ্রামবাসীদের শত চিৎকার, বাবার ডাক, মায়ের কাকুতি কিছুই তাকে টলাতে পারলো না। জেদ তাকে তীব্রভাবে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। অবস্থা বেগতিক দেখে আগেই গ্রামবাসীরা স্হানীয় পুলিশকে খবর দিয়েছিল। তারাও হাজির। 
এক সমুদ্র প্রমান জেদের কাছে পরাজিত হয়ে পঙ্কজ বাবু জোর হাত করে কাঁদতে কাঁদতে সকলের সামনে বলছে, - তুই যা চাস, তাই হবে রজত। প্লিজ তুই ফিরে আয়।
রজতের মন তখন এসব কথা বিশ্বাস করতে নারাজ। তারমনের কুচিন্তারা পুরোপুরি তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। পাহাড়ের খাড়াই জায়গার একদম ধারে সে দাঁড়িয়ে আছে। নীচে গভীর খাদ। এক চুল এদিক ওদিক হলেই মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে যাবে শরীরটা গভীর খাদের মধ্যে। সঙ্গে তীব্র বাতাসের দাপট। 
এইভাবেই চলল টানা তিন ঘণ্টার অপেক্ষা। সাথে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের টানাপোড়েন। ছেলের ওই দৃশ্য দেখে বিশাখা  হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। মাটিতে মাথা খুঁড়ে খুঁড়ে ছেলেকে ওই খান থেকে ফিরে আসতে অনুরোধ করলেন। 
- তোর বাবার সামর্থ্য  না থাকলেও আমি তোকে গয়না বেচে আজই আইফোন কিনে দেব। তুই ফিরে আয় রজত। আমি তোকে কথা দিচ্ছি ।
গ্রামের মানুষরা, স্হানীয় পুলিশ কর্মীরাও হাজার অনুরোধ করতে থাকে রজতকে। তারাও আকুল চেষ্টা করতে থাকে। 
কিন্তু টানা তিনঘন্টা এভাবে বোঝানোর পরেও যখন রজত কথা শুনছিল না, একজন বাবা হয়ে নিজের সন্তানের ঐরকম বিপদমুখী অবস্থান দেখে তিনি নিজেকে আর শান্ত রাখতে পারেন নি। আস্তে আস্তে এগিয়ে যান ছেলের দিকে। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য পায়ে পায়ে পৌঁছে যান সবচেয়ে ভয়ংকর সেই পাহাড়ের খাদের কিনারায়। ছেলের কাছে।  
এবারই ঘটে সেই মর্মান্তিক কাহিনী। নরম, মাটি, আর নুড়ি, পাথরে পা দিতেই মুহূর্তের মধ্যেই জায়গাটা ধসে যায়। পংকজবাবু দুহাত দিয়ে রজতকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য ক্রমে দুজনেই তলিয়ে যায় খাদের নীচে। নির্বাক গ্রামবাসীরা হতভম্ব হয়ে এই দৃশ্য দেখে। তাদের কিছুই করার ছিল না। 
চোখের সামনে নিজের জীবনের মহামূল্যবান দুটি জীবনকে চিরতরে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে দেখলে কোন মানুষই কি আর স্হির থাকতে পারে? বিশাখাও জ্ঞান শূন্য হয়ে পাহাড়ের খাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং মৃত্যুবরণ করে।
.................................................
কি সাংঘাতিক এ দৃশ্য। বিরল এই ঘটনা। এই ঘটনা সমাজের চোখের সামনে আঙ্গুল দিয়ে শিখিয়ে দিয়ে যায় ডিজিটাল যুগের মাত্রাতিরিক্ত দেখনদারি আমাদের তরুণ সমাজকে মৃত্যুর খাদের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে দিচ্ছে ধ্বংসের দিকে। 
কোন বস্তুর মোহে না ছুটে আসুন নিজেদের জীবনকে গুরুত্ব দিই। নিজের পরিবারের মানুষ গুলোর কথা ভাবি। চাহিদার চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বড়, সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক। সেগুলো আমরা ভুলতে বসেছি। রাগ, জেদ অহংবোধ আমাদের মস্তিষ্ককে পঙ্গু করে ফেলছে। 
এগুলো আমাদের জীবন থেকে সরিয়ে কর্মকে সামনে রেখে আমাদের এগিয়ে চলাই হোক জীবনের মূল মন্ত্র।
আজকের ব্লগটা এতটুকুই। আবার ফিরবো নতুন অনুভূতির গল্প নিয়ে। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