নমস্কার বন্ধুরা,
সকলে কেমন আছেন? আশা করি ভালো আছেন। আমি ও খুব ভালো আছি। আজকের দিনের একটা আনন্দময় ঘটনার উপলব্ধি আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরবো আমার এই ব্লগের মাধ্যমে।
আজকের সকাল টা ছিল একটু অন্যরকম এর। কিছুটা উত্তেজনার। আপনারা তো জানেনই বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বন। সেইজন্য গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে প্রতি মাসেই কিছু না কিছু উৎসব লেগেই থাকে। আজ ছিল আমাদের প্রতিবেশী একজন দের বাড়িতে সত্য নারায়ণ পুজো। সেখানেই যাওয়া নিয়ে একটু মানসিক দোটানায় পরেছিলাম। ঘটনাটা বলি,
প্রতিবেশী কাকিমা আগের দিন বাড়ি এসে সত্য নারায়ণ পুজোর নিমন্ত্রণ করে গিয়েছিলেন। বলে গিয়েছিলেন, পুজো দিতে যাবেন এবং প্রসাদ গ্রহণ করবেন। এত দূর পর্যন্ত ভাবতেই পারেন , এটা তো সাধারণ ব্যাপার।
কিন্তু না, এটা এর মধ্যেও একটু টুইস্ট আছে। আসলে বিগত ছয়মাস যাবৎ ওনাদের সাথে আমাদের একটু জটিল পারিবারিক বিবাদ চলছে। কথা বার্তা নেই। এই রকম অবস্থায় নিমন্ত্রণ টা পাওয়া মানে একটু ভাবনার ব্যাপার। কিন্তু এটাও তো ভাবতে হবে , সব কিছুর উর্দ্ধে হচ্ছেন ঈশ্বর। মানুষে মানুষে বিবাদ থাকে। কিন্তু ঈশ্বর এর সাথে তো নয়।
ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তিনি যে ধর্মেরই হন না কেন। তাই তো তারাও এই বিবাদ কে উপেক্ষা করেই সশরীরে বাড়ি এসে নিমন্ত্রণ করে গেছেন। সকাল এ ঘুম থেকে ওঠা মাত্রই মনে পরে গেল। ওনাদের বাড়ি পুজো দিতে যেতে হবে। যে বাড়ির প্রতিটা মানুষ দের সাথে মুখ দেখা দেখি নেই, কথা বার্তা নেই তাদের বাড়ি যাওয়ার কথা ভাবলেই মনের ভিতর হাজার দ্বিধাদ্বন্দ্ব এসে হাজির হলো।
সাতপাঁচ নানারকম ভাবতে ভাবতেই রান্না বান্না শুরু করলাম। কিন্তু মন পরে আছে ঐদিকে। ঘড়ির কাঁটার দিকে বার বার চোখ চলে যাচ্ছে। কারণ ঠাকুর মশাই আসবেন বলেছেন সকাল দশ টায়। তার আগে রান্না সেরে, ঘর দোর মুছে , স্নান সেরে বাড়ির ঠাকুর কে সেবা দিয়ে তারপর যেতে হবে।
এই পারিবারিক বিবাদের কথা ভেবেই শ্বাশুড়ি মা বললেন, ঈশ্বর এর সকলেই সমান। ওনাদের বাড়ির মানুষ গুলোর সাথে আমাদের বিবাদ। কিন্তু ওনার ঘরের ঠাকুর এর সাথে তো নয়। ওনার ঘরে যে ঠাকুর আছে, আমার ঘরেও উনি ই আছেন। তুমি স্নান সেরে ভক্তি ভরে নৈবেদ্য সাজিয়ে পুজো দিয়ে এসো।
সুতরাং স্নান সেরে বাড়ির ঠাকুর কে পুজো দিয়ে রেডি হয়ে নিলাম।
(পুজো তো পাশের বাড়িতেই। তাই এই কটন এর শাড়ি টাই পরে নিলাম। সাথে এই ব্লাউজ টা)
পুজো যেহেতু পাশের বাড়িতেই আমি এই শাড়িটা পড়ে গিয়েছিলাম। শাড়িটা কটন এর। জরি কটন। খুব সফট শাড়িটা। পরেও খুব আরাম। শাড়ি পরে নৈবেদ্য সাজিয়ে নিলাম।
বিশেষ কিছু না। একটা কাঁসার এর রেকাব এ অল্প চাল, ঠোঙায় বাতাসা, কয়েকটা ধূপ আর কয়েকটা ফুল নিলাম। সাথে একটা শসা ও ছিল। আর ছিল দক্ষিণা। আয়োজন অল্প হলেও, আর মনে একটু দ্বিধা থাকলেও ঈশ্বরের জন্য ভক্তি ছিল গভীর। আর সেইটুকু সম্বল করেই বেরিয়ে পরলাম পুজো দিতে ।
