( জয় জগন্নাথ, জয় বলরাম, জয় সুভদ্রা দেবীর জয়)
শিরোনাম : একজন গৃহবধূর স্মৃতিতে রথযাত্রা: নব্বই দশকের রথের আনন্দ বনাম আজকের উপলব্ধি
নমস্কার বন্ধুরা,
সকলে কেমন আছেন? আমি ও বেশ ভালো আছি। ব্লগের প্রথমেই সকলকে জানাই রথ যাত্রার শুভেচ্ছা। ও বড় দের আমার প্রণাম। আজকের ব্লগ টা আমি লিখছি , এখন ঘড়িতে বাজে ঠিক 4: 11 মিনিট। ঘরে একাই আছি।
ছেলের আজ স্কুল ছুটি থাকলেও ও এখন রথ টানতে গেছে। আমাদের এখানে অর্থাৎ আমাদের পাড়াটায় বড় কোন রথ টানা হয় না। মেলাও বসে না। ছোটরা আনন্দ করে রথ সাজিয়ে টানে। ওখানেই অংশ নিতে গেছে। যদিও আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি পরছে। ওকে বললাম বৃষ্টি পড়লে চলে আসতে। ও এই সব বেরোলো। আমি ব্লগ টা লেখা শুরু করলাম।
রোজকার মতোই আজ ও সংসার এর হেশেল , সাংসারিক কাজ থাকলেও আজকের দিনটা কাজ করতে যেন অলসতা লাগে। চারদিক থেকে নস্টালজিয়া ঘিরে ধরে। মনে পড়ে যায় ছেলেবেলা কার কাটানো সময় গুলো।
ছোটবেলার রথের স্মৃতি গুলো ভিড় করে আসে কাজের ফাঁকে। কাজের ও একটু ঘাটতি পরে। তা পড়ুক। আজ তো ছুটির দিন। ঝিমেতালেই কাজ এগোয়। স্মৃতি রোমন্থন থামে না। আজ যেন সেগুলো হাতরেই মনটা অনেক হালকা লাগে।
আমার নব্বই দশকের চেনা শৈশব টা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমি যৌথ পরিবারে মানুষ। বাবারা আট ভাই। সবার উপরি পাওনা হিসাবে আমার মামার বাড়িও আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল। মনে পরে, রথের দিন বড় জেঠু, মেজ জেঠু, সেজ জেঠু, ন জেঠু, রাঙা কাকা, ছোট কাকা সবাই 5 টাকা অথবা দশ টাকা করে দিত।
রথের দিন সকাল হতেই সেই টাকা সংগ্রহ করার জন্য আমি আর আমার জেঠতুতো দিদি বেরিয়ে পড়তাম। সবাই আমাদের ভালোবেসে টাকা দিত। এটা প্রতি বছর ই নিয়ম করে দিতেন তারা। তাই রথ যাত্রার আগে থেকেই আমি আর দিদি ঠিক করে নিতাম এবারে টাকা জমিয়ে কি কি কিনবো।
নব্বই দশকে ৫/ ১০ টাকার মূল্যই অনেক ছিল। ওই টাকা মিলে ১০০/১২৫ টাকা হয়েই যেত। তারপর তো মামাদের থেকেও টাকা নিতাম। আরো বেশি হয়ে যেত। এবার দুপুর তিনটে নাগাদ ছোট রথ টাকে সুন্দর করে সাজাতাম। গাঁদা ফুলের মালা পরিয়ে চিকমিকি কাগজ দিয়ে রথ টাকে আরো আকর্ষণীয় করা হত। তারপর রথের মধ্যে জগন্নাথ , বলরাম, সুভদ্রা দেবীকে বসাতাম।
প্রসাদ হিসাবে রাখা হতো চিড়ে, মুড়কি, বাতাসা, ফলের টুকরো। সব মিশিয়ে সবাইকে দিতাম। সবাই রথ দর্শন করতেন , এবং আমাদের জগন্নাথ দেবকে দক্ষিণা দিতেন। বাড়ির গুরুজনেরা বলতেন, আমায় আর দিদিকে। এই রথ টানলেই পূর্ণ অর্জন হবে। এতে তোমাদের আন্তরিকতা, ও ভক্তি মিশে আছে। স্বয়ং ভগবান এখানেও আছে।
ওনারা বলতেন, একটু পরেই রথের মেলা দেখতে যাবে দুজনে। বাজারের মধ্যে। প্রচুর ভিড় হয়। তাই ওই বড় রথ না টানলেও হবে। দূর থেকে জগন্নাথ কে প্রণাম করে নিও। কিন্তু আমি আর দিদি ঘাড় পেতে তাদের কথা শুনলেও মানতাম না। প্রতি বছরই চেষ্টা করতাম ভিড় ঠেলে ওই বড় রথ টার দড়ি স্পর্শ করতে। এর আনন্দটাই ছিল অন্য লেবেল এর।
