একটি সুন্দর মুহূর্ত : একটি সন্ধ্যাবেলার দৃশ্য

 - মা কি করছো? আমি কি কিছু হেল্প করতে পারি তোমায়?


- ওমা, বৌমা... তুমি এখন সন্ধ্যে বেলা রান্নাঘরে কেনো এলে? বাবুর সাথে ল্যাপটপে বসে কি সব করছিলে তো দেখে এলাম। তুমি যাও। আমি করে নেবো। 


- না মা, তেমন কাজের কিছু নয়। আমাদের বিয়ের ছবি গুলো সিলেক্ট করছিলাম। দুজনে বসে। ফ্রেশ ছবি গুলো রেখে বাকি সব ডিলিট করে দিচ্ছিলাম। 


- ও আচ্ছা। করো তাহলে। আমার আধ ঘণ্টার মধ্যেই রাতের খাবার হয়ে যাবে। 


- মা ,সন্ধ্যা বেলাতেই তুমি রাতের রান্না করে নাও?


- হ্যাঁ গো। সন্ধ্যেবেলার টুকিটাকি রান্না সাথে রাতের টাও একেবারে করে নিলে আমার সুবিধা হয়। একে বারে রান্না ঘরের কাজ মিটিয়ে ঘরে একটু বসতে পারি। তুমিতো সবে এক সপ্তাহ হলো এই বাড়িতে এসেছো আমার বাড়ির লক্ষ্মী হয়ে। তাই হয়তো সংসারের এইসমস্ত কাজ অতটা লক্ষ্য করো নি। 


- হ্যাঁ মা, এই কয়েকদিনে আমার একবারও রান্না ঘরে আসা হয় নি। তাই...


- সে ঠিক আছে। তোমারা একসঙ্গে একটু সময় কাটাও।   রান্নাঘরের কাজ সামলানোর সময় তোমার এখন নয়। আমি যতদিন পারব করব। তারপর যখন তোমার সময় আসবে তুমি তোমার মতো করবে কেমন? 


- আমার যেসব বান্ধবীদের বিয়ে হয়েছে তারা বলে শাশুড়ি মায়ের সাথে  দুজনে মিলেমিশে রান্না করার মজাটাই আলাদা। 


- তাই নাকি? ভারী গুণী মেয়ে তো তোমার বান্ধবীরা। হ্যাঁ, তারা কথাটা ঠিকই বলে। 


- তাহলে মা, আজকে আমরাও দুজনে মিলে রান্নাটা করি। আমি কিন্তু প্রথমেই বলে দিলাম আমি সব রান্না পারি না। কিছু কিছু পারি। তারপরটা তুমি হাতে ধরে আমায় শিখিয়ে পড়িয়ে নেবে। আমি কিন্তু স্টুডেন্ট হিসেবে খুব বাধ্য। 


- আচ্ছা, ঠিক আছে। সময় মতো সব কিছু শিখিয়ে দেব। এখন এত বেশি কাজ তোমায় করতে হবে না।


- তুমি বলো মা, এখন কি করব? 


- আটা মাখতে পারবে?


-হ্যাঁ পারব। কিন্তু সবসময় পারফেক্ট মাখতে পারি না। আসলে বাবার বাড়িতে মাঝে মাঝে মাখতাম মা যখন থাকতো না বাড়ি। ঐ জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালিয়ে দিতাম। 


- জোড়াতালি দিয়ে মানে?


- এই রে...কি বলতে গেলাম আর মুখ ফসকে কি সব কথা বেরিয়ে গেলো।


- কি হলো বৌমা বিড়বিড় করে কি বলছো?


- না মা কিছু না। আমি বলতে চাইলাম কি...


- অতো আমতা আমতা করছো কেন? কি হলো আবার?


- মা যখন হয়তো মামার বাড়ি যেতেন কিংবা কোন কারণে বাড়ি না থাকলে আমি যাহোক করে মোটামুটি ভাবে আটা মেখে, যেমন খুশি তাওয়াতে শিকে নিতাম। রুটি তো গোল হতই না। তাই পুরো ব্যাপারটা জোড়াতালি দিয়ে কাজ সারা নয় তো কি বলো?


- ওহ...এই ব্যাপার? সে তো প্রথম প্রথম সবাইয়েরই রুটি গোল হয় না। প্রতিদিন করতে করতে প্রাকটিস হয়ে গেলেই দেখবে খুব সুন্দর রুটি গোল হবে। আমিও তো বিয়ের পর প্রথম প্রথম ভালো পারতাম না। আমার শাশুড়ি মাই আমায় সব কিছু শিখিয়েছেন। সাবেকি সব রকমারি রান্নার হাতেখড়ি আমার ওনার থেকেই শেখা। এখন তো সোস্যাল মিডিয়ার দৌলতে যখন যে রান্নার রেসিপির দরকার পরে সার্চ করলেই ভিডিও পেয়ে যাই। কিন্তু তখনকার দিনে বড়রা হাতে ধরে রান্না শিখিয়ে দিতেন। 


- বাহ! তুমি কিন্তু মা ভীষণ লাকি ছিলে কি বলো? তোমার শাশুড়ি মা ভীষণ ভালো ছিলেন। 


- তাহলে আমি কি ভালো শাশুড়ি নয়?


