এক কাপ চা ও সাথে জীবনদর্শন : ফুটন্ত জল থেকে সফলতার গল্প

 সংসারের হাজারটা কাজের মাঝেও এই বিকেল বেলাটা আমার এক টুকরো মুক্তির স্বাদ। সারাদিনের মধ্যে এই সময়টা আমার সবচেয়ে প্রিয়। সকাল ও দুপুরের শুকোতে দেওয়া কাপড় গুলো ছাদ থেকে নামিয়ে এনে সেগুলো পরিপাটি করে ভাঁজ করতে বসি। সাথে হালকা মিউজিক। আমি নব্বই দশকের হিন্দি গান গুলো খুব পছন্দ করি। পছন্দ মতো গান চালিয়ে কাজ করার মজাটাই আলাদা। সকাল থেকে রান্না-বান্না ও ঘরের কাজগুলো বেশ তাড়াহুড়োর মধ্যেই করতে হয়। তাই রিল্যাক্স এ গান শুনতে শুনতে হয়ে ওঠে না। কিন্তু বিকেলটা সম্পূর্ন আমার ইচ্ছেয় কাজ এগোয়। 


একা থাকার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে। শান্তি আছে। অভিযোগ, অনুযোগের ভিড়ে বিকেলটা গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে যায় না। বরঞ্চ ধীরে সুস্থে কাজ গুলো করার মাধ্যমে নিজের মধ্যেও একটা কনফিডেন্স ফিল আসে। যাই হোক জামা কাপড় গুছিয়ে এবার যাই রান্না ঘরে নিজের জন্য এক কাপ চা বসাতে। হাতে চায়ের কাপ, সাথে বেলা শেষে সূর্যের পশ্চিমী চলন , কমলা আকাশ, পাখিদের ঘরে ফেরা, লাইটপোস্টের আলো গুলোর আবার জ্বলে ওঠা, দুপুরের খানিক নিস্তব্ধতা শেষে আবার একটু একটু করে রাস্তা ঘাটে ব্যস্ততা এসবই আমি উপভোগ করি ব্যালকনিতে বসে। 


এখান থেকেই জগৎ সংসারের এতখানি বৈচিত্র্য আমি দেখতে পাই। চায়ের চুমুক দেওয়ার সাথে সাথে গভীর ভাবে এই সব ঘটনা গুলোকে ফিল করি মনটা বেশ ফ্রি হয়ে যায়। কিন্ত আজ এই রোজকার ঘটনাগুলোকেও ছাপিয়ে আমার মন খুঁজে পেল একটা গভীর জীবনের সংযোগ।


 টেবিলে রাখা চায়ের কাপ থেকে যখন ধোঁয়াটা উঠছিল খুব ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম খানিকটা উপর অবধি ওঠার পর তার অস্তিত্বই পাওয়া যাচ্ছিল না। আমার ব্যক্তিগত জীবনের সাথে এই ধোঁয়াকে আজ স্পষ্টই এক সুতোয় মেলাতে পারলাম।


 যা কিছু এই মনকে কষ্ট দেয়, দুঃখ দেয়, মনকে অশান্ত করে তোলে সব কিছুই আবার এই ধোঁয়ার মতো কাল পরিবর্তনের সাথে সাথে এভাবেই অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। জীবনের টুকরো টুকরো অভিযোগের কথাগুলো বলছি। এই ধরুন, নিত্যদিনের ছোট- খাটো ভুল ত্রুটি, অপমান, অবহেলা, কষ্ট গুলো কিছু মুহূর্তের জন্য আমাদের মনকে নাড়িয়ে দিয়ে গেলেও আমরা আবার সব কিছু সংশোধন করে, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কিংবা কিছু অপমানের জবাবের দায় - ভার ঈশ্বরের দরবারে জমা রেখে আবার এগিয়ে চলি সামনের দিকে। এই গরম চায়ের কাপের ধোঁয়াটাও যেন আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। 


জীবনে হতাশার উত্তাপ যতই আসুক, ভেঙে পড়লে চলবে না। প্রতিনিয়ত লড়াই করতে জানলে, হার না মানতে শিখে গেলে সেই কষ্টের মুহূর্তের উত্তাপের ধোঁয়া খুব সহজেই বিলীন হয়ে যায়। আমাদের জীবনটা অনেকটা ছোট তাই না? তুচ্ছ কথায় আবেগ নিয়ে গুমরে মরলে, চোখের জল ফেলে বালিশ ভেজালেও কেউ পারবে না অন্তরের বেদনার গভীরতাকে উপড়ে ফেলতে। প্রিয়জনরা বড় জোর সান্ত্বনা দিতে পারে, আবার উঠে দাঁড়াতে অনুপ্রেরণা দিতে পারেন, ভরসার  হাতটা আপনার দিকে বাড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু আপনার মনের গলিতে জমে থাকা পরাজয়ের গ্লানি, কালো দাগকে আপনাকেই উদ্যোগ নিয়ে তাদের সাহায্যে উঠে দূর করতে হবে। 


