অন্ধকার জীবনের প্রতিকূলতাকে জয় করে আলোয় ফিরে আসার গল্প

 - কি রে রূপালী কত বড় হয়ে গেছিস , কেমন আছিস রে?


- ভালো। তুমি ভালো আছো?


- হ্যাঁ রে ভালো আছি। আর ভালো আছি বলেই তো এত বছর পর তোদের বাড়ি আসতে পারলাম। কিন্তু তুই সত্যি করে বল তো আমায় চিনতে পারছিস কি না? আমি কে বল তো?


- হ্যাঁ পারছি চিনতে। তুমি তো মিনু পিসি। 


- একদম ঠিক বলেছিস। তোকে তো সেই কত টুকু দেখেছিলাম। শেষ দেখেছিলাম তোর পাঁচ বছরের জন্মদিনে। বৌদির থেকে শুনলাম এখন তুই কলেজে পড়িস। আমায় কি করে মনে আছে তাহলে তোর? ওতো ছোটবেলায় দেখেছিলিস ঠিক মনে রেখেছিস তাহলে।


- আমি তো ছবিতে তোমায় দেখেছি অনেকবার। তাই চিনতে পারলাম। তুমি আগের মতোই এখনো ওতো টাই সুন্দরী আছো। এতগুলো বছরের পরেও তোমার তেমন একটা পরিবর্তন হয় নি। 


- সত্যি বলছিস?


-হ্যাঁ গো মিনু পিসি। বরঞ্চ আগের থেকে তোমায় আরো বেশি ইয়ং লাগছে। স্টাইলিস্ট ও লাগছে। তুমি সেই থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছো। বসো এখানে।


- হ্যাঁ বসছি। তুই কোন কলজে পড়ছিস তাহলে?


- এই তো উত্তরপাড়া কলেজে। 


- বাহ্ ভালো। বাড়ির কাছাকাছি কলেজে ভর্তি হওয়াই ভালো। যাতায়াতে নাহলে অনেকটা সময় চলে যায়। তা পাশ কোর্সে পড়ছিস না কি অনার্স?


- অনার্স এই পড়ি। বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ছি। 


- ভীষণ ভালো। খুব ভালো সিদ্ধান্ত এটা। 


- কিন্তু আমার ইচ্ছাটা সকলের ভালো লাগে নি। সবাই আমার বিরুদ্ধে। আমি শুধু নিজের জেদের বশেই পড়ছি। এ বাড়ির  কারো ইচ্ছা নেই যে আমি বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ি। 


- সে কি কথা? বাংলা সাবজেক্ট টা কি খারাপ নাকি? 


- সেটাই আমি বড়ো দের বোঝাতে গিয়ে এখনও হিমশিম খাচ্ছি। তুমি আমার কথা বাদ দাও। তোমার কি খবর বলো ? এত বছর পর এলে । আজ শুধু তোমার গল্প শুনবো। আর একসাথে অনেক অনেক মজা করব। 


- আমার গল্প শুনবি? তাহলে তো একটা বিরাট উপন্যাস শোনার মতো তোকে ধৈর্য রাখতে হবে। উপন্যাসের অর্ধেকটা অংশ জুড়ে আছে শুধুই দুঃখ, কষ্ট, নির্মম অত্যাচার আর সমাজের অন্ধকার দিকের ঘটনার প্রবাহ আর অন্যদিকে আছে তীব্র লড়াই, ফিনিশ পাখির মতো ছাই থেকে উঠে এসে নিজেকে পুনর্জন্ম দেওয়ার এক অলীক বর্ণনা।


- আমি জানি মিনু পিসি, তোমার অতীতটা খুব যন্ত্রণা দায়ক, ভয়ঙ্কর। বাড়ির বড়দের মুখে, কানাঘুষায়, কিছুটা তাদের কথা বার্তা, আলোচনার  হাবভাবে অল্প অল্প আঁচ করতে পারতাম। কিন্তু এখন আমি বড়ো হয়েছি। বোঝার মতো ক্ষমতা হয়েছে। আর তুমি যখন সশরীরে আমার সামনে আছো তখন তোমার যদি আপত্তি না থাকে আমি তোমার জীবনের সুখ দুঃখ মেশানো পুরো কাহিনিই শুনতে চাই। 


- বড়ই অদ্ভুত রে আমার জীবনটা। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই আমার জীবনটা বরাবরই খুব সাদামাটা, সরল , সাধারণ হতে পারতো। কিন্তু আমার প্রথম জীবনের কষ্টের দায় শুধুমাত্র আমারই। সে কলঙ্ক আমায় সারাজীবনই বয়ে বেড়াতে হবে। যা সত্যি তাকে তো ছাই দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না। তাই না?


