জীবনের ক্যানভাস থেকে জন্ম : ছয়টি অণুগল্প। ( গৃহবধূর লেখনীতে)

আজকের ব্লগটিকেও আমি কয়েকটি অণুগল্পের সম্ভারে সাজিয়েছি। এতদিনে সবাই জেনে গেছেন আমি ডায়েরি ধর্মী লেখনিই আমার সাইটে লিখি। অর্থাৎ আমি জীবনের অনুভূতি, আবেগ, উপলবধুগুলোই এখানে প্রকাশ পায়। তাই আমার লেখাগুলো মূলত তথ্যমূলক নয়। আবেগধর্মী। আজকেও আমার আবেগ, অনুভূতিগুলিকে অনুসরণ করেই বেশ কয়েকটি সামাজিক অণুগল্প লিখলাম। গল্প গুলি আশা রাখি আপনাদেরও ভালো লাগবে। এর আগেও আমি দুটি পোস্ট মিলিয়ে ১০ টার মতো অণুগল্প লিখেছি। ওইগুলোও পড়তে পারেন। আজ লিখলাম মোট ছয়টি। 



১: রাখি পূর্ণিমা : 


আজ রাখি পূর্ণিমা। সকাল বেলার ব্যস্ত জনবহুল এলাকা জুড়ে পথযাত্রীদের কর্মব্যস্ততার ভিড়। দোকান- হাট থেকে শুরু করে বাস স্ট্যান্ড, ফুট-পাত সব জায়গাতেই কোলাহল। এরই মাঝে এক অভিনব ঘটনা ঘটে গেল। একজন ভবঘুরে পাগল পরণে তার অপরিস্কার বস্ত্র, সাথে ছেঁড়া কম্বল, কাঁথা , জীর্ণ কয়েকটা জামা কাপ

ড়ের একটি পোটলা। অন্য হাতে একটা লাঠি নিয়ে এগিয়ে আসছে। পথচলতি এমন পাগলকে দেখে সচরাচর অনেকেই নিজেকে একটু বাঁচিয়ে,  এড়িয়ে চলেন। বলা যায় না হাতে থাকা লাঠিটা নিয়ে তেড়ে আসলেই হলো। পাগলের মন তো কখন কি আছে তার মনে বোঝাই দায়।


হটাৎই পাগলটা একটি পথ চলতি কিশোরীকে দেখে তেড়ে এল তার দিকে। কিশোরীটি ভয়ে চিৎকার করতে লাগলো। কিন্তু পাগলটি ততক্ষনে পোটলাটা থেকে একটি রাখি বের করে, কিশোরী মেয়েটিকে ইশারায় বলছে পরিয়ে দিতে। এহেন, ঘটনা দেখে পথচলতি মানুষজন দাঁড়িয়ে যায়। পগলটির অঙ্গভঙ্গী, আভ -ভাব দেখে বোঝাই যাচ্ছিল সে বোবা ও কালা। 


কিশোরী মেয়েটি ভয়ে ভয়ে তার সামনে এসে পাগলটির হাত থেকে রাখিটি নিয়ে রাখিটি বেঁধে দেয়। পাগলটা আনন্দে নিজেই করতালি দেয়। আবার কিশোরী মেয়েটিকে প্রণামও করে। পাগলের এইরকম আচরণে ব্যস্ত শহরটা হটাৎ যেন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। ঘটনাটা এখানেই শেষ নয়। পাগলটি হাত নাড়িয়ে বোঝায় বোনকে দেওয়ার মতো তার কাছে কিছু নেই। কিশরীটিও তাকে জানায় তার কিছু লাগবে না। 


মেয়েটি চলে যাচ্ছিল। আবার পাগলটি হন্তদন্ত হয়ে কিশোরীটির সামনে এলো। এবং তার হাতে থাকা লাঠিটা তার দিকে এগিয়ে দিল উপহার স্বরূপ। ততক্ষনে এই বিরল দৃশ্যের ঘনঘটা পথচলতি ব্যস্ত মানুষরাই দাঁড়িয়ে ক্যামেরা বন্দি করেন। তার দেওয়া এই উপহারটি আমাদের এই সমাজকে অনেক কিছুই শিখিয়ে দিয়ে যায় নিঃশব্দে।


...........................................................................



