- বল, কে তোকে ডাকছে? পাহাড় নাকি সমুদ্র?
- অফিস থেকে আসা মাত্রই অমনি হেয়ালি শুরু করে দিলি তো?
- কোনো হেঁয়ালি করছি না, আমি সিরিয়াসলি ত্বকে জিজ্ঞাসা করছি?
- ছয় মাস বিয়ে হয়ে গেলো...এই ছয়মাসে পাহাড় নাকি সমুদ্র...সমুদ্র নাকি পাহাড়...এই একই প্রশ্ন অনেকবার করেছিস। আমায় ক্ষমা কর। আমি আর তোর প্রশ্নের উত্তর দেবো না। যতবারই হাজার উদ্দীপনা নিয়ে উত্তর দিয়েছি... ততবারই ট্যুর ক্যান্সেল হয়ে গেছে তোর ওই জবের চক্করে। তোর ওই জবটাই জানিস তো আমার সতীন।
- তাই বুঝি? কিন্তু কি করবো বল...আমার তো আর সরকারি চাকরি নয় কিংবা নিজস্ব বিজনেস ও নয়। যে ইচ্ছা মতো কয়েকদিনের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারব। এটা বেসরকারি চাকরি...এখানে ছুটি পাওয়া ভীষণ চাপ। সবই তো জানিস, বুঝিস।
- তবুও আগের বার তো পাক্কা ছুটি কনফ্রম হয়ে গিয়েছিল। তাও তোকে অফিস যেতেই হলো। এতই ইম্পর্ট্যান্ট কাজ তোর। তাই আমি আর আশা করি না রে...কারণ তুই যত বারই ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান ঠিক করিস আমি মনে মনে আকাশ কুসুম অনেক কিছু ভেবে ফেলি। তারপর যখন সেগুলো ফুল ফিল না হয় ভীষণ কষ্ট হয় রে...আগেরবার তো আমি কেনাকাটাও করে ফেলেছিলাম।
- সরি রে...কিন্তু আগেরবারটা বিশ্বাস কর সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল...
- কিন্তু আমাদের ভাগ্যে ছিল না। কি তাই তো?
- ঠিকই বলেছিস। সবই ভাগ্য। এই দেখ না, তুই কত বড়লোক বাড়ির মেয়ে। বিয়ের আগে কত জায়গায় ঘুরেছিস। এমনকি দেশের বাইরেও ঘুরতে গিয়েছিলিস। তোর বাবা তোকে কত জায়গায় ঘুরিয়েছেন। আর আমি হাজব্যান্ড হয়ে এখনো তোকে নিয়ে হানিমুনেই নিয়ে যেতে পারলাম না। একেই বলে বোধহয় ভাগ্য।
- রাজ, ও ভাবে কেনো বলছিস? আমি কি কোনোদিন এই নিয়ে তোর কাছে কোনো অভিযোগ করেছি, ঝগড়া করেছি?
- না ... তা হয়তো করিস নি। কিন্তু নীরবে অনেক মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করেছিস। তোর চোখ দেখলেও আমি তোর মন পড়তে পরি রে...
- ওসব কিছু না...ফালতু না বকে বল...আবার প্ল্যানিং করছিস? ছুটি কি তাহলে পাবি মনে হচ্ছে?
- হ্যাঁ রে ...কনফ্রম ছুটি। আসলে আমিও এই ছুটি নিয়ে এতটাই বিরক্ত হয়ে ছিলাম যে, আর ওসব নিয়ে অফিসে কোনো আলোচনাই করি নি। আমার বস, ঋতব্রত বাবু নিজেই আমায় বললেন আজকে - রাজ তুমি বেশ কয়েকদিনের ছুটি চেয়েছিলে... তখন খুব ইমারজেন্সি ছিল, তাই ক্যান্সেল করতে বাধ্য হয়েছিলাম। তুমি চাইলে পনেরো দিনের ছুটি নিতে পারো। শুধু মেল এ একটা এপ্লিকেশন করে ডেটটা জানিও দিও আমি কনফ্রোম করে দেবো।
- সত্যি বলছিস রাজ? আমরা বেড়াতে যাবো? হানিমুনে যাবো আমরা?