আমার বাবার বাড়ি হুগলি জেলার সিঙ্গুর এ। এখনে ও রথ এর মেলা খুব ধুমধাম করে হয়। আমি আর দিদি মেলায় যেতাম ঠিকই। কিন্তু শুধু আমরা দুজন নয়। আমার মামা নিয়ে যেতেন আমাদের। তাই ওই জমানো টাকায় আমাদের হাত ই দিতে হত না। মামাই খেলনা, কিনে দিতেন। আর ওই দিন আমরা কাপ আইসক্রিম খেতাম। তখন কার দিনে এখন কার মতো পিজ্জা, বার্গার, মোমো আসে নি। মেলা মানেই চাউমিন, ফুচকা, এগরোল। এই সবই খেতাম। আর বাড়ি ফেরার পথে জিলিপি, বাদাম এই দুটো অবশ্যই কিনে নিয়ে যেতাম।
আর্থিক অবস্থা আমাদের ওতোটা ভালো ছিল না। রথ উৎসব মিটে যাওয়ার পর ওই জমানো টাকায় কখনো শখের পেন্সিল বক্স টা কিনতাম। কখনো বা চার/ পাঁচ দিস্তা খাতা কিনতাম। যে গুলো খুব দরকারি।
অনেক সব সুখের, আনন্দের কথা আজ মনে পড়ে গেল। লিখতে লিখতে আমিও যেন শৈশব এর স্মৃতি তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বেশ কিছুক্ষণ।
আসলে সময়ের চাকা বড্ড তাড়াতাড়ি ঘুরতে থাকে। আজ আমি গৃহবধূ। ১১বছরের বিবাহিত জীবন আমার। এখনো আজকের দিনে কান পাতলে যৌথ পরিবারের সেই হৈ হুল্লোড়, দিদির সাথে তাল মিলিয়ে টাকা জমানো সব কিছুই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এখনকার রথে আর সেই উত্তেজনা নেই। জীবনের সমীকরণ টা অনেকটা বদলে গেছে। এখন আর ৫/১০ টাকার মায়া কিংবা খেলনা খাওয়ার প্রতি উত্তেজনা নেই।
( এ যেন আমারই অনুকরণ। রথের দিনে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত । অথচ স্মৃতিতে হারিয়ে গেছি শৈশবের রথ যাত্রার দিনটাতে )
আজকের দিনের যে বিশেষত্ব সেটাও যেন ফিকে হয়ে গেছে সংসারের জালে। রথ উৎসব কিংবা অন্য কিছু পালা পার্বন সব দিনেই সাংসারিক কাজের হাল একই থাকে। তাই সংসারের কাজের সাথে সাথেই স্মৃতি রোমন্থন করেই আজকের দিনটা কেটে যায়।
ভাগ্গিস এত সুন্দর রঙিন দিন গুলো আমার অতীতে ছিল। তাই সেগুলোকেই স্মৃতির পাতায় উল্টে পাল্টে নিজেকে কিছুটা রাঙিয়ে নিতে পারি । এখন অনেক বেশি দায়িত্ব আমার । একটা গোটা সংসারের কর্তি আমি। কিন্তু দায়িত্ব অনেক বাড়লেও নিজের অগোচরে কিশোরী সুলভ মন টাকে এখনো জিইয়ে রেখেছি। তাই তো সেসব স্মৃতি এখনো স্মৃতিপটে টাটকা।
যৌথ পরিবার যেমন আমায় ভাগাভাগি করে মিলেমিশে থাকতে শিখিয়েছে, তেমনি সংসার ও আমায় অনেক বেশি কর্তব্যপরায়ণ করেছে। ছোটবেলার সেই প্রাণোচ্ছলতায় পরিপূর্ণ কিশোরী আর এখন কার গুছানো সংসারী আমি টা মিলেমিশে যেন একজন পরিণত নারী হতে পেরেছি।
যাই হোক, আজকের ব্লগটা অনেক বেশি বড় হয়ে গেল। আসলে ডায়েরি লেখা আমার একটা প্যাশন। এখানে সময় কাটাতে আমার বেশ ভালো লাগে। সেই খাতিরেই এত কিছু লেখা জমিয়ে রাখা।
আপনাদের ও কি আমার মতই রথের দিনে ছোটবেলা কার কথা মনে পড়ে? নাকি এখনকার রথ উৎসব টাই বেশি উপভোগ করেন? আমায় জানাতে পারেন অবশ্যই কমেন্ট করে। আজ তবে আসি। দেখা হবে আবার আগামী কাল নতুন কোন অনুভূতি র গল্প নিয়ে। সকলে ভালো থাকবেন।


0 মন্তব্যসমূহ