( এই হলো পুজোর থালা। চাল, ধূপ, ফুল, ঠোঙায় বাতাসা, আর একটা শসা)
যেতে যেতে ভাবছিলাম ,যে বাড়ির সাথে আমাদের সম্পর্ক টা এতটা তিক্ত এই বাড়িতে যাচ্ছি আজ। কোনো অপ্রীতিকর মুহূর্তের সম্মুখীন হবো না তো? ঈশ্বর তুমি ই সহায়। এই বলতে বলতে ওদের বাড়ি পৌঁছে গেলাম।
( যেতে যেতে পথে তোলা নিজের ছবি)
কিন্তু ওদের চৌকাঠে পা দিতেই আমার মনের সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব এক মিষেই গায়েব হয়ে গেল। চারিদিকের পরিবেশ টা কি সুন্দর। খুব সুন্দর ঠাকুর বাড়ির মতো গন্ধ। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসতেই বাড়ির প্রত্যেক সদস্য ই আমার সাথে ভালো করে কথা বললেন। সুন্দর ভাবে আপ্যায়ন করলেন।
ওনাদের বাড়ির যিনি বয়োজ্যেষ্ঠ ওনার সাথেই আমাদের অশান্তিটা বেশি। কিন্তু ওনার কাছ আজ সবচেয়ে স্নেহসুলভ ব্যবহার পেলাম। উনিই আমায় বললেন, ঠাকুর ঘরটা এদিকে বৌমা। আমার সাথে এসো। দেখিয়ে দিচ্ছি। ঠাকুর ঘরে গিয়ে দেখলাম ঠাকুর মশাই এসে গেছেন।
ঠাকুর ঘর ভর্তি ঠাকুরের আয়োজনে ভর্তি। জোগাড় প্রায় শেষের পথে। এবার ঠাকুর মশাই পুজোয় বসবেন। একদিকে লুচি ভাজা হচ্ছে, সুজি, আলু ভাজা, মালপোয়া, মিষ্টি , ছানা এসব হয়ে গেছে। নারকোল নারুও হয়ে গেছে। একদিকে তখন ও নারকেল কোরা চলছে। সম্ভবত সিন্নিতে দেওয়া হবে । খানিক খন পুজো দেখে বাড়ি ফিরবো বলে উঠলাম।
সবাই বললেন, বসো বৌমা। পুজোটা হয়ে যাক। প্রসাদ নিয়ে যাবে। একটু খেয়ে যাবে। বললাম, আবার একটু পরে আসবো। আরো একটু বাড়ির কাজ সেরে আসি।
ফিরতে ফিরতে মনে হলো পারিবারিক বিবাদ হয়তো একদিনে মেটে না, কিন্তু ঈশ্বরের ভক্তিই দু বাড়িকে যেন আবার কিছুক্ষন এর জন্য এক ছাদের তলায় নিয়ে এসেছিল। মানুষের সাথে মানুষের যে এত ঝগড়া, অশান্তি , অহংকার, জেদ, তেজ , যশ, প্রতিপত্তি সব কিছুর উর্দ্ধে তো ভগবান ই। ওনার কাছে আমরা সবাই সমান।
আজকের দিনটা আমায় অনেক কিছুই শিখিয়ে দিয়ে গেল। সব শেষে ঈশ্বর এর কাছে প্রার্থনা করি আমাদের সকলের মধ্যে যেন শান্তি বিরাজ করে। পারস্পরিক বিবাদ ভুলে আবার যেন ঈশ্বর এর কৃপায় মিলেমিশে থাকতে পারি।
যেহেতু একটু পারিবারিক সমস্যা আছে, তাই ও বাড়ির পুজোর ছবি দিতে পারলাম না। ছবি তুলেছিলাম। কিন্তু পরে ভাবলাম দেওয়াটা ঠিক হবে না। তবে আজকের বেশ কিছু ছবি তুলেছিলাম পুজো দেওয়ার আসা যাওয়ার পথে। সেগুলো ই এই ব্লগে র উপরে দিয়েছি।
আমার আজকের দিনটার মুহূর্ত গুলো আপনাদের কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। আপনাদের ও কখনো এই রকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে? তাহলে আপনাদের অভিজ্ঞতা ও শেয়ার করতে পারেন।
আজ তবে এত টুকুই। আবার ফিরবো আগামী কাল। নতুন কোন ব্লগ এর লেখা নিয়ে । এখন বাজে ঘড়ির কাঁটায় ঠিক বিকেল 5 : 17 মিনিট। এবার ছেলের পড়াশোনার হোম ওয়ার্ক এর ওয়ার্ক সিট রেডি করবো। আজ তবে আসি।




0 মন্তব্যসমূহ