মশারি টাঙাবে কে? : এই নিয়ে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া ও শেষে রোম্যান্স

 

মশারি-টাঙাবে-কে-এই-নিয়ে-স্বামী-স্ত্রীর-ঝগড়া-ও-শেষে-রোম্যান্স



ছবি : নিজস্ব


সকাল ত্থেকে রাত পর্যন্ত সংসারের কাজের বিরাম নেই। রান্না- বান্না, ধোওয়া- মোছা, ছেলের পড়াশোনা, এসব করতে করতেই একজন গৃহবধূরর দিনটা শেষ হয়ে যায়। সংসারের সমস্ত বড় বড় কাজ সে একা একাই সারে। কারো ওপর ভরসা ছাড়াই। রোজকার সেই একই ডিউটি পালন করতে করতে কখনো সে বোরিং ফিল করে, কখনো মেজাজ ভালো থাকলে গুনগুন গানের তালে কাজ করে , কখনো আবার নিজের মনে গজগজ করতে করতে কাজ চালিয়ে যায়। মোট কথা, অন্দরমহলের যা কিছু নান্দনিক , প্রশংসনীয় সে সবেরই ক্রেডিট দেওয়া উচিত গৃহবধূদের।
তবে একটা কাজ আছে। যেটা করতে তাদের চরম অনীহা। কাজটা মাত্র দুই মিনিটের। যাতে না করতে হয় তার জন্য কুড়ি মিনিট ঝগড়া করে নেবে স্বামীর সাথে। তবু দুই মিনিটের কাজটা করতে তার গায়ে জ্বর এসে যায়। আজ সেই কাজটির পরিপ্রেক্ষিতেই একটি কথোপকথন লিখলাম।
...............................................................................
রাতের শেষ কাজটা করতে করতে সোমার মনে পড়ে গেল আজ পার্থর মশারি খাটানোর পালা। মনটা একটু ফুরফুরে হয়ে গেল। কারণ ওদের মধ্যে ঠিকই হয়ে আছে একদিন রাতে সোমা মশারি খাটাবে। অন্য দিন পার্থ। হিসাব মতো আজ পার্থর পালা।
সাধারণ দশটা পাঁচটার অফিস নয়। বেসরকারি চাকরি। সেই সকাল সাড়ে সাতটায় বেরোতে হয়। আর বাড়ি আসে রাত সাড়ে দশটায়। অফিস যাতায়াত নিয়েই প্রায় পাঁচ ঘন্টার জার্নি। সাথে বেসরকারি অফিসের কাজের চাপ। সব মিলিয়ে পার্থ বেশ বিধ্বস্ত অবস্থায় বাড়ি ফেরে। তখনও চোখে মুখে রাস্তার জ্যাম, ট্রেনের ভিড় , এসবের দাগ তার শরীর থেকে মোছে না। 
ক্লান্তি, আর অবসন্ন শরীরটাকে একটু সতেজ করতে স্নান ঘরে ঢোকে। এবার ফুরফুরে মেজাজে হাতে মুঠো ফোনটা নিয়ে বেশ খানিক্ষণ স্ক্রল করা, সাথে রাতের ডিনার। এই সময়টুকুই খুব স্পেশাল পার্থর কাছে। এসময়ে বিন্দুমাত্র সাংসারিক আলোচনা, কিংবা অফিস সংক্রান্ত কোন কথাবার্তা তার ভালো লাগে না। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পার্থর প্রতিদিন বাড়ি ফিরেই এই ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকাটা সোমা মন থেকে কিছুতেই  মেনে নিতে পারে না। 
সারাদিন দু- দণ্ড বসার সুযোগ না পেয়ে একভাবে কাজ করে চলে সংসারের। ছেলে পড়ে ক্লাস থ্রী তে। তার এখনো কোনো টিউশন টিচার দেওয়া হয় নি। তাই ছেলের পুরো দায়িত্বও আছে। সব মিলিয়ে স্বামী- স্ত্রী দুজনেরই বেশ ব্যস্ত শিডিউল। সোমার ইচ্ছে হয় অফিস থেকে ফিরে পার্থ আধা ঘন্টা অন্তত তার সাথে সময় কাটাক। রাতের খাবার টেবিলে একটু সারাদিনের ভালো- মন্দের আলোচনা হোক। কিন্তু এইটুকু সুখের মুহূর্তটাও প্রতিনিয়ত গ্রাস করে নিচ্ছে ছোট্ট এই যন্ত্রটা। 