- মিনু পিসি  যে অপবাদের তকমা তোমার গায়ে লেগেছিল তুমি তা নিজের পরিশ্রম, অধ্যবসায়, জেদ, অসীম সাহস দিয়ে তা মুছে ফেলেছ। সময় তোমাকে আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি সোনা তৈরি করেছে। তুমি এখন শুধু এই পাড়ার কেন আমাদের দেশের একটি উজ্জ্বল মুখ। তুমি সমস্ত নারী জাতির ইমপ্রেশন। তোমার অতীত

হয়তো গুটি কয়েক লোক জানে। কিন্তু একটা গোটা সমাজ তোমায় চেনে আই এ এস মিনু সান্যাল নামে। তুমি এখন আমাদের দেশের গর্ব। তুমি পেরেছো মিনু পিসি, তুমি একটা গোটা সমাজের কাছে দৃষ্টান্ত। তুমিই বুঝিয়ে দিলে একটা প্রজন্মকে এভাবেও ফিরে আসা যায়। এখন তোমার সাথে দেখো সবাই আছে। কিন্তু তোমার বিপদের সময় কেউ তোমার পাশে ছিল না। এটাই জেনারেশন, এটাই যেন এখন সমাজের নিয়ম হয়ে গেছে।


- তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস রে রূপালী। তোর বয়সের থেকেও তোর বুদ্ধিমত্তা, মেন্টালিটি অনেক বেশি ম্যাচিওর। আমার দুঃখের দিন গুলোতে আমার পরিবারের কাউকে আমি পাশে পাই নি। কিন্তু তোরা তো আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ নয়। তবুও তোর বাবা, মা  যদি আমায় সাহায্য না করত আমি কখনোই এত বড় জায়গায় পৌঁছাতে পারতাম না। আসলে তুই তো জানিস ই আমাদের পরিবারটা একদমই স্বচ্ছল ছিল না। বাবা দিন মজুরের কাজ করতেন। সমাজকে উপেক্ষা করে তারা হয়তো আমার মতো পোড়ামুখিকে বাড়িতে আনতে পারে নি। আসলে অর্থ না থাকলে সমাজে মানুষের কদর ও থাকে না। এটা আমি আমার জীবন দিয়ে বুঝে গেছি। কিন্তু প্রতিবেশী হয়েও তোরা আমার জন্য যা করেছিস তা কখনো ভোলার নয়।


- আজকের এই খুশির দিনে তোমার থেকে বেশি কিছু জানতে চাইব না। কারণ তোমার লড়াইয়ের দিনগুলোর কিছু কিছু মুহূর্ত আমি বড়দের আলোচনা থেকে কিছু হলেও বুঝতে পারতাম। কিন্তু অন্ধকার দিকটার ভয়াবহ রূপটা আমি জানি না। তখন অনেক ছোট ছিলাম । আজ যদি সংক্ষিপ্ত ভাবেও বলতে...


- আমার তখন সদ্য চৌদ্দ বছর বয়স। নাইনে পড়ি। অল্প বয়সে বড্ড বেশি পেকে গিয়েছিলাম। প্রেমে পড়লাম। পাড়ারই একটা বেকার ছেলের। ঐ বয়সেই স্কুল না গিয়ে পার্কে , রেস্টুরেন্টে, সিনেমা হলে। প্রথম ছয়মাস এভাবেই কেটে গেল। তারপর এরই মাঝে আমরা ঠিক করলাম বিয়ে করে নেব। সর্ম্পকটা বেশিদিনের ছিল না। তবু আমি ওকে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তখন ঐ ছেলেটা যা বলতো সেগুলোই বেদবাক্যের মত পালন করতাম। মা, বাবা পরিবারের কারো কথা না ভেবেই একদিন স্কুল যাওয়ার নাম করে ওর সাথে পালিয়ে গেলাম। আমাদের সম্পর্কটা যেহেতু মাত্র ছয়মাসের ছিল তাই কেউ টের ও পেল না। ছেলেটা আমায় আমাদের এখান থেকে অনেকদূর ট্রেনে করে নিয়ে গিয়ে একটা মন্দিরে বিয়ে করে। সম্ভবত জায়গাটার নাম ক্যানিং। তারপর সেখান থেকে আমরা কলকাতা ফিরে আসি। একটা হোটেল ভাড়া নিয়ে ওখানে পাঁচদিন আমায় রেখে দেয় বিশ্বাসঘাতকটা। আমায় বলেছিল এখানে কয়েকদিন থেকে ওদিক কার অবস্থা একটু থিতু হলেই আমরা আবার ফিরে যাব। তখন তো মোবাইলের রমরমা ছিল না। তাই ঐ বয়সে আমার কোনো পার্সোনাল ফোন ছিল না। আবেগের বশে হুট করে তড়িঘড়ি বিয়ে করে মনের মধ্যে অজানা ভয় আর আতঙ্ক তখন আস্তে আস্তে আমায় ঘিরে ধরছিল। আর সেইসময় থেকেই আমার জীবনে অন্ধকার অধ্যায়ের শুরু হল। 


- তারপর কি হল মিনুপিসি?


