- বলছি, একটু সরে বসবেন?
- (ফোন থেকে চোখ সরিয়ে হাসি মুখে) হ্যাঁ, অবশ্যই। বসুন।
- ধন্যবাদ। আচ্ছা, এটা তারকেশ্বর লোকালই তো?
- হমম।
- আসলে আমি ছুটতে ছুটতে এসে ট্রেনে উঠলাম তো। তাই আর একবার শিওর হয়ে নিলাম।
- কোনো ব্যাপার না। ঠিক আছে। এইরকম ডাউট তো হতেই পারে। তাছাড়া আপনি এখনো খুব হাপাচ্ছেন। একটু জল খান। সাথে আছে নাকি দেবো?
- হ্যাঁ আছে। খাচ্ছি।
ট্রেন চলতে শুরু করে দিল। মিনা ব্যাগ থেকে বোতল টা বের করে এক নিশ্বাসে অনেকটা জল খেয়ে নিল। অপরদিকে ভদ্রমহিলাটি আবার ফোনে মনোনিবেশ করলেন। বেশ কিছুক্ষণ মিনা চোখ বুজে জিরিয়ে নিল। প্রায় মিনিট পনেরো পর চোখ খুলে দেখল ট্রেন অলরেডি দুটি স্টেশন পেরিয়ে গেছে। সুতরাং নিত্যযাত্রীর ভিড় টাও বেড়েছে। মিনার শরীরটা এখন বেশ আগের থেকে ফুরফুরে হয়েছে। বেশ কৌতুহল সুরেই মিনা পাশে বসে থাকা সেই ভদ্রমহিলাটিকে জিজ্ঞাসা করল,
- আপনি কোথায় নামবেন?
- সিঙ্গুর। আপনি?
- ওহ! তাই নাকি ? আমিও তো সিঙ্গুরেই যাবো। আমার মামার বাড়ি ।
- আচ্ছা
- আপনার কি ওখানেই বাড়ি?
- হ্যাঁ
- আপনি কি কোনো জব করেন?
- হমম। আমি একজন স্কুল টিচার।
- বাহ! ব্রাইট ফিউচার। স্কুল টিচার দের চাকরি এমনিতেই বেশ আরামের। টেনশন ফ্রি। আর ছুটিও পাওয়া যায় ভালো। কি তাই না?
- খানিক টা ঠিক বলেছেন। কিন্তু পুরোটা নয়। আসলে বাইরে থেকে দেখলে ওইরকম মনে হয়। আমি একজন প্রাইমারির স্কুল টিচার। বাচ্চাদের ধৈর্য সহকারে পড়ানো, বোঝানো এগুলো বেশ কঠিনই ব্যাপার। তাদেরকে শেখাতে গেলে তাদের মধ্যে সম্পূর্ণ মিশে যেতে হয়। এরা তো আর কলেজ স্টুডেন্ট নয় যে, নোটস দিয়ে দিলেও হবে।
- হ্যাঁ, তা আপনি ঠিকই বলেছেন। আমার ভাইপো টাকে তো আমি বাড়িতে পড়াই। ক্লাস টু এ পড়ে। উফফ! কি সাংঘাতিক যে বদমাইশি করে ধারণা করতে পারবেন না। পড়াতে বসলেই একবার বলবে টয়লেট পেয়েছে, টয়লেট যাব। টয়লেট থেকে ফিরেই ফের বলবে জল খাবো। ইচ্ছা করে অনেকটা করে জল খাবে। আবার মিনিট দশেক পরেই বলবে টয়লেট যাব। কি বিচ্ছু বদমাইশ। আমি তো মাঝে মাঝে ধৈর্য্যহারা হয়ে গিয়ে কানটা ধরে মুলেও দিই।
- ওরা বদমাইশি করবে না তো আর কারা করবে বলুন তো? এটাই তো ওদের জীবনের সবচেয়ে সেরা সময়। এখন কোনো ক্যারিয়ারের চাপ নেই, বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ঢের দেরি। আসছে দিন গুলো ওদের এমনিতেই অনেক নানা কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। বছর পাঁচেক না হয় একটু হেসে খেলেই ওরা বড় হোক। পড়াশোনা তো সাথে আছেই। দেখবেন বাচ্চারা যতটুকু মনোযোগ দিয়ে শেখে সে টুকু ওরা খুব ভালো ভাবে মনে রাখে। জোর করে, চাপ দিয়ে পড়ালে পড়ার প্রতি ওদের একটা ভীতির সৃষ্টি হয়। যা তাদের ভবিষ্যতের জন্য খুব খারাপ।
- আপনার কথা গুলো খুব যুক্তিসঙ্গত। আসলে আপনি প্রতিদিন অনেক বাচ্চাদের সাথে সময় কাটান তাই আপনার এই বিষয়ে নলেজও বেশ বাস্তবধর্মী। আসলে ছোট ছোট বাচ্চাদেরও এখন যা পড়াশোনার চাপ বেড়েছে তাই একটু প্রেসার দিয়ে না পড়ালে সিলেবাসও তো কমপ্লিট করানো যাবে না।
- হুমম। সেক্ষেত্রে আপনাকে একটানা না পড়িয়ে কিছুক্ষণ পড়িয়ে কিছুক্ষণ ওকে খেলার সুযোগ দিতে হবে। যেমন ধরুন আধা ঘণ্টা অঙ্ক প্র্যাকটিস করালেন, তারপর আধা ঘণ্টা ওকে খেলতে বললেন। আবার আধা ঘণ্টা পর পড়তে বসালেন। এতে বাচ্চার পড়ার প্রতি মন বসে। আর বাচ্চা শেখেও খুব দ্রুত।
- কিন্তু এইভাবে পড়া কন্টিনিউ করানোটাও তো বেশ সময়সাপেক্ষ। আমার সন্ধ্যার দিকে একটু ফ্রি সময় থাকে বলেই ভাইপো টাকে পড়াতে বসাই। কিন্তু আধ ঘণ্টা ছাড়া ছাড়া এভাবে পড়াশোনা কন্টিনিউ করাটাও তো গার্জেনদের কাছে একটু চাপের তাই না?