সোমার ক্ষোভ উগরে পরে রাতের অবশিষ্ট কাজের ওপর। সে মুখের ওপর স্পষ্ট জানিয়ে দেয় আজকে কিন্তু তার মশারি খাটানোর পালা নয়। পার্থ মোবাইলের স্কিনের দিকে তাকিয়েই অমনোযোগী হয়ে ঘাড় নাড়ায়। সোমার রাগ আরো চরমে ওঠে।
- বলছি , শুনতে পাচ্ছ? আজ কিন্তু তোমার মশারি খাটানোর পালা। মনে আছে তো?
- হ্যা, মনে আছে। এক কথা বারবার বলো নি তো  ! 
( এবার মেজাজ আরো সপ্তমে চড়ল)
- বলি , তোমার মত সারাদিন মোবাইল নিয়ে খুটুর খটুর যদি করতাম, এই সংসারটা কবেই রসাতলে চলে যেত। 
( ফোনটা সজোরে পাশে রেখে পার্থ এবার তেড়ে এলো। )
- সারাদিন পর এই টুকু সময় একটু ফোনটা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখি। তাও তোমার সহ্য হয় না? আর আমিও যদি চাকরিটা না করতাম দেখতে সংসার কেমন তোমার ইশারায় চলত। শুধু নিজের কাজটাই কাজ মনে করো। আর আমি তেতে পুড়ে কাজ করে আসছি তাও তোমার মনে সন্তুষ্টি নেই?
চোখে জল নিয়ে সোমা এবার গোঁজ হয়ে রাতের সব কাজ গুলো করতে লাগলো। পরদিন সকালে খাওয়ার জন্য ড্রাই ফ্রুটস ভিজিয়ে রাখলো। দুটো গ্লাসে জল ভোরে এক চামচ করে চিয়া সিড মিশিয়ে রাখলো। শ্বশুর মশাইয়ের জন্য একটা বাটিতে কাঁচা ছোলা ভিজোতে
দিল। টক দই বসালো। 
এইসব খাবারের  প্রস্তুতি সোমাকে আগের রাতে করতে হয়। পরের দিনের জন্য। রোজকার ডিউটি। 
মুখে কুলুপ দিয়ে, চোখ ভর্তি জল নিয়েই সোমা তার নিত্যদিনের ডিউটি সারতে থাকলো। পার্থ আড় চোখে বউয়ের মুখখানা দেখছিল। ভিতরে ভিতরে ভয়ের সঞ্চার হলো। সোমার অভিব্যক্তির এই মেঘের ঘনঘটার রূপ কেমন হতে পারে তার সেটা ভালো করেই জানা আছে। কথায় বলে না যে যাকে নিয়ে সংসার করে , সেই তার মর্ম বোঝে। ব্যাপারটা ঠিক এইরকমই। 
মনে সাহস সঞ্চার করে, পার্থ ফোনটা রেখে উঠে দাঁড়াল। মেয়েদের কান্নার কাছে পুরুষ জাতি বরাবরই কেমন যেন ঝিমিয়ে পরে। সে বাইরে যতই পুরুষ সিংহ হোক না কেন বৌয়ের চোখের জল তার মনটাকে মেনি বিড়াল করে দেয়। 
আর বউরা এই অস্ত্রটাকেই কাজে লাগিয়ে দিনের পর দিন বরের মনে জায়গা করে নিয়েছে। 
সোমাও কাজ করছে আর আড়ালে , আবডালে দেখে নিচ্ছে পার্থর নজরে তার এই কান্না ধরা পড়ছে কিনা। পার্থও কিছু না দেখার ভান করে ব্রাশ করতে ব্যালকনির কাছে গেল। মিনিট তিন- চার ব্রাশ করতে করতে এসময় টা একটু এখানে সময় কাটায় পার্থ। এখান থেকে রাতের আকাশটা ভীষণ সুন্দর লাগে। 
দোতলায় এই ব্যালকনিটা সোমার অবদারেই তৈরি করা হয়েছিল। আজকে ব্রাশ করতে করতে পার্থ ভাবছিল বউয়ের চয়েস আছে মানতে হবে! 
- মনে হচ্ছে এখান থেকে এখুনি ঝাঁপ দিয়ে আমি নিজেকে শেষ করে দিই। তবে আমার জ্বালা জুড়াবে।
আকস্মিক সোমার আগমনে এবং ওর গজরানিতে পার্থর বুকটা কেঁপে উঠলো। দাঁত রোগড়ানো ছেড়ে ওয়াশ রুমে গিয়ে চটপট ফ্রেশ হয়ে নিল। পার্থ জানে সোমার এহেন আচরণের অন্তনিহির্ত মানে। 
তাকে কাজের গুরুত্ব নিয়ে তেঁতো কথা বলা হয়েছে। এরপরেও তার রাগকে প্রশমিত করার কোনো চেষ্টা করা হয় নি। এমনকি তার চোখের জল দেখেও তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। সব কিছু মিলেমিশে একটা অশান্ত ঝড়ের আভাস তৈরি হয়েছে তার মনে। 