- হ্যা সত্যি টিয়া, আমরা হানিমুনে যাবো। কিন্তু... কিন্তু...
- কিন্তু...কি রাজ?
- কিন্তু ...তোর বাবার মতো ওতো বড় জায়গায় মানে বিদেশে নিয়ে যেতে পারবো না ...
- রাজ... তুই কি আমায় নিয়ে খিল্লি করছিস?
- এমা...খিল্লি কেনো করবো টিয়া? তুই তো বিয়ের আগে থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, বালি ঘুরেছিস।
- তো? তুই যেখানে নিয়ে যাবি আমি সেখানেই খুশি হয়ে যাবো রাজ। আমি শুধু তোর হাতে হাত রেখে ঘুরতে চাই। তোর কাঁধে মাথা রেখে পাহাড় , কিংবা সমুদ্রের মাঝে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত দেখতে চাই।
- টিয়া, আমি তোকে তোর বাবা - মায়ের মতো যত্নে রাখতে পারি না তাই না?
- তুই নিজেই নিজেকে খুব ছোটো ভাবিস জানিস তো...আমি কিংবা আমার পরিবারের কেউ তোকে খারাপ ছেলে ভাবে না।
- আমি জানি, তোর বাবা, মা খুব ভালো মানুষ। তোর বাবা ওতো বড় একটা কারখানার মালিক তবু কত অমায়িক উনি। ধার্মিক ও বটে। নাহলে আমার মতো একটা অতি সাধারণ বেসরকারি চাকুরিজীবী ছেলেকে ভালোবেসেছিস জেনেও খুশি হয়ে মেনে নেয়... সত্যিই আমি তোকে আর তোর পরিবারের সকলকে পেয়ে ভীষণ খুশি। আসলে খুব ছোট বেলাতেই তো মা, বাবাকে হারিয়েছি তাই ...
- থাক...আর বলতে হবে না...শুধু নিজে নিজে বকবক করে...আর নিজেকে কষ্ট দেয়। তোর কষ্ট দেখলে যে আমার চোখে জল আসে বুঝিস না? আমি তো তোর কাছে কোনো অভিযোগ অনুযোগ কিচ্ছু করি না। শুধু তোর জীবনের সবটুকু জায়গার অধিকারী হয়ে থাকতে চাই। কেনো বুঝিস না?
- আছিস তো...আমার জীবনের সবটুকু জুড়ে তুই আছিস। বড় ভয় হয় রে...অনেকে বলে আমি নাকি বামন হয়ে চাঁদ ধরতে গেছি।
- ধুস! বাজে লোকেদের বাজে কথা ছাড়। কোথায় নিয়ে যাবি বল?
- কোথায় যেতে চাস বল, আমার সাধ্য মতো চেষ্টা করবো।
- তাহলে দার্জিলিং চল। ঘুরে আসি।
- আচ্ছা, কাশ্মীর গেলে কেমন হয়?
- কাশ্মীর! ওয়াও! কাশ্মীরে হানিমুন! এটা আমার ড্রিম ছিল জানিস তো...
- তাহলে আমায় এতদিন বলিস নি কেনো? যদি নিয়ে যেতে না পারি তাই তো?
- ধ্যাৎ! স্কুল লাইফে... অনেক ছোটো ছিলাম তখন। ক্লাস এইট কিংবা নাইন। বান্ধবীরা বসে আড্ডা দিতাম, কার কোথায় বিয়ের পর হানিমুন যাওয়ার ইচ্ছে এসব শেয়ার করতাম।
- কি ডেঞ্জারাস মেয়ে রে...ক্লাস এইট, নাইনে হানিমুন যাওয়ার প্ল্যান! ভাবা যায়! বলি কি, তাহলে বাচ্চা নেওয়ার প্ল্যান কবে থেকে করেছিলিস?
- অসভ্য ছেলে একটা...
- তাহলে বল... কাশ্মীর টাই ফাইনাল তো?