- তারপর কলকাতার হোটেলের যেদিন শেষদিন ছিলাম সেদিন রাতে ঐ নরপিশাচটা আরো চারজন নরখাদক কে নিয়ে আমার শরীরটা সারারাত ধরে ভোগ করলো। আমার ওপর পশুর মতো অত্যাচার করল। আমার চৌদ্দ বছরের নরম শরীরটাকে নৃশংস ভাবে ক্ষত করল। এবং পরের দিন আমায় নরপিশাচটা বিক্রি করে দিল এক দেহব্যবসায়ীর কাছে। তারপর তিনটে বছর আমার সেই অন্ধকার রেডলাইট এলাকাতেই দিন কেটেছে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে।


- উফ! কি সাংঘাতিক। আমি আর শুনতে পারছি না। আমার সারা শরীর যেন কাঁপছে মিনু পিসি তোমার এই করুন অত্যাচারের কাহিনী শুনে। কি নির্মম কষ্ট, অত্যাচার তুমি সহ্য করেছো। 


- দিনের পর দিন রাতের পর রাত শরীরের মারাত্মক জ্বালা, কষ্ট সইতে সইতে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা কত বার মনে হয়েছে। কত বার নিজের বাড়ির কথা মনে পড়েছে। অনেকবার চেয়েছি যোগাযোগ করতে কিন্তু পারি নি। প্রথম প্রথম তো বুঝতেই পারতাম না  জায়গাটার নাম কি। মানে যেখানে আমায় রেখে ওরা আমায় দিয়ে দেহ ব্যবসা করিয়েছে। পরে জানতে পারলাম আমায় মুম্বাই আনা হয়েছে। আসলে যখন আমায় তারা ওখানে এনেছিল সম্ভবত খাবারের সাথে কোন মেডিসিন দিয়ে আমায় অজ্ঞান করে এনেছিল।একদিন একজন সহকর্মীর কাষ্টমারের ফোন চুরি করে বাড়িতে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। আমার সব কিছু বৃত্তান্ত জেনে তারা ঐ অন্ধকার কূপ থেকে আমায় ফিরিয়ে আনার খুব বেশি চেষ্টা করে নি। কয়েকবার থানায় গিয়েছিল। এই পর্যন্তই। তারপর তো জানলাম তোর বাবা মানে সন্তোষ কাকুর উদ্যোগে আমি ওখান থেকে বেরোতে পারি। উনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দিনের পর দিন যোগাযোগ রেখে চিঠি লিখে যদি সঠিক ইনভেস্টিগেশন না করতেন আজকের দিনটা আমার জীবনে আর আসতো না রে।


- ওসব দিনগুলোর কথা তুমি ভুলে যাও মিনুপিসি।


- সব কিছুই কি আর সহজে ভুলে যাওয়া যায় বল? 


- তা ঠিক। যার জীবনে এমন ঘটনা ঘটে একমাত্র সেই বুঝবে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, প্যাথেটিক। আর তোমার সুখের দিন গুলোর কথা একটু বলো শুনি?


- সুখের দিন গুলো ছুঁতে আমায় অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে রে। তোর বাবার উদ্যোগে কলকাতা পুলিশ আমায় মুম্বাই থেকে উদ্ধার করে হোমে পাঠায়। সেখানে আবার নতুন করে পুনর্জন্ম হয় আমার। আমি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করি। জীবনটাকে আবার নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। তোর বাবাও আমায় অনেক সাহায্য করেছেন এইসময়। কলেজে ভর্তি হই। দিন রাত এক করে পরিশ্রম করে আজকে আমার এত বড় সফলতা। হ্যাঁ আমি আজ আই এ এস অফিসার মিনু সান্যাল। নিজেকে পুড়িয়ে আমি খাঁটি সোনা হতে পেরেছি।


- মানুষ তোমায় নিয়ে এখন গর্ব করে মিনু পিসি। তোমার অতীত এখন আর কারো মনে নেই। সবাই বলে আই এ এস অফিসার মিনু সান্যাল এ পড়ারই মেয়ে। আমাদের গ্রামের গর্ব তুমি।


- লোকে অনেক কথাই বলবে। ভালো মন্দ অনেক কিছু। লোক শুধু সফল মানুষ গুলোকে দেখে। কিন্তু তাদের ব্যর্থতা, কষ্ট, পরিশ্রম গুলোকে দেখতে পায় না। তোকেও বলছি যে বিষয় ভালো লাগে সেটাই মন দিয়ে পড়। এতেই তোর সাফল্য নিশ্চিত। আমার বিশ্বাস তুই ও একদিন বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করে অনেক বড় মাপের মানুষ হবি। হতে তোকে হবেই।


সমাপ্ত





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