পার্থ বেড রুমে ঢুকে দেখলো -
 সর্বনাশ, মশারি তো খাটানো হয়ে গেছে। পরিপাটি করে তোষকে গোজাও হয়ে গেছে। এবার কি হবে? পার্থ নিজের মনেই আওড়াতে লাগলো, আমি কি বলেছিলাম নাকি যে মশারি খাটাবো না। বৌটার এক মিনিট ও তরসোয় না। এতো, আবার দেখছি শুয়েও পড়েছে জিরো লাইট জ্বালিয়ে। 
যাইহোক এখন বিবাহিত পুরুষদের দেবতাই ভরসা। ঠাকুরকে প্রণাম করে পার্থ আস্তে আস্তে মশরিটা তুলে সোমার পাশে এসে শুল।
সোমা পাশ ফিরেই শুয়ে ছিল। এবার সবচেয়ে কঠিন কাজটি করার পালা পার্থর। মান ভাঙানোর।
- ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?
কোন সম্মতি পাওয়া গেল না। 
- শুনছো?
আবারো ব্যর্থ হলো পার্থর প্রশ্ন। এবার আরো একটু কাছে এসে সোমার কাঁধ স্পশ করে বলল,
- ঘুমিয়ে পড়েছো?
ফোঁপানো কান্নার আওয়াজ আর  ক্রমাগত নিঃশ্বাসের ওঠা- পড়া জানান দিল সোমার  মনে অভিমানের মেঘ জমেছে।
- তুমি হটাৎ ব্যালকনিতে গিয়ে ওমন অলুক্ষনে কথাটা বললে কেন? কি গো? 
আবারো গলার স্বরের পরিবর্তে কান্নার সুরটাই ভেসে উঠলো।
- বলছো না যে? তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো? আমার যত অভিমান , যত রাগ , ভালোবাসা সবই তো তোমার জন্য। রাগ করে নাহয় দুটো কঠিন কথা বলেই ফেলেছি। তার জন্য এত অভিমান? আচ্ছা, আমি কি জানি না, তুমি এই সংসারের জন্য কত করো। সত্যি বলতে কি তুমি না থাকলে আমি কি সকালে পেটে দুটি গরম ভাত খেয়ে, সুস্বাদু টিফিন নিয়ে অফিস যেতে পারতাম বলো তো? তোমাদের মত হাউস ওয়াইফরা আছে বলেই আমাদের মতো পুরুষরা এত নির্ভাবনায় বাইরেটা কাটাতে পারে। হ্যাঁ, মানছি অনেক ওয়ার্কিং বউদের কেও সমান কাজই করতে হয়। কিন্তু আমি জানি আমার বউটা একটু বেশিই সচেতন আমার এই সংসার টাকে নিয়ে। কারণ এটাই তো তার জগৎ। তার সবকিছু। তাই সংসারের কাজ নিয়ে স্বল্প খোঁটাও সে সহ্য করতে পারে না। কি গো আমি এত এত কথা বলছি তবুও তুমি একটাও কথা বলবে না? এখনো কেঁদেই যাবে? আচ্ছা, ঠিক আছে। সরি। আমার ভুল হয়েছিল তখন। ওভাবে বলা উচিত হয় নি। আমার মশারি খাটানোর পালা আজ আমার মনে ছিল। আমি করে নিতাম। মাঝখান থেকে খামোখা অশান্তি শুরু হলো। এবার তো কিছু বলো? 


সোমা তখনও কিছু বলল না, শুধু নিজের হাত দিয়ে পার্থর হাত দুটো জড়িয়ে ধরলো। পার্থ আলতো ভাবে সোমাকে বুকের কাছে টেনে নিল। 
বিবাহিত জীবনের ছোট খাটো অশান্তির সূত্রপাত হয়তো এভাবেই ঘটে আর শেষ হয় ভালোবাসায়, ভরসায়। 
তবে মশারি খাটানোর হিসেব টা তোলা থাকে পরের দিনের জন্য। এরপর টানা দুদিন এই কাজটার ভার পার্থই নিজের কাঁধে নিয়ে নেয় বিনা দ্বিধায়। এই হলো সংসার জীবন। 
আজকের ব্লগটা কেমন লাগলো জানাতে ভুলবেন না। আবার আসবো নতুন লেখা নিয়ে। সকলে ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন।






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