দরজা দিয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করলেই প্রথমেই ডান দিকে আছে আমার আলমারিটা। এটা আমায় আমার বাবার বাড়ি থেকে বিয়েতে দেয় নি। কারণ অনেক গৃহবধূ দেরই বিয়ের সময় বাবার বাড়ি থেকে আলমারি দেয়। আগে দেওয়া হতো যৌতুক হিসাবে। এখন মেয়ের বাবারা খুশি হয়ে দেন। কেউ আবার দেন না। যাই হোক আমার স্বামী আমার বাবার বাড়ি থেকে কোন অশ্বাবপত্রই নেন নি।
বিয়ের একবছর পর আমার স্বামী নিজের কষ্টের উপার্জন দিয়ে আলমারি টা কিনেছিল। হ্যাঁ, তখন ওর মাহিনা তুলনামূলক ভাবেই কম ছিল। এই আলমারিটা আমার খুব শখের। আমার খুব গর্বের এই আলমারিটা। কারণ আমাদের ঘরের সব আসবাবপত্র ই তখন আমার শশুর মশাই এর কেনা ছিল। সেই প্রথম আমার স্বামী নিজের উপার্জনে একটা বড় কিছু জিনিস কিনেছিল। তাই এই আলমারিটা র প্রতি আমার আবেগ বরাবরই প্রবল।
আমি ওকে দশ টা বছর ধরে রঙিন শাড়ি তে সাজিয়ে তুলেছি। এর সেও পরম যত্নে আমার শাড়ি গুলো আগলে রেখেছে । আমার ছেলের ছোট বেলার অনেক স্মৃতি ও পরম দায়িত্বে সঞ্চয় করে রেখেছে। ছেলের ছোট থেকে বড় হওয়ার কিছু কিছু জামা কাপড় আমি ওর কাছেই নির্ভাবনায় গচ্ছিত রেখেছি। জানি অক্ষত থাকবে ঠিকই। ওর প্রতি আমার এ ভরসা অপরিসীম।
সম্প্রতি ছেলের পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ড গুলোর দায়িত্বও এখন ওর কাছে। তা ছাড়া আমাদের পরিচয় পত্রের নানাবিধ দরকারি জিনিস ও ওকেই সামলাতে দিয়েছি। বছর এর পর বছর ধরে ও তার নিজের দায়িত্ব বিনা অভিযোগে, অনুযোগে পালন করছে।
আমি ওকে বুঝি, আমি জানি ও আমার ঘরের প্রতিটা সদস্য কেই খুব ই আপন ভাবে। তাছাড়া আমরা ছাড়াও তো ওর আর কেউ নেই। আমি ও যতটুকু পারি ওর যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করি। প্রতিদিন নিয়ম করে ওর শরীর মুছিয়ে দিই আলতো করে। আমি খুব খেয়াল রাখি ওর গায়ে যেন এক ফোটাও আঁচড় না লাগে। ধুলো না জমে। জানি ও বলতে পারে না।
ওর সামনে একটা আয়না সেট করা আছে। আমি প্রতিদিন এখানে নিজেকে দেখতে পাই। নিজেকে সাজিয়ে তুলি ওর ই সাহায্যে। আবার যখন খুব কষ্ট হয় আয়নার সামনে দাঁড়াই। আয়নার মাধ্যমে ও যেন আমায় বলে কষ্ট ভুলে আবার নতুন করে নিজেকে সাজাতে। নিজের ভুল ত্রুটি গুলো সংশোধন করে আবার নতুন ভাবে বাঁচতে। ওর জন্যই আমি আবার ভরসা পাই। আবার মনের জোর পাই।
সারাদিনের সংসারের কাজের পর যখন ক্লান্তি তে শরীর টা এলিয়ে আসে, আবার ওর কাছে এসে দাঁড়াই। চাবিটা খুলতেই আলমারির ভিতর থেকে আসা যাক সুগন্ধ আমায় নিমিষেই ক্লান্তি কাটিয়ে দেয়। গোছানো শাড়ি গুলো ঘ্রাণ নিই । ছেলের ছোট বেলার জামা কাপড় গুলো ছুঁয়ে দেখি। যেন ওর ছেলেবেলা য় ফিরে যাই। জামা গুলো কে একটু জড়িয়ে ধরি। আবার সব পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখি। আর আলমারি টাও যেন খুব আনন্দ পায় সারাদিন পর আমি যে ওর কথা মনে রেখেছি। ওকে ছুঁয়েছি সেই জন্য। আলমারির সুগন্ধ যেন আমায় জিজ্ঞেস করে, কি গো গিন্নি?? তোমার সংসার আমি ঠিকঠাক আগলে রাখতে পারি তো?
আমি নীরবে বলি খুব পারছো। তুমি আছো বলেই আমি নিশ্চিন্তে তোমার কাছে সব গচ্ছিত রেখে বাঁচি।আমার সারাদিনের ক্লান্তি যেন এই আলমারি টা এক নিমিষেই উড়িয়ে দেয়। শরীর আবার সতেজ হয়ে ওঠে।
আজকের ব্লগ এত পর্যন্ত ই। আপনার ঘরেও কি এমন কিছু আছে যা আপনাকে নিঃসঙ্গতা থেকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও মুক্তি দেয়? অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন।

0 মন্তব্যসমূহ