২: রক্তের সম্পর্ক:


সংসার জীবনে মান - অভিমান, ভালোবাসা, ঝগড়া, অশান্তি এসব মশলা একসঙ্গে মিশে একটা গরম - নরম সম্পর্কের সৃষ্টি করে। রক্তের সম্পর্ক না থেকেও দুটি বিপরীত লিঙ্গের মানুষ একে অপরকে আঁকড়ে বাঁচতে চায়। একটি সুখের ঘর রচনা করে। পরিবার পরিকল্পনা করে। এরপর বংশবৃদ্ধি হয়। দুটি মানুষ জীবনের অনেক বাধা বিপত্তি কাটিয়ে পরিশ্রম করে, অনেক কিছুকে ত্যাগ দিয়ে সন্তানকে বড় করে তোলে। 


ও যে তাদের রক্তের বাঁধন। নয়নের মণি। তার সার্বিক উন্নয়নের  জন্য, তাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এই 

 ভিন্ন রক্তের মানুষ দুটি আপ্রাণ চেষ্টা করে। দিন গোনেন সন্তান কবে বড় হয়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। এখন এই বৃদ্ধ বয়সে সেই তো তাদের অবলম্বন। 


কালের নিয়মে সময় গড়িয়ে যায়। সন্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু চাকরির অজুহাতে সময় দিতে চায় না। মাসিক কিছু অর্থের বিনিময়েই রক্তের সম্পর্কের হিসাব মেটাতে চায়। আর শেষ বয়সে দুটি - ভিন্ন রক্তের মানুষ গুলি এখনো একে অপরকে আগলে বাকি পথটা দুঃখকে চেপে রেখে 

জীবন সায়াহ্নের দিকে এগিয়ে চলে। 


.................................................................................


৩: নুন- ভাত


পান্তা ভাতে মোটা দানার নুন ছড়িয়ে আঙুল ডুবিয়ে মা প্রতিদিন খেতেন। আমার তার ঢের আগে খাওয়া হয়ে যেত। ছোট ছিলাম কি না! তাই মা বলতেন সেইজন্য নাকি আমায় আগে খাইয়ে দিতেন। নাহলে বাচ্চাদের পেটে পিত্তি পরে যায়। আমার ভাত খাওয়া হয়ে গেলে আমার পাশে শুয়ে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। কিন্তু আমার চোখে তখন ঘুম নেই। ঘুমের বাহানা ছিল। কিছুক্ষণ পর মা পাশ থেকে উঠে রান্না ঘরে ঢুকতেন। সাদা থালায় দু- মুঠো পান্তা ভাত আর সাথে নুন মিশিয়ে কাঁচা লংকা রোগরে মুখে পুরতেন। আমি ঘর থেকে পা টিপে টিপে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে রোজ দেখতাম। 


একদিন মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম - মা তুমি তো রোজ আমায় একটুকরো মাছ , কিংবা ডিম দিয়ে ভাত খেতে দাও। কিন্তু তুমি নুন দিয়ে ভাত খাও কেন? মা অপ্রস্তুতে পরে বলেছিলেন," ওরে দুস্টু সারা দুপুর না ঘুমিয়ে মাকে নজরে রেখেছো? " 


মাঝখান থেকে কেটে গেছে কুড়িটা বছর। অফিস থেকে বেরিয়ে ড্রাইভারকে গাড়িটা পার্কিং জোন থেকে আনতে বলে ফুটপাতের রাস্তা ধরে হাতে থাকা মোবাইলটা স্ক্রল করতে করতে এগোলাম। মোবাইল থেকে চোখ সরাতেই হটাৎ দেখতে পেলাম ফুটপাতের পাশে একজন মা থালায় দুটি পান্তা ভাত নুন মিশিয়ে খাচ্ছে। আর পাশে থাকা তার দশ বছরের মেয়েটি ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বই নিয়ে একমনে পড়ছে। 


হটাৎ যেন আমার "আমি " টাকে কুড়ি বছর পর চাক্ষুষ দেখতে পেলাম। 

.................................................................................


৪: ভক্তি ও বিশ্বাস : ঈশ্বর


রক্তে সুগারের ঘনঘটা বুকে থাকা পুত্রশোকের যন্ত্রনা নিয়ে আজও লোকাল ট্রেনে ভিক্ষা করেন। জীবনে যোগ, বিয়োগ যতই আসুক, পেট তো আর কথা শুনবে না। তাই ঈশ্বরের দেওয়া এত বড় কঠিন শাস্তির বোঝা মাথায় নিয়েই রোজ বেরোতে হয়। দু- মুঠো খাবারের সন্ধানে।



 জীবিকা তো একটাই। ঈশ্বরের গুণ- গান গাওয়া। তাকে এ জীবনে ঈশ্বর অনেক কিছুই দিয়েছেন। কিন্তু যেটা সবচেয়ে কঠিন বর দান দিয়েছেন তা হলো পুত্রশোক সহ্য করার ক্ষমতা এবং তার পরেও ঈশ্বরের ওপর তার অগাধ বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের সুরেই আজও বেরিয়ে পড়েন দুটি রোজগারের আশায় একটি টাকায় নিজের পেট চালান আর অন্য টাকাটা দিয়ে ঈশ্বরের সেবা করে চলেন। এটাই ভক্তি, এটাই বিশ্বাস, আর এটাই হলো নিয়তি। 

.................................................................................


