শিরোনাম : আমার শৈশব কাল ও নব্বই দশকে ফেলে আসা কিছু স্মৃতি: নিজেকে লেখা খোলা চিঠি
আজ লিখতে বসে খুব বেশি করে নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। আজ নিজের মেয়েবেলার সেই কিশোরী চরিত্রটার উদ্দেশ্যেই একটা খোলা চিঠি লিখতে ইচ্ছে হলো। আজকের ব্লগে রইলো আমার মেয়েবেলার কাটানো কিছু স্মৃতিকথা। যা আমার ব্লগ সাইটে আ জীবনের জন্য বন্দি হয়ে রইল। আজকের ব্লগ টা আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমার মেয়েবেলাটা বেঁচে থাকবে এই চিঠির মাধ্যমে।
প্রিয়,
সেই ছোট্ট আমি,
কিরে তোর মনে পরে আজও সেই শৈশবের পার করা দিন গুলোর কথা? কতই না রঙ্গিন ছিল দিন গুলো তাই না? হাতে রঙিন ফোন ছিল না। সোসাল মিডিয়া, ইন্সট্রাগ্রাম এর মত অনলাইন বন্ধু ছিল না। ছিল খাঁটি বন্ধুর একটা দল। যারা সকাল, বিকাল, সন্ধ্যে একসঙ্গে হৈ হুল্লোড় করতো। কি তাই না?
কিন্তু দুঃখের বিষয় ওদের কেও আজ সোসাল নেটওয়ার্ক নিজেদের আয়ত্তে করে নিয়েছে। ওরাও এখন এটার মাধ্যমেই যোগাযোগ সেরে নেয়। কিন্তু শৈশবের কাটানোর দিন গুলোর মতো আত্মিক সম্পর্ক কি আর এর মাধ্যমে হয়? হয় না। সে এক সোনালী মুহূর্ত আমরা উপভোগ করেছি বল?
জীবনের একটা পরিণত বয়সে এসে তোকে চিঠিটা লিখছি। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা চিঠি। দেখ, আমি এখন একজন পরিপূর্ণ মধ্যবয়স্ক মহিলা। একটা দুটো চুল ইতিমধ্যে পাক ধরে গেছে। চোখের নিচে কালি পরে গেছে, মুখের সেই যৌবনের লালিত্বটাও আর নেই। জীবনের এই চরম মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তোকে আজ বারবার ফিরে পেতে ইচ্ছে করছে।
যখন ছোট ছিলাম, ভাবতাম কবে বড় হবো ! মায়ের মতো সুন্দর করে পাঠ ভাঙা কাপড় পরবো। সিঁথি ভর্তি সিঁদুর এ সিঁথি রাঙিয়ে রাখবো। দুহাতে সাদা লাল শাখা পলায় হাত দুটো ঝলমল করবে। একটা মনের মতো জীবনসঙ্গী হবে।
কিন্তু জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে আজ উপলব্ধি করছি, সেই শৈশব, কৈশোর বয়সটাই সবচেয়ে সুন্দর ছিল। না ছিল দায়িত্ব, না ছিল কারো সাথে মনোমালিন্য, ছিল না কোন কিছুর সাথে মানিয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা। ছিল না স্বপ্ন ভঙ্গের অস্থিরতা, কান্না, চাপা কষ্ট। আজ খুব মিস করি রে, সময় গুলো।
ওই সুখের দিন গুলো কত তাড়াতাড়ি কেটে গেল। একদম ছোটবেলা টা তো খেলাধুলা করেই কাটিয়ে দিয়েছি। এখনকার মত এত পড়াশোনার চাপ তো ছিল না। বেসরকারি স্কুলে যেমন পড়ার চাপ এখন বাচ্চারা ঠিক মত খেলতেই পায় না। সেখানে আমরা তো এ পাড়া , ও পাড়া ঘুরে বেড়িয়েছি খুব।
ময়রা দের বাড়ি থেকে, তাল তলা , পুকুর ঘাট , ঘোষে দের কলা বাগান, কোন জায়গা বাদ দিই নি। অবাধ একটা জায়গা ছিল লুকোচুরি, ধরাধরি খেলার। এত খানি জায়গা জুড়ে লুকোচুরি খেললে কারো সাধ্যি আছে চট করে সবাইকে ধরার। খেলতে খেলতেই তো সন্ধ্যা হয়ে যেত।