- এমা, আমি কি তা বলেছি নাকি। তুমিও খুব ভালো। আসলে আগেকার দিনের গল্প কথায় শুনেছিলাম শাশুড়ি মায়েরা বৌমা দের একটু কড়া শাসনে রাখতেন। সেই জন্য বলছি। 


-আমায় অবশ্য আমার শাশুড়ি মা কোনদিনই শাসনে রাখেন নি। বরং ডানা মেলে ওড়ার সাহস দিতেন। নিজের ভালো লাগা গুলোকে চর্চায় রাখতে বলতেন। 


- দারুণ তো। মা, তুমি আগে বলো  কত বাটি আটা লাগবে । আমি আটা মাখতে মাখতে তোমার পুরোনো দিনের গল্প গুলো শুনবো।


- আমাদের রাতের খাবারের জন্য এই ছোটো বাটির তিন বাটি আটা লাগে। মোট চৌদ্দটা মতো রুটি হয় রাতে।


-আচ্ছা, মাপটা মনে থাকবে আমার। তারপর বলো, তোমার কি কি হবি ছিল?


- আমি বরাবরই গল্পবই পড়তে ভীষণ ভালোবাসি। তাই সংসারের কাজ গুছিয়ে গল্প বই পড়তাম। 


- গল্প সংকলন নাকি উপন্যাস কবিতা সব কিছুই?


- হ্যাঁ, সব কিছুই ভালো লাগে পড়তে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ। আমি অনেক বই পড়েছি। এখনো পড়ি।


- হুম। আমাদের স্টাডি রুমটায় তো দেখেছি  দুই আলমারি ভর্তি বইয়ে একদম ঠাসা। এত বই সব তুমি পড়েছ মা?


- হুম ওখানে যা বই আছে সবই আমার পড়া হয়ে গেছে। আরো বই আছে সেগুলো আমি স্টোর রুমে রেখে এসেছি। আলমারিতে আর জায়গা নেই।


- ও বাবা! তাহলে তুমি তো দেখছি ভীষণ বই পোকা। ওগুলো যখন রাখার জায়গা নেই বিক্রি করে দাও নি কেন?


- বই বিক্রি করতে মন চায় না। তাই স্টোর রুমে বোঝাই করে রেখেছি। 


- আচ্ছা এবার বুঝতে পেরেছি তুমি কেন তাড়াতাড়ি রাতের কাজ সেরে ফেলতে চাও।


- কেন?


- হাতের কাজ গুলো হয়ে যাওয়ার পর যাতে একটু সময় পাও বই পড়ার জন্য। কি তাই তো?


- তুমি ঠিকই বলেছ। এটা আমার বহু পুরোনো অভ্যাস। সংসারের কাজ বজায় রেখে আমি এইভাবেই নিজের জন্য একটু সময় বের করে নিই।


- তাহলে আজ থেকে তোমার রান্না ঘরে সন্ধ্যা বেলা আসতে হবে না ।


- না না এখন থেকেই তোমায় পাকা গিন্নির মতো সব কাজের দায়িত্ব নিতে হবে না। 


- তুমি এত বছর ধরে অনেক করেছ। এবার আমি একটু তোমায় বেশিক্ষণ টাইম সেভ করে দিতে চাই। এবার বলো বেলন, চাকি কোথায়?


- তুমি আটা মেখে দিয়েছো এতেই আমার অনেকটা কাজ এগিয়ে গেছে। এবার তুমি ঘরে গিয়ে বসো। আমি চট করে রুটিটা করেই তোমাদের জন্য চা করে নিয়ে যাচ্ছি। 


- তুমি আগে বলো বেলন চাকি টা কোথায়?


- এ তো দেখছি নাছোড় বান্দা। ঐ যে ওপরের তাকে আছে। আমি নামিয়ে দিচ্ছি। 


- না তুমি বসো। আমি নামিয়ে নিতে পারবো। আমার কিন্তু রুটি খুব একটা গোল হয় না আগেই বলেছি। এইরকমই কিন্তু তোমাদের খেতে হবে। একটু কয়েকটা দিন মানিয়ে নিও। ধীরে ধীরে আশা করছি ঠিক করতে পারব।


- আচ্ছা ঠিক আছে গো। অসুবিধা নেই। তুমি আজ রুটি করেছ জানলে তোমার শ্বশুর মশাই খুব তৃপ্তি করে খাবে। 


- তোমার ছেলেকেও বলে দেবে মা, সে যেন আমার রুটির সেপ দেখে হাসাহাসি না করে।


- আচ্ছা গো। ও যদি কিছু বলে আমি ওর কানটা মুলে দেব।


- তাহলে তো বেশ হবে। আমার খুব মজা হবে।


- বলি কি বৌমা, আমার একটা কথা শুনবে?


- হ্যাঁ বলো মা।


- আজকে তুমি আটা বেলে দাও। আমি শিকে নিচ্ছি। আগামী কাল থেকে না হয় তুমিই সবটা সামলাবে।


- কিন্তু মা...


- কোনো কিন্তু না। বড়ো দের কথা শুনতে হয়। 


-  ঠিক আছে। কাল থেকে কিন্তু আমিই সবটা করব।


- পাগলী একটা।

- না, তুমি আগে কথা দাও আমিই কাল থেকে ডিনারের সব রান্না করব তো?


- হুমম। কথা দিলাম করবে। 


- তোমার রুটি গুলো খুব সুন্দর ফুলছে তো।

- আটা ভালো করে মাখা হলে রুটি তো ফুলবেই। তোমার আটা মাখাটা খুব ভালো হয়েছে। 

- সত্যিই?

- হ্যাঁ গো।

- আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে।

- আমি এবার চায়ের জল চাপাচ্ছি। তুমি সবাইকে চা গুলো পরিবেশন করে দিও। তোমার শ্বশুর মশাই এই সময় স্টাডি রুমেই থাকেন। ওখানে দিয়ে আসবে। কেমন?

- আচ্ছা মা। তুমি তাহলে আমাদের সাথে বিয়ের ছবি গুলো দেখতে দেখতে চা খাবে চলো।


- আচ্ছা চলো।


সমাপ্ত



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