৫: বেকারত্ব 


প্রতিটা রাত যেন একটা গোটা যুগ। প্রতিটা ব্যর্থতা যেন একটা গোটা  শতাব্দীর অপেক্ষা। পড়ার টেবিলে রাতের পর রাত চলে বই এর সাথে চরম যুদ্ধ। সাল, তারিখ, অংকের ফর্মুলা, সাহিত্যের খুঁটিনাটি, মানচিত্র, আধুনিক সমাজ সংক্রান্ত জ্ঞান এসবই যেন বেকার ছেলেটার সাথে লুকোচুরি খেলে অবিরাম। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। আর কত দিন? অসহায় ছেলেটা বই থেকে চোখ সরিয়ে ক্যালেন্ডারে হাত রাখে। হিসাব করে , একটা - একটা  করে ঠিক কত গুলো বছর নষ্ট হয়। তবু অভাব ঘোচে না। আশা মরে না। নিজের উপর বিশ্বাসের পাথরটা কি বিশাল ভার হয়ে মাথার ওপর চেপে থাকে। 


বৃদ্ধ বাবার অবসরের কয়েকটি টাকা, মায়ের নার্ভের রোগ, হাতের কাঁপুনি তার ব্যর্থতাকে গ্রাস করতে পারে না। ক্যালেন্ডার থেকে চোখ সরিয়ে বাবা- মায়ের শরীরের দিকে তার ঝাপসা চোখটা বিঁধতেই , অদম্য জেদের শিকল টা বুকের উপর আরো একবার সজোরে নাড়া দেয়। কেউ যেন অন্তর থেকে চিৎকার করে বলে, " আর একবার জান- প্রাণ দিয়ে উঠে পড়ে লাগ। জয় তোর নিশ্চিত"। মুছে যাবে বেকারত্বের পরিচয়। 


.................................................................................


৬: মানবতা


নিজের শেষ সম্বল পুঁজিটুকু দিয়ে এই ছোট্ট আইসক্রিম ভ্যানটা কিনেছে অসীম। বাড়িতে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, মায়ের হাঁপানি রোগ সর্বোপরি অশোকের নিজের শরীরেও বাসা বেঁধেছে এক রোগ। যদিও ডাক্তার বলেছেন নিয়মিত চেক আপ করিয়ে নিলে ওষুধ খেলে রোগটা আস্তে আস্তে সেরে যাবে। এই রোগটার জন্যই অসীম বেসরকারী চাকরিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। 


সারাদিনের বিক্রি- পাট্টা খুব একটা বেশি হয় না। সবে মাত্র দুমাস হলো ব্যবসাটা খুলেছে। বুকে অনেক আশা, অনেক গুলো পেটও তার দিকে চেয়ে আছে। দোকানে বসে থাকতে থাকতে অসীমের কথাগুলো বারবার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও একবার আকাশের দিকে চেয়ে দেখলো। 


কাঁপা কাঁপা গলায়, আমায় একটা কুলফি আইসক্রিম দেবে? 

বৃদ্ধ মানুষটির কথায় অসীম সম্মতি জানালো। 

- এখুনি দিচ্ছি। দাদু।

- কিন্তু বাবা, একটা কথা।

- হ্যা, বলুন দাদু

- বাবা, জানো তো আমার কাছে কোনো টাকা নেই। একটা আইসক্রিম দেবে বাবা?

অসীম একটা দামি কুলফির প্যাকেট ছিঁড়ে বৃদ্ধ মানুষটির হাতে দিতে গেল। আর বলল কেন দেব না দাদু , আপনি আমায় সন্তান তুল্য স্নেহে আবদার করলেন আমি সে আবদার ফেলতে পারি?  

- কিন্তু বাবা , নার্ভের দোষে আমার হাত দুটো খুব কাঁপে। খেতে পারবো কি ভাবছি।

- ও এই ব্যাপার। দাদু তুমি বসো এই বেঞ্চটায়। আমি তোমায় খাইয়ে দিচ্ছি। 


.............  ..................................................

..


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