আমাদের স্কুলের বন্ধু, পাড়ার বন্ধু আলাদা করে এইরকম ব্যাপার ছিল না। আমরা পাড়ার বন্ধুরাই একসঙ্গে স্কুল যেতাম, আবার বাড়ি ফিরে সেই খেলা। সময় ও যায়। দিন ও ফুরায়। বয়স ও বাড়ে। একটা সময়ের পর মেয়েদের শরীর এর পরিবর্তন জানিয়ে দেয় আমরা শৈশব পেরিয়ে কৈশোর এ পৌঁছে গেছি।
এই সময় টা আরো বিপদজনক ছিল কি বলিস? সদ্য প্রেম প্রস্তাব, ভালো লাগা, একবার অন্তত চোখে দেখার টান উফফ ! সেই ফিলিংস গুলোই ছিল অন্যরকম, রোমাঞ্চকর।
তখন বয়স টা ১৫-১৬ কিংবা ১৭-১৮ সেই প্রথম মন দেওয়া নেওয়া, হৃদয় ভাঙা । আবার বন্ধুদের কাছে শেয়ার করে কান্না মোছা, নতুন করে জীবনে আবার পথ চলা... সেই সময় গুলোই বেশ মধুরময় ছিল কি বলিস।
টিফিন এর টাকা জমিয়ে পাড়ার মোড়ে ফুচকা খাওয়ার দিন গুলো । খুব মিস করি সেই সময় গুলো। আবার একটু একটু করে বেশি টাকা জমিয়ে সবাই মিলে রেস্তোরাঁয় যেতিস বল? চাউমিন, এগরোল খেতে?
আর পুজোর সময়কাল এর সেই বাঁধ বাধা আনন্দের কথা! সে কি কখনো ভোলা যায়? মনে আছে দুর্গা পূজার দিন গুলোতে আমরা ভোর বেলায় উঠে রেল স্টেশন এর পাশের শিউলি ফুল গাছ টা থেকে ফুল কুড়োতাম। আচ্ছা, এইভাবে যদি আবার মেয়েবেলাটা কুড়িয়ে নেওয়া যেত! বেশ হতো।
পুজোর সময় কি সুন্দর বন্ধুদের সাথে ম্যাচ করে চুড়িদার পড়া, চুল বাধা, লিপস্টিক, নেলপলিশ কেনা। এক সাথে গিয়ে জুতো কিনতে যাওয়া। আমাদের বন্ধুদের সাথে খুব মিল ছিল বল? আমরা একে অপরের হার কানের সেট চেয়ে পড়তাম। আমাদের মধ্যে কোন হিংসা , মন কষা কষি ছিল না।
আজ জানিস তো ,আমি জীবনের একটা বিশেষ জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে আছি। আজ আমার পরিচয় আমি একজন গৃহবধূ। স্বাবলম্বী হয়ে আর ওঠা হয় নি। সংসারের দায়িত্ব, কর্তব্যের ভিড়ে ১১ টা বছর পেরিয়ে গেছে । তবুও আজও আমার সেই ছোট বেলাটা ভুলতে পারি না। আমার শৈশব, কৈশোর এর স্মৃতি গুলো আমার আজও মন ভালো করার খোরাক। আমার একলা সময়ের সঙ্গী।
সব শেষে একটাই কথা বলতে চাই সেই ছোট বেলাকার হাসিখুশি তুই টা যেন এখনো আমার মধ্যে বেঁচে থাকে। সেই হই হুল্লোড় করা চনমনে কিশোরী টা এখনো আমার মধ্যে বেঁচে থাক। তোর সেই নিষ্পাপ স্মৃতি আর সেই বন্ধন টুকুই আজ ও আমায় সংসার টাকে হাসি খুশি রাখতে সাহায্য করে। বাকি জীবনটাও এই সংসার এর মাঝে সেই কিশোরী সুলভ মন নিয়ে যেন কাটিয়ে দিতে পারি।
ইতি,
তোরই পরিণত রূপ
( আজকের ব্লগটা একটু ইমোশোনাল। আমি জানি আপনারাও ঠিক আমার মতো ছোটবেলার সময় টাকে খুব মিস করেন। আপনারাও চাইলে ছোটবেলাকার কোনো মুহূর্তের কথা আমায় কমেন্ট করে শেয়ার করতে পারেন। দেখবেন মন টা বেশ হালকা লাগছে।)
আজকের ব্লগটা এই পর্যন্তই। আবার ফিরবো নতুন কোন লেখা নিয়ে। আজ তবে আসি।


0 মন্তব্যসমূহ