- একদম ঠিক বলেছেন। কিন্তু একটা কথা কি বলুন তো জেনারেশন চেঞ্জ হচ্ছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে পড়াশোনা থেকে আমাদের চারপাশের যাবতীয় সবকিছু দ্রুত আপডেট হচ্ছে। সুতরাং পড়াশোনাটা আর আগের মতো শুধুই মুখস্থ এর উপর ডিপেন্ড করে এগোবে না। যে বাচ্চার যত বুদ্ধি বেশি, কৌতহল বেশি, শেখার আগ্রহ, বোঝার ক্ষমতা বেশি সেই বাচ্চাই ততটা এগিয়ে যাবে।
- সত্যিই তো তাই। আমাদের সময়কার পড়ার ধরণ, পাঠ্যপুস্তক, আর এখনকার আকাশ পাতাল তফাৎ। এখন আরও যেসব নতুন নতুন বিষয় পড়ানো হচ্ছে যেমন বাচ্চাদের লজিক্যাল রিজনিং, কম্পিউটার, এখন আবার অত্যাধুনিক Artificial Intelligence এই সব সাবজেক্ট গুলো মানুষকে আরো উন্নত করছে। আপডেট করছে। আর এগুলোকে রপ্ত করতে গেলে বাচ্চাকে পড়ার চেয়ে বেশি বোঝার ওপর জোর দিতে হবে।
- সেই জন্যই বাচ্চাদের একনাগাড়ে অনেক ক্ষণ না পড়িয়ে খেলার ছলে কিংবা কিছুক্ষণ অন্তর পড়ালে ওদের পড়াশোনার প্রতি আকর্ষণ টা বাড়বে। আর হ্যা বাচ্চাকে ভবিষ্যতে ভালো জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে ছোট থেকে ওর ভিত টা তো একটু স্ট্রং করতেই হবে। ছোট বেলায় ওর ভিতটা শক্ত থাকলে আরও একটু বড়ো হলে ওর পড়াশোনার ব্যাপারে এর বেশি ভাবতে হবে না। বাচ্চা তার নিজের ভালোটা বুঝে যাবে। সুতরাং ছোটবেলাটা গার্জেন দের একটু কেয়ার নিয়েই বাচ্চাকে গাইড করা উচিত। সেক্ষেত্রে বা, মা ওয়ার্কিং হলে পরিবারের অন্য কেউ নাহলে খুব ভালো একজন বন্ধুসুলভ ধৈর্য্যশীল টিচার রাখা উচিত। মা, বাবা কিংবা পরিবারের অন্য কেউ যদি একটু কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর আধা ঘণ্টা করে সারাদিনে তিন - চার বারে পড়াতে পারে খুব ভালো হয় ।
- আপনি তো একজন টিচার। আপনার এই বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা আছে। শুনেও বেশ ভালো লাগলো। আমার এই গুলো জানা রইলো। ভাইপো কে এবার এভাবেই পড়ানোর চেষ্টা করব।
- অবশ্যই। দেখবেন ও আগের চেয়ে আরও বেশি পড়ার আগ্রহ পাবে। এই দেখুন গল্প করতে করতে নসিবপুর চলে এলাম। এর পরের স্টেশনই তো সিঙ্গুর। চলুন উঠে পরি। সামনের দিকে বেশ ভিড়। নইলে নামতে অসুবিধা হবে।
- হ্যা, চলুন। আর একটা কথা আপনার সাথে আলাপ হয়ে ভীষণ ভালো লাগলো। আপনি সত্যিই একজন খুব বড় মনের মানুষ। নিঃসন্দেহে একজন ভালো শিক্ষিকা। যে স্কুলে আপনি চাকরি করেন ওই স্কুল এবং ওই স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা আপনকে পেয়ে ভীষণ লাকি ।
- ধন্যবাদ। আপনিও খুব ভালো । আপনার কথাও খুব মার্জিত । আজ তবে আসি। পরে আবার কোনোদিন ঠিক দেখা হয়ে যাবে।
সমাপ্ত

0 মন্তব্যসমূহ