- হ্যাঁ...ওটাই ফাইনাল কর। দেখ আগে মেলের টিকিট পাস কি না? কোথাও ঘুরতে যাওয়া নয়... একটার পর একটা বাধার সৃষ্টি হয় ।
- বলছি টিয়া, তোরা কোনোদিন কাশ্মীর যাস নি? মানে তোর মুখে তো আগে শুনিনি তাই জিজ্ঞাসা করছি।
- হ্যাঁ খুব ছোটো বেলায় গেছি। কিছুই আর মনে নেই । তখন আমার পাঁচ কিংবা ছয় বছর বয়স।
- আচ্ছা, তাহলে ওটাই ফাইনাল। কি তাই তো?
- একদম। কবে তাহলে ঠিক করছিস?
- জয়ন্ত দার সাথে কথা বলে টিকিট কনফার্ম করে তোকে বলবো। কালকে।
- ঠিক আছে। তাহলে আমি সব কিছু প্ল্যান করে ফেলি ঘুরতে যাওয়ার?
- হ্যাঁ করে ফেল। আর কেনাকাটাও করে নিবি। যেগুলো অনলাইনে পাবি অর্ডার করে দে। আর লোকাল মার্কেট থেকে যা যা নিতে হবে লিস্ট করে নে। অফিস থেকে ফিরে কয়েকদিন বেরোলেই হয়ে যাবে।
- আমি কিন্তু গুলমার্গে ওই বরফের মধ্যে শিফন শাড়ি পরবো। আগে থেকেই বলে রাখলাম। আমার ভীষণ শখ।
- না ... না ...ওই শখ পূরণ করতে গিয়ে আবার ঠান্ডা লেগে সর্দি, কাশি, জ্বর বাঁধিয়ে বসে থাকলে মহাবিপদ হয়ে যাবে।
- কিচ্ছু হবে না...তুই না...খুব আন রোমান্টিক। ওখানে গিয়ে অনেকেই শাড়ি পরে ছবি তোলে, রিলস করে। এখন এটাই ট্রেন্ডিং। বুঝলি...তুই তো মাথা মোটা। কিছুই বুঝিস না।
- হানিমুন করবি নাকি রিলস করবি আগে ঠিক করে নে।
- দুটোই করব।
- আচ্ছা ঠিক আছে।
- তুই হ্যাপি তো? তাহলেই আমি হ্যাপি। আচ্ছা কাশ্মীরে কি কি মেন মেন জায়গা আছে সব ইউটিউব দেখে মনে রাখিস। আমি তো অতো কিছু জানি না। আর সার্চ করে দেখার সময় পাবো না।
- সে সব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। বলছি, টিউলিপ গার্ডেন এ পড়ার জন্য একটা গাউন কিনব। ফ্লোরাল প্রিন্ট। ওখানে এই আউট ফিট টা দারুণ লাগবে বল?
- হ্যাঁ, ওখানে আছে কাশ্মীরের সৌন্দর্য টিউলিপ গার্ডেন। আর আমার ঘরের টিউলিপ টাও সেখানে গিয়ে তার সৌদর্য্য ছড়াবে। দুটোর রূপ মিক্স করে যখন ক্যামেরা বন্দি করবো তখন ফিলিংস টাই আমার দারুণ লাগবে।
- মরে যাই... মরে যাই....কি সোহাগ রে বাবা...
- দশটা নয়...পাঁচটা নয়...আমার একটা মাত্র সুন্দরী বৌ । আমি তো তার তারিফ করবই করব।
- আচ্ছা, অনেক হয়েছে মশাই। এবার খেতে চলো। রাত হলো।
- এই তোর মুখে তুমি সম্বোধন টা খুব ভালো লাগে শুনতে ।
- আচ্ছা, কয়েক বছর পর থেকে বলবো। এখন এটাই অভ্যাস হয়ে আছে। ছাড়তে দেরি হবে।
- চল, খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ি। আর কাশ্মীর ট্যুর এর প্ল্যান করি।
- দারুণ আইডিয়া।
সমাপ্ত
0 মন্তব্যসমূহ