বুঝতে পারছি চিন্তারা আরো গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করতে চাইছে। ভাবনার অতলে আজ অন্যকিছু সৃষ্টিতে নিমজ্জিত আমার প্রাণ। সামান্য এই এক কাপ চায়ের ধোঁয়া আমায় কত কিছুই না কয়েক মিনিটে শিখিয়ে দিয়ে গেল। আমি তলিয়ে যেতে থাকলাম আরো গভীরে। 


চায়ের জল বসানোর জন্য যখন সসপ্যানে জল ঢালি জলটা তখন কি সুন্দর ঠান্ডা , শান্ত থাকে। এবার তাকে গরম করার জন্য ওভেনে বসাই। খানিক বাদেই তাপ পেয়ে জলটা উষ্ণ হতে শুরু করে। সেখান থেকে উত্তপ্ত হয়ে বুদবুদের সৃষ্টি হয়। এই সময় জল ভীষণ রকম গরম, উত্তাল, চঞ্চল। তারপর তাতে চা, চিনি, দুধের সঠিক মিশ্রণে তৈরি হয় একটা সুন্দর পানীয়। তখনই জলটা তার নিজস্ব রূপ পরিবর্তন করে রঙে, গন্ধে অতুলনীয় হয়ে ওঠে। 


এই এতটুকু প্রদ্ধতিগুলির মধ্যেও আমি বাস্তব জীবনের একটা স্পষ্ট রূপধারা লক্ষ্য করলাম। যা আগে কখনো আমার মনকে এইভাবে সজাগ করেনি। শৈশবে আমাদের জীবন ধারাটাও ওই সসপ্যানের ঠান্ডা জলটার মতোই ছিল। শান্ত , জীবন সম্পর্কে কোনো ভাবনা চিন্তা ছিল না। মা- বাবার ছত্রছায়ায় মানুষ। খাওয়া- পরার সব দায়িত্ব তখন তাদের উপরই। কিন্তু একটু একটু করে যখন বড় হতে থাকলাম শিক্ষার অঙ্গনে পা রাখলাম আমাদের জীবনটাও বাস্তবের ছোঁয়া পেতে শুরু করলো। 


জ্ঞান অর্জন, নৈতিকতা, জীবনের চরাই উতরাই এর ভিড়ে আমাদের জীবনটাও আস্তে আস্তে উষ্ণ হতে থাকলো। উষ্ণ জলে যেমন অল্প অল্প করে বুদবুদের উৎপত্তি হয়, ঠিক সেইরকম ভাবেই আমাদের জীবনে আসল লক্ষ্য গুলো আমরা বুঝতে শিখলাম। 


এবার জল যেমন তীব্র উষ্ণতর হয়ে ফুটতে শুরু করে , অজস্র বুদবুদের সমাহারে ফুটতে থাকে, তেমনি আমাদের জীবনটাও স্কুল জীবনের পর থেকে অন্য রূপ নিতে শুরু করে। জীবনের আসল স্ট্রাগলটা যে  কি সেটা এই স্টেজে এসে উপলব্ধি করতে পারি। পরিস্থিতি কদমে কদমে তা টের পাইয়ে দেয়।ওই  ফুটন্ত জলের বুদবুদের মতোই আমরা চঞ্চল হয়ে পরি। ক্যারিয়ার, চাকরি, পরীক্ষা প্রস্তুতি, প্রতিযোগিতা এসবের মধ্যে আমাদের ব্রেনে অজস্র বুদবুদের মতো উন্মাদনা তৈরি হয়। 


এরপর ওই ফুটন্ত জলে যেমন চা, চিনি, দুধের সমাহারে এক রঙিন , সুগন্ধময় পানীয়ের সৃষ্টি হয়, ঠিক আমাদের জীবনটাও একই রকম ছন্দে তার সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। আমরা যখন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবার অভিপ্রায়ে বুদবুদের ন্যায় ক্রমাগত রাতের পর রাত জেগে পড়াশোনা করি, চাকরির প্রস্তুতির পরীক্ষা দিই, প্রতিনিয়ত একটার পর একটা পথের কাঁটাকে উপড়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলি, ঠিক এই এত কিছুর যৌথ সমন্বয়ে আমাদের জীবনটা সফলতার গন্ধ পায়। রঙিন হয়ে ওঠে। 


ওই গরম ধোঁয়া ওঠা পানীয়টির মতোই সেই সফলতার স্বাদ হয় অতুলনীয়। কি তাই তো? আমার এই ভাবনাটা আজ মাথায় এলো। এই এক কাপ চায়ের মাধ্যমেই আমাদের জীবন চক্রটাকে কি সুন্দর ভাবে বর্ণনা করা গেল। 


আজকের এই রূপকধর্মী জীবনদর্শনের গল্পটি আপনাদের কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না। আজকের ব্লগটা তবে এতটুকুই। আবার ফিরবো নতুন কোন অনুভূতির গল্প সাজিয়ে। আজ তবে আসি। সকলে ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন।।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