এইটুকু খাবার ই অনেক ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে বিলাসিতা ( বাস্তব জীবনের ঘটনা/ একজন গৃহবধূর ডায়েরি থেকে)

Bengali-dinner

 

শিরোনাম : এইটুকু  খাবার ই অনেক ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে বিলাসিতা ( মনের গভীরে র লেখা/ একজন গৃহবধূর ডায়েরি থেকে) 



এই যে ছবি টা দিয়েছি দেখেছেন, এটা গত কালের রাতের খাবারের ছবি। ছেলের জন্য তৈরি করেছিলাম। আমার ছেলে আদ্রিত ওকে রোজ ডিনারে দুটো রুটি, ডাল সবজি এইরকম ই দিই। কিন্তু প্রত্যেক দিনই প্রায় এই পর্যায়ে এসে খাবার টা রেখে দেয়। বলে, মা আর খেতে পারছি না। ওর বয়স ৮ বছর।



ছবিটা তুলে রাখার কারণ আছে। জানেন তো, ওকে বোঝাই এইটুকু খাবার এর জন্যই কত শিশু রাস্তায় হাহাকার করছে। ভিক্ষা করছে,  শিশু শ্রমিক হয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। আর ও কি না রোজ এই পরিমাণ খাবার নষ্ট করে।


আমি যখন রাস্তায় বের হই ছোট ছোট ক্ষুধার্ত শিশু দের দেখলে খুব কষ্ট হয়। মনে হয়, এই শিশু গুলো পৃথিবীর রূপ, রস থেকে কত বঞ্চিত। সামান্য একটু খাবার ও ওদের কাছে বিলাসিতা। ওইটুকু রোজকার খাবারের জন্যই হাত পেতে ভিক্ষা করে। আর আমরা বড় বড় হোটেল এ গিয়ে ওই টাকা টিপস দিয়ে চলে আসি।


ছেলেকে বলি জীবনে যদি বাবা, অনেক উপার্জন করিস তাদের জন্য কিছু করিস বাবা, যারা ক্ষুধার্থ, অসহায়, গরিব। জানি , এখনকার দিনে অনেকে বলে , গরিব হয়ে জন্মানো পাপ নয়, সারাজীবন গরিব থাকা টাই পাপ।


আমি সেটা মনে করি না। আমি মনে করি সব মানুষকেই সুযোগ দিতে হয়, সঠিক পরিবেশ দিতে হয়, সুস্থ শরীর দিতে হয়। তবেই সে তার অবস্থান পাল্টাতে সক্ষম হয়। একটা গরিব মানুষ যদি সেই সুযোগ না পায়, সেই সময় না পায় সে কি করে উন্নত হবে বলুন তো?


তার স্বয়ং উদাহরণ আমি নিজে। আমি গরিব ঘরের সন্তান। লেখাপড়া শিখেছি। কিন্তু সেই সুযোগ টা পাই নি। কেউ আমায় সঠিক ভাবে গাইড করে নি। যতটুকু পেরেছি নিজের চেষ্টায়। বাংলায় অনার্স গ্রাজুয়েট। কিন্তু এর বেশি কিছু গতি হয় নি। বিয়ে হয়ে যায়। সংসার করছি। গ্রামে বিয়ে হয়েছে।


নিজে যে কিছু উপার্জন করে , মা বাবার পাশে দাঁড়াবো উপায় নেই। সংসার আমায় বাঁধনে বেঁধে রেখেছে। পরিবারের প্রতিটা মানুষ আমার ওপর ডিপেন্ডেট। আমি দায়িত্ব, কর্তব্য কে পিছনে ফেলে কিছু করার সাহস পাই না। গ্রামের দিকে বাড়ি হওয়ায় কোন হেল্পিং হ্যান্ড নেই। তাই বাড়ির সব কাজ আমায় করতে হয়। ঘরে বসেও যে কিছু উপার্জন করবো তারও সময় নেই।


অজুহাত নয়, যদি বলে অসম্ভব বলে কিছু হয় না। আমি বলবো হয়। আমাদের চাষবাস আছে। যৌথ সংসার। চাষ বাসের এক্সট্রা খাটুনি আছে। ধানের সময় ধান শুকোতে দেওয়া , তোলা, মরাই এ ভরা। আলুর সময় কিসেন হয়। কিষেন এর জন্য আলাদা রান্না বান্না। অনেক কিছু থাকে এক্সট্রা কাজ। এ কাজের হিসাব নেই। সময় হিসাবে করা যায় না। কি করে সম্ভব বলুন তাহলে?


আমার মা, বাবা তাই গরিব। গরিব ই থেকে গেলেন। পারলাম না তাদের পাশে দাঁড়াতে। শুধু তাদের জন্য আমি প্রার্থনা করতে পারি। এর বেশি কিছু নয়। অবশ্য আমার স্বামী আমার মা, বাবার খেয়াল রাখেন। কিন্তু প্রতিটা মা, বাবাই চায় তাদের সন্তান নিজের পায়ে দাঁড়াক। সেটা আর হলো কই। জামাই এর দেয়া অর্থ আর মেয়ের দেয়া অর্থর মধ্যে পার্থক্য আছে বৈকি।


তাই বলি ছেলেকে, খাবার নষ্ট করবি না। দুঃখ, কষ্ট, অভাব আমি দেখেছি। যে সুবিধা গুলো তুই পাচ্ছিস তা সাদরে গ্রহণ কর। নিজের পায়ে ভালো ভাবে দাঁড়া। অনেক টাকা উপার্জন তোকে করতে হবে  বাবা। দুঃস্থ ছেলে মেয়ে দের পড়াশোনায় তাদের হেল্প করবি। গরিব দের পাশে থাকবি। যা আমি পারি নি তাই তোকে করতে হবে।


তাদের জন্য তোকে উপার্জন করতে হবে। আর ভিতরে ভিতরে অনেক বড় মনের মানুষ হতে হবে। যেমন তোর মা লুকিয়ে ভিখারি দের বেশি টাকা দেয়। পারলে লুকিয়ে পুজোর সময় একটা কাপড় দেয়। বর এর পকেট মেরে গরিব শিশুকে পড়াশোনার জন্য পেন্সিল, পেন কিনে দেয়। আমি এটুকুই পারি। তাও অন্যের টাকায়। তোকে ওদের জন্য ভাবতে হবে।


অন্ন কখনো নষ্ট করতে নেই। গ্রামে ঘরে বড় হচ্ছিস সোনা, দেখছিস তো, চাষবাস করতে কত কষ্ট। সবটাই তো নিজের চোখে দেখছিস। আর কি বলবো। ভগবান যদি দিন দেয় কোনোদিন আমাকেও আমিও গরিব মানুষের পাশে থাকব। আমার মা বাবা কেও কিছু দিতে পারব। তাদের ও প্রাণ টা জুড়াবে। 


আজ এত টুকুই। এর বেশি লিখতে পারলাম না। কষ্ট হচ্ছে ভিতর টা। নিজের ব্যর্থতা গুলো আমায় চেপে ধরছে। একটু ইমোশনাল হয়ে গেলাম লিখতে লিখতে। 


আজ এত টুকুই আবার ফিরবো আগামী কাল। নতুন ব্লগ এর লেখা নিয়ে। আজকের লেখাটা আমার মনের কথা। জানি না আমার কথা গুলো কার কেমন লাগলো । কিন্তু খুব মনের গভীরে র কথা গুলো লিখলাম। যা কাউকে মুখে বলতে পারি না ।